নিউজ ডেস্ক : বছরের প্রথম মাসেই দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় আহত ও নিহত হয়েছে ২৫৯২ জন পুরুষ, নারী ও শিশু। দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয় বলে উল্লেখ করে এমন একটি সমীক্ষা প্রকাশ করেছে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা।
সমীক্ষায় বলা হয়, পুরো মাস জুড়েই ছিল পারিবারিক কোন্দলে আহত ও নিহতের নানা ন্যক্কারজনক ঘটনা। গৃহকর্মী নির্যাতন ও খুন, নারী নির্যাতন, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সহিংসতা, অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কর্তৃক নিরীহ মানুষ হত্যা। দেশের রাজনৈতিক অবক্ষয়ের সঙ্গে মানুষের সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়েরও স্খলন ঘটেছে মারাত্মকভাবে।
২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে দেশে প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিক পত্র-পত্রিকা এবং সংস্থার বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও পৌরসভা শাখার মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য। প্রতিবেদনে এও বলা হয় যে, এর বাইরেও মানবাধিকার লংঘন জনিত কিছু ঘটনা থাকতে পারে যা আমাদের সীমাবদ্ধতার কারণে সংগ্রহ করা সম্ভন হয়নি। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার জানুয়ারি মাসের মনিটরিং-এ পাওয়া তথ্য-উপাত্ত থেকে বিষয়ভিত্তিক কিছু তথ্য দেয়া হয়।
যৌতুক : জানুয়ারি মাসে যৌতুকের জন্য প্রাণ দিতে হয়েছে ৫ নারীকে এবং মারাত্মক আহত হন ৯ নারী । মুন্সিগঞ্জে যৌতুক না পেয়ে স্ত্রীকে বোতল দিয়ে পিটিয়ে জখম করে এক স্বামী। এর মধ্যে যৌতুকের জন্য আহত ও নিহতের সংখ্যা বেশী ঘটে ঢাকায়, মোট ৬ জন, আহত (৩) নিহত (৩)। তাছাড়া রাজশাহীতে নিহত হয় ২ জন।। যৌতুকের কারনে নারী নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে দিন দিন যা বর্তমান আধুনিক সমাজের জন্য অত্যান্ত লজ্জাজনক।
পারিবারিক কলহ : চলতি মাসে বেশ কিছু পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা অলোচিত হয়েছে। পারিবারিক কলহে চলতি মাসে নিহত হন ২৫ জন ও আহত হন ১২ জন ।পারিবারিক কলহের জের ধরে ইকবাল হোসেন নামে এক ব্যাক্তি নিজের ভাই বোনের তিন সন্তান কে পুড়িয়ে মারে। তাছাড়া নারায়ণগঞ্জে পারিবারিক কলহের কারণে একই পরিবারের পাঁচ জনকে গলা কেটে হত্যা করেন এক ব্যক্তি।
ধর্ষণ : জানুয়ারি মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৮ নারী, গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন আরো ৪ জন ও ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ১ জনকে। এই মাসে ১ শিশুও ধর্ষিত হয়। নোয়াখালীতে একই সঙ্গে ২ বোন গন ধর্ষণের শিকার হন। নান্দাইলে বাসে চালক দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয় এক নারী।
‘ক্রসফায়ারে’ নিহত : গত মাসে ‘ক্রসফায়ার’র নামে মৃত্যু হয় ৬ জনের। এর মধ্যে পুলিশের ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হন ৪ জন, র্যাবকর্তৃক ১ জন ও অন্যান্য বাহিনী কর্তৃক ১ জন। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু হয় ১ জনের।
আত্মহত্যা : চলতি মাসে আত্মহত্যা করেছে ৭ পুরুষ ও ২৬ নারী। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকাতেই আত্মহত্যা করে ১৪ নারী। বাকী ঘটনাগুলো ঘটে বরিশাল, রাজশাহী, খুলনা ও রংপুরে। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, প্রেমে ব্যর্থতা ও যৌন হয়রানির কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।
খুন : সারাদেশে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছেন ৬৭ জন ও আহত হয়েছেন আরো ৭৩ জন। তুচ্ছ ঘটনায় খুনের ঘটনা বেড়ে গেছে অনেক। ১১ জানুয়ারি প্রাইভেটকার ভাড়া করে গ্রামের বাড়ি গিয়ে টাকা না দিয়ে চালককে হত্যা করে পালায় তিন যুবক। কেরানীগঞ্জে হিন্দুদের এক মেলায় সন্ত্রাসীদের ছুরিকাঘাতে ঝনাটুদাস নামে এক যুবক নিহত হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী কর্তৃক হতাহতের সংখ্যা বেশি।
সড়ক দুর্ঘটনা : সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অবনতি, অদক্ষ চালক, পরিবহন ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারনে ১৬৪ জনের মৃত্যু ঘটেছে, অহত হয়েছে ৫৬৮ জন। ১০ জানুয়ারি ঘন কুয়াশার কারণে বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর পৃথক সড়ক দূর্ঘটনায় ভূমিমন্ত্রীর ছেলে সহ নিহত হয় সাত জন। আহত হন সাংবাদিকসহ ৪৬ জন।
সামাজিক অসন্তোষ : বিচার ব্যবস্থার অবনতি, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব এই সবকিছু মিলেই দেশের আপামর জনসাধারণের মানসিক ও মানবিক চিন্তা চেতনার অবক্ষয়ের কারণে বেড়ে গেছে সামাজিক অসোন্তুষ আর এই সামাজিক অসন্তোষের শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ১৮ জন এবং আহত হয়েছেন ৩৫৭ জন। বেশীর ভাগ ঘটনাই ঘটে জমি জমা সংক্রান্ত।
রাজনৈতিক সহিংসতা : রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত হয়েছেন ১৭৪ জন ও নিহত হয়েছে ৪ জন। বেড়ে গেছে রাজনৈতিক অন্তঃকোন্দলে আহতের সংখ্যা। বিগত পৌর নির্বাচন, আধিপত্য বিস্তার, টেন্ডার বানিজ্য, এলাকা দখল, চাঁদাবাজী নিয়নন্ত্রণ ও ক্ষমতার দাপট প্রদর্শনের জন্য আওয়ামী লীগের অন্তঃকোন্দলে আহত ১৭৫ জন বিএনপির অন্তঃ কোন্দলে আহত হয়েছেন ৩০ জন।
তাছাড়া মাদকের প্রভাবে বিভিন্ন ভাবে আহত হয়েছে ১২ জন ও নিহতের সংখ্যা ৯ জন। তাছাড়া পানিতে ডুবে, অসাবধানবসত, বিদ্যুৎপৃস্ট হয়ে মৃত্যুবরন করেছে ৫৪ জন। এ মাসেও চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু হয় ২ জনের। চলতি মাসে বিরোধী রাজনৈতিক দলকে নিয়ন্ত্রনের জন্য রাজনৈতিক অজুহাতে গনগ্রেফতার হয়েছে ৬৩২ জনেরও বেশী।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা মনে করে বিদ্যমান মানবাধিকার লংঘন অব্যাহত থাকলে একদিকে যেমন দেশের অগ্রগতি ব্যাহত হবে অন্যদিকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গিকার তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং দেশের ভাবমূর্তি হবে। সংস্থা আরো মনে করে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা সবচেয়ে বেশী মানবাধিকার লংঘন হয়।

