নিজস্ব প্রতিবেদক : ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই দায়িত্বের বোঝা কাধে নিয়ে ছুটতে হয় ঢাকাবাসীকে। জীবন যাপনের ইঁদুর দৌড়ে থেমে থাকার সুযোগ নেই কারো। ব্যস্ততার অজুহাতে ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছি আমরা। এতটাই বেপরোয়া যে, নিজের অজান্তেই কখনো অন্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছি আবার কখনো নিজেই মারাত্মত ঝুঁকির সম্মুখিন হচ্ছি। কখনো কখনো আমরা জেনে, বুঝে, শুনেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফেলছি। প্রতিদিন রাস্তা পার হবার সময় ঠিক যেমনটা নিচ্ছি।
দুর্ঘটনা রোধে এবং নিরাপদে রাস্তা পারাপার নিশ্চিত করতে রাজধানীর ব্যস্ততম রাস্তাগুলোতে ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। জনস্বার্থে এসব ওভারব্রিজ নির্মাণ করা হলেও, তা যথাযথভাবে ব্যবহার করার অভ্যাস এখনও সেভাবে গড়ে ওঠেনি। বরং গড়ে উঠেছে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হবার অভ্যাস।
পথচারীদের ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশন ও মহানগর পুলিশ বিভিন্ন রাস্তার পথদ্বীপে লোহার বেস্টনি বসিয়েছে।
কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে, সেই বেস্টনি ভেঙে রাস্তা পারাপারের জন্য পথ তৈরি করা হয়েছে। সব শ্রেণিপেশার নারী-পুরুষ, জোয়ান, বৃদ্ধ, শিশু সেখান দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। অথচ ২০ থেকে ৩০ ফুট দূরেই বেকার পড়ে আছে ওভারব্রিজ।
রাজধানীর মিরপুর, শ্যামলী, সাইন্সল্যাবরেটরি মোড়, নিউ মার্কেট, প্রেস ক্লাব ও বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ এলাকাসহ বেশকিছু এলাকায় এটা যেন স্বাভাবিক দৃশ্য।
সম্প্রতি মিরপুর ১ নম্বর গোলচত্ত্বর সংলগ্ন ক্যাপিটাল টাওয়ারের সামনের রাস্তার পথদ্বীপে বেস্টনি বসানো হয়েছে। কিন্তু অল্প কয়েক দিনের মাথায় সেই বেস্টনির বিভিন্ন অংশের রড ভেঙে ফেলা হয়েছে। বেস্টনির রড কে বা কারা ভেঙেছে জানে না কেউই। স্থানীয় লোকজন ও ফুটপাতের অস্থায়ী দোকানীদের কাছে জানতে চাইলে তারা সাফ জানিয়ে দেয়- ‘দেখি নাই।’
অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কেউ কেউ বলে, টাকার জন্য মাদকসেবীরা রড খুলে নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বেসরকারি একটি ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মী এ প্রতিবেদককে জানায়, স্থানীয় ও ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা বেস্টনি ভেঙেছে। সারাদিনে অসংখ্যবার তাদের রাস্তার এপার-ওপার যেতে হয়। আরর নিজেদের সুবিধার্থেই বেস্টনি ভেঙেছে রাস্তা করে নিয়েছে তারা। আর সেই সুবিধা ভোগ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষ দৈনিক ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে।
তবে ফুটপাতের এক ব্যবসায়ী বলছে অন্য কথা। তার ভাষ্য মতে- ‘পাবলিক ভালা না। রড খুইল্লা আলাইছে, এহন হগ্গুলেই যায় ভাঙ্গা দিয়া। বিরিজে উডে না।’
একাধিক পথচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সময় বাঁচাতেই নাকি তারা ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার না করে ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প পথে রাস্তা পার হয়।
বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা সাজিদা বিনতে রহমান বলেন, ‘অফিস আওয়ারে বিশাল লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করে তবেই বাসে উঠতে হয়। এই সময়টাতে যদি আমি ওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হতে যাই তাহলে কমপক্ষে ৫-৭ মিনিট সময় লাগবে। এ সময়ের মধ্যে কমপক্ষে আরো ১৫-২০ জন লোক লাইনে দাঁড়িয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে আমার বাসে উঠার সুযোগ নাও হতে পারে। একটা বাস মিস করা মানে সব মিলিয়ে আধা ঘণ্টা বা তার বেশি লেট হওয়া। অর্থাৎ ওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হতে গেলে লেট হবেই।’
কাপড় ব্যবসায়ী ওসমান ফারুকের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘ঝুঁকি সত্ত্বেও মূলত সময় বাঁচানোর জন্য অনেকে ওভারব্রিজে উঠতে চায় না। তবে আমার মত হার্টের রোগী বা বয়স্কদের জন্য ব্রিজে উঠা-নামা খুবই কষ্টের। তাছাড়া ওভারব্রিজগুলোয় ওঠার মত পরিবেশও নাই।’
মিরপুর ছাড়াও শ্যামলী, নিউমার্কেট ও পল্টন এলাকার পথচারীদের সঙ্গে কথা হলে তারাও একই কথা জানায়। কিন্তু সেখানকার রাস্তার বেস্টনি কারা ভেঙেছে কেউ জানে না।
দুর্ঘটনা কিংবা যত্রতত্র রাস্তা পারাপার রোধে উন্নয়ন সংস্থাগুলো নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও কার্যত কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করেন বিশিষ্টজনেরা।
এ বিষয়ে চিত্রনায়ক ও নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এর চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘আমাদের মত দেশে রাস্তাগুলো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ সেটা আগে বুঝতে হবে। আমাদের পথচারীরা ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হচ্ছে বা হেঁটে যাচ্ছে। যেন সে তার বেডরুম বা ড্রয়িংরুমে আছে। তাছাড়া জীবনের চেয়ে সময়ের মূল্য কখনই বেশি হতে পারে না। তাই কাউকে দোষ না দিয়ে নিজের নিরাপত্তার কথা সবার আগে নিজেকেই ভাবতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রকে তার নাগরিকের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’

