ঢাকাFriday , 22 January 2016
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রামপালের চেয়েও বড় হুমকি ওরিয়ন

Link Copied!

ওরিয়ন গ্রুপের নির্ধারিত জমি

ওরিয়ন গ্রুপের নির্ধারিত জমি

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রি বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে বির্তক থেমে নেই। শুরু থেকেই যথাযথভাবে আইনি প্রক্রিয়া না মেনেই এটি বাস্তবায়নের কাজ চলছে। প্রকল্পটি বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবনের জন্য হুমকি হবে বলে দাবি করে আসছেন পরিবেশবাদীরা। তাদের চলমান প্রতিবাদ ও আপত্তির মধ্যেই সুন্দরবনের আরো কাছে আরেকটি  কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। যাকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন ‘আরেক রামপাল’।
দেশি প্রতিষ্ঠান ওরিয়ন গ্রুপ বাগেরহাটের মংলায় ৫৬৫ মেগাওয়াটের এ কেন্দ্রটি নির্মাণ করছে, যা সুন্দরবনের সংরক্ষিত অঞ্চল থেকে মাত্র ১০ দশমিক ২২ কিলোমিটার দূরে। যেখানে ‘বহুল আলোচিত’ রামপাল প্রকল্পটি সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে সুন্দরবনকে পরিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। সে অনুসারে সুন্দরবনের চারদিকে ১০ কিলোমিটার এলাকা ইসিএ এর অন্তর্ভুক্ত। রামাপাল কেন্দ্রটি ইসিএ থেকে চার কিলোমিটার দূরে হলেও ওরিয়নের কেন্দ্রটি আধা কিলোমিটারের চেয়েও কম দূরত্বে অবস্থিত।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর সাধারাণ সম্পাদক ডা. আব্দুল মতিন এ ব্যাপারে বলেন, ‘এক রামপালেই সুন্দরবন টিকবে না। সেখানে আরও কাছে আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের  জন্য সাক্ষাৎ মৃত্যুঘণ্টা বাজাবে।’ ওরিয়নের কেন্দ্রটিকে তিনি ‘আরেক রামপাল’ বলে বর্ণনা করেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সাধারণ নিয়মনীতিও মানছে না ওরিয়ন। পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) অনুমোদন ও অবস্থানগত ছাড়পত্র (সাইট ক্লিয়ারেন্স) ছাড়াই এ কেন্দ্রের ভূমি উন্নয়নের কাজ প্রায় শেষ। রামপাল প্রকল্পের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ রয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে একটি প্রাথমিক অনুমোদন নিয়েছিল রামপাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ওরিয়ন তাও নেয়নি। ইআইএ এখনো অনুমোদন করেননি বলে জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক নাজমুল আহসান।
সূত্র জানিয়েছে, ২০১৪ সালে পরিবেশগত ছাড়পত্র পেতে ইআই প্রতিবেদন জমা দেয় ওরিয়ন। এরপর আরো দুই দফা সংশোধন করে পরিবেশ অধিদপ্তরে জমা দেয়। বর্তমানে এটি পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।  মতামত নিতে বন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবেদনটি পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ কেন্দ্র নির্মাণে ওরিয়ন গ্রুপের খুলনা পাওয়ার লিমিটেড ২০১২ সালের ২৭ জুন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সঙ্গে চুক্তি সই করে।  প্রকল্পের অবস্থান মংলার বুড়িডাঙ্গা ইউনিয়নের শ্যাওলাবুনিয়া গ্রামে । এখানে ওরিয়ন ২০০ একর জমি কিনেছে।
গত নভেম্বরে রামপাল প্রকল্প স্থান পরিদর্শনের সময়  এ এলাকাটিও ঘুরে দেখা হয়।  ‍ওরিয়নের প্রকল্পটি মইদারা নদীর তীরে অবস্থিত। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রও এই মইদারা নদীর তীরে।
সরেজমিনে দেখা যায় ওরিয়ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ভূমির উন্নয়ন প্রায় শেষ করে ফেলেছে। প্রকল্পের চারপাশে আবাদি জমি, জলভূমি ও ঘের রয়েছে। রয়েছে কিছু বসতি। এলাকাটি সনাতন ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত।
এদিকে প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণেও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। স্থানীয় ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে জোর জমি কিনেছে ওরিয়ন। স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালী ভ্যক্তিরা তাদের সহযোগিতা করেছে।
এ প্রসঙ্গে স্থানীয় দিগরাজ ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়ের এক শিক্ষক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ তিন ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এলাকার প্রভাবশালীদের মাধ্যমে ভয় দেখিয়ে, বেশি টাকার প্রলোভন দিয়ে জমি কিনেছে ওরিয়ন ৷
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এ বিষয়ে বলেন, ওরিয়নের বিরুদ্ধে নদী দখল করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ও পরিবেশ দূষণের অভিযোগ রয়েছে। আদালতে মামলাও হয়েছে সেখানে তারা কীভাবে সুন্দর বনের এতো কাছে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করছে সেটাই আশ্চর্য ।
প্রসঙ্গত, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কাশিপুরে  ১০২ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি তেলভিত্তিক কেন্দ্র নির্মাণ করেছে ওরিয়ন। কেন্দ্র নির্মাণে বুড়িগঙ্গা নদী দখলের অভিযোগ ওঠে ওরিয়নের বিরুদ্ধে। বুড়িগঙ্গা নদীর সীমানা থেকে অন্তত ৬০ ফুট ভেতরে কেন্দ্রর অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। শেষ পর‌্যন্ত হাইকোর্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবৈধ স্থাপনা ভাঙার নির্দেশ দেয়।
নাম জালিয়াতি
ওরিয়নের কেন্দ্রটি বাগেরহাটের রামপালে হলেও বিদ্যুৎ বিভাগের কাগজপত্রে এটাকে খুলনা কেন্দ্র (২৮২.৫=৫৬৫ মেগাওয়াট) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যা এক ধরনের জালিয়াতি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য রকৌশলী কল্লোল মোস্তফা বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘বেসরকারি খাতে আইপিপি মডেলের এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নামকরণে একটু চতুরতা আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, যেন রামপালের মতো হৈচৈ না হয়  ‘
তিনি বলেন,  ‘সুন্দরবনের কাছে মংলা উপজেলার বিদ্যারবাওন মৌজায় নির্মিতব্য বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নাম রাখা হয়েছে ‘খুলনা ২x২৮২.৫=৫৬৫ মেগাওয়াট আইপিপি কেন্দ্র’।  রীতি অনুযায়ী অন্যান্য আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নাম যেভাবে রাখা হয়, সেভাবে, নামকরণ করা হলে এর নাম হতো ‘খুলনা (বিদ্যারবাওন) ২x২৮২.৫=৫৬৫ মেগাওয়াট আইপিপি।’
তিনি আরও বলেন, ওরিয়ন গ্রুপ ২৮৫ মেগাওয়াটের ছোট দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে জন্য সরকারের জন্য চুক্তি করে। কেন্দ্র দুটির জন্য চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও খুলনার লবণচড়ায় স্থান নির্ধারন করা হয়েছিল। লবণচড়া সুন্দরবন থেকে যথেষ্ট দূরে ও বিদ্যুৎকেন্দ্র অপেক্ষাকৃত ছোট হওয়ায় আপত্তি ওঠেনি। কিন্তু জালিয়াতির মাধ্যমে খুলনা ও চট্টগ্রামের ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটিকে বাণিজ্যিক বিবেচনায় একসঙ্গে মিলিয়ে ৫৬৫ মেগাওয়াট আকারের বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয় ওরিয়ন। আর স্থান নির্বাচন করে সুন্দরবনের পাশে । এটা জনগণের সঙ্গে একচা বড় ধরনের প্রতারণা, যাতে বিদ্যুৎ বিভাগেরও সহুযোগিতা রয়েছে।
এ কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক মো. রেজাউল করিম বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘কেন্দ্রের নাম খুলনা হলেও আসলে এটি মংলা এলাকায়, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রায় কাছাকাছি অবস্থিত।’
দ্বিগুণ হুমকিতে সুন্দরবন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান জানান, নগরায়নের কারণে প্রতি বছর সুন্দরবনের আয়তন তিন বর্গ কিলোমিটার করে কমছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র হলেও নগরায়ণ আরও বাড়বে। আর ওরিয়নের কেন্দ্রটি সুন্দরবনের আরও কাছে, ফলে পরিবেশের ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যাবে।
রামপাল ও ওরিয়নের কেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের কী ক্ষতি হবে জানতে চাইলে নাম প্রকামে অনিচ্ছুক পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক এক পরিচালক বলেন, ‘রামপাল কেন্দ্র একা হলে পরিবেশের যতটুকু ক্ষতি হবে, ওরিয়নের কেন্দ্র চালু হলে ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যাবে।’