নিজস্ব প্রতিবেদক : একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ময়মনসিংহের জাতীয় পার্টির বর্তমান সংসদ সদস্য আবদুল হান্নানসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে অগ্রগতি তদন্ত প্রতিবেদন জমার জন্য পুনরায় দিন নির্ধারণ করেছেন আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। একইসঙ্গে আগামী ২৩ মার্চ তদন্তে অগ্রগতি প্রতিবদন জমার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
সোমবার ট্রাইব্যুনাল-১ চেয়ারম্যান বিচারপতি এম আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ দিন নির্ধারন করেন। এর আগে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ৪ মাসের সময় আবেদন করেন প্রসিকিউটর সুলতানা রেজিয়া এবং প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন। তবে ট্রাইব্যুনাল আবেদনটি বিবেচনা করেন এবং আগামী ২৩ মার্চ তদন্ত জমার সময় নির্ধারণ করেন। প্রসিকিউশনের সময় আবেদনের পর আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্তে অগ্রগতি হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন আসামিপক্ষের আনজীবী মিজানুল ইসলাম।
মামলাচলাকালে অভিযুক্ত ৮ আসামির মধ্যে জাতীয় পার্টির ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল) আসনের সাংসদ এম এ হান্নান ও তার ছেলেসহ ৫ জন আসামি ট্রাইব্যুনাল ডকে উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, আসামি এমএ হান্নানের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সক্রিয় সহায়তার লক্ষ্যে জেলা শান্তি কমিটি গঠন করে এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে। ফকরুজ্জামান ও গোলাম রব্বানি আলবদর বাহিনীর সশস্ত্র সদস্য হিসেবে হান্নানের সহযোগী ছিলেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আসামিরা শহরের নতুন বাজারে অবস্থিত এম এ হান্নানের নিজ বাসভবন, জেলা পরিষদ ডাকবাংলো টর্চার সেলের দায়িত্বে থেকে মুক্তিকামী সাধারণ নিরীহ মানুষদের ধরে এনে হত্যা করে মরদেহ ব্রহ্মপুত্র নদের চরে ফেলে রাখেন বলেও অভিযোগ তুলেছে প্রসিকিউশন।
অভিযোগ থেকে জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুর রহমানকে আসামি আব্দুল হান্নান তাদের সহযোগী রাজাকারদের সহযোগিতায় গৌরীপুর থানার ভাঙনামারী চর থেকে ১৯৭১ সালের ৯ অক্টোবর বিকেল চারটার সময় ধরে নিয়ে যায়। পরে ময়মনসিংহ শহরের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় টর্চার সেলে প্রকাশ্য দিবালোকে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুর রহমানের দুই চোখ উপড়ে ফেলে ও ডান হাত ভেঙে দিয়ে নিজে গুলি করে হত্যা করেন এম এ হান্নান। আসামিরা সহযোগী রাজাকারদের নিয়ে আব্দুর রহমানের বাড়ি লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন।
মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়, আসামিরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মনোরঞ্জনের জন্য ময়মনসিংহ শহরের যৌনপল্লী থেকে নারীদের ধরে এনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে সরবরাহ করেন। পরে এসব নারীদের ধর্ষণের পর হত্যা করে মরদেহ ব্রহ্মপুত্র নদে ফেলে দেয়া হয়।
আসামিরা ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানার খাগডহর ইউনিয়নে মাইজবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা আতাউর রহমান আতাকে ধরে নতুন বাজারে এম এ হান্নানের নিজ বাসায় বেয়োনেট চার্জসহ অমানুষিক নির্যাতন শেষে হত্যা করে মরদেহ ব্রহ্মপুত্র নদে ফেলে দেন।
ময়মনসিংহ শহরের কাঁচিঝুলি এলাকার শামসুদ্দিন আহমেদ টেপা মিয়ার পুত্র ধারা, কলেজ রোড এলাকার আব্দুল খালেকের পুত্র রমজান, ডালপট্টি এলাকার আব্দুর রশিদ, চরপাড়ার নিজাম, মুমিনুন্নিসা কলেজের পেছনের সুরুজ আলী, মাইজবাড়ির আতা, আকুয়া হাজিবাড়ীর সুরুজ এবং ধোপাখোলা মোড়ের অ্যাথলেট শাহেদ আলীকে আলবদর বাহিনীকে দিয়ে ধরে এনে আসামিরা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর টর্চার সেলে বেয়োনেট চার্জ ও গুলি করে হত্যা করে মরদেহ ব্রক্ষপুত্র নদে ফেলে দেন।
মামলায় আরও অভিযোগ রয়েছে, মামলার সাক্ষী খন্দকার আব্দুল গণির সহোদর ছোট ভাই খন্দকার আব্দুল আলী রতনকে ১৯৭১ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে আসামি এম এ হান্নান তার সহযোগীদের নিয়ে গাঙ্গিনারপাড় মকবুল রেডিও সার্ভিসের সামনে থেকে ধরে তার নতুন বাজারের বাসায় নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে হাত-পা ভেঙে ফেলেন। পরে সন্ধ্যায় তাকে জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর নিচে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেন।
আব্দুল আলী রতনের মা ও বোন ফাতেমা জহুরা রতনকে ছেড়ে দেয়ার জন্য অনুনয়-বিনয় করলে আসামি হান্নান তাদের হুমকি প্রদান করে বলেন, ‘তোমার বড় ছেলে আব্দুল গণিকে হত্যার জন্য গুলি লোড করা আছে’। এ কথা বলে তাদেরকে বের করে দেন।
আসামিরা ও তাদের রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে ময়মনসিংহ অঞ্চলে গণহত্যা, নারী ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগসহ ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালান বলেও মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
এর আগে গত ১৯ মে এমপি হান্নানসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুর রহমানের স্ত্রী রহিমা খাতুন। ময়মনসিংহের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১নং আমলি আদালতে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন’১৯৭৩ এর ৩ (২) ধারায় এ মামলাটি দায়ের করা হয়।
মামলায় জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য এম এ হান্নান ছাড়াও জামায়াত নেতা ফকরুজ্জামান ও শহরতলীর গলগণ্ডা এলাকার গোলাম রব্বানীকে আসামি করা হয়। পরে তদন্তে আরও পাঁচজনের সম্পৃক্ততা পাওয়ায় এ মামলার আসামি করা হয় মোট আটজনকে।
তবে ট্রাইব্যুনালের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর মামলার আট আসামির মধ্যে পাঁচ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হলেও পলাতক বাকি তিন আসামির নাম এখনই প্রকাশ করতে ইচ্ছুক নন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটররা।

