নিজস্ব প্রতিবেদক : একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করতে সরকারকে মনিটরিং কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গত জুন মাসে পলাতক এক আসামির বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার পর ট্রাইব্যুনাল এ নির্দেশ দেন। কিন্তু এরপর প্রায় ৬ মাস সময় কেটে গেলেও এ কমিটির কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি। ফলে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন ও মামলার বিচারপ্রার্থীদের মাঝে পলাতকদের বিচারের বিষয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে ফেরানো বা গ্রেপ্তারের কোনো উদ্যোগ না নেয়ায় এক প্রকার নিরাপদেই আছেন পলাতক যুদ্ধাপরাধীরা।
ট্রাইব্যুনালের নির্দেশের পর গত জুন মাসে পলাতক যুদ্ধাপরাধীদের ফিরিয়ে আনতে পুলিশ সদর দপ্তর ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি বিনয়কৃষ্ণ বালাকে সভাপতি করে কমিটিতে সদস্য সচিব করা হয় পুলিশের এআইজি মনিরুজ্জামানকে। এই কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক হেলাল উদ্দিন, সিটি এসবির একজন কর্মকর্তা, ডিএমপি ডিবির একজন কর্মকর্তা ও র্যাবের একজন কর্মকর্তা।
কমিটি গঠনের এ পর্যন্ত ছয়টি মিটিং সম্পন্ন করেছে এর সদস্যরা। শেষ মিটিংটি হয়েছে প্রায় ১ মাস আগে। পলাতক যুদ্ধাপরাধীদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব এখন থেকে এই কমিটির মাধ্যমে সরকারের ওপর বর্তায় বলে জানান ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম।
জেয়াদ আল মালুম বলেন, ‘দেশের মানুষ যুদ্ধে গিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে। কিন্তু এর মধ্যে যারা যুদ্ধাপরাধীদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তাদের বিচারের আশায় রয়েছে যুদ্ধাহত পরিবারসহ সমস্ত জাতি। তাই পলাতকদের ফিরিয়ে এনে দ্রুত বিচার কাজ সম্পন্ন করা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘তা না হলে মামলার বাদিপক্ষ, বিচারপ্রার্থী ও সাক্ষীদাতাদের ভয়ের মধ্যে দিন কাটাতে হবে। যদিও তারা এখনও নিরাপদ নয়। তাই পলাতক যুদ্ধাপরাধীদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে মনিটরিং কমিটির কার্যক্রম দৃশ্যমান করা প্রয়োজন ছিলো।’
মনিটরিং কমিটির কাজ এখনো দৃশ্যমান নয় বলে হতাশা প্রকাশ করেন জেয়াদ আল মালুম।
এদিকে ট্রাইব্যুনালের সর্বমোট ২১ মামলায় ২৬ জন দণ্ডিতের মধ্যে ছয়জন বিদেশে পালিয়ে আছেন। এদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি পাঁচজন। আসামিদের মধ্যে আছেন, চৌধুরী মঈনুদ্দীন, আশরাফুজ্জামান খান, আবুল কালাম আজাদ, কিশোরগঞ্জের হাছেন আলী ওরফে হাসান ও ফরিদপুরের জাহিদ হোসেন খোকন। এছাড়াও পলাতক আছেন আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জাতীয় পার্টির সাবেক সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বার।
তবে অনেকে আরো একটি হতাশার বিষয় উল্লেখ করেছেন। তা হলো- পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে ট্রাইব্যুনালের নির্দেশনার পূর্বে গঠিত বিশেষ তদারকি সেলের ব্যর্থতার বিষয়টিকে।
জানা গেছে, ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার এক আবেদনের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে একটি তদারকি সেল গঠন করে। এসময় তদারকি সেলের প্রধান করা হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক) কামাল উদ্দিন আহমেদকে। পাশাপাশি পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই), ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় ও মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্ত সংস্থার প্রতিনিধিদেরকেও এই কমিটির সদস্য করা হয়।
এই সেল গত বছরের জানুয়ারি মাসে গঠনের আট মাস পর ১১ সেপ্টেম্বর তাদের প্রথম সভা করে। ওই সভায় পলাতকদের ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগ, পলাতকদের অবস্থানরত দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করাসহ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়। ওইটিই সেলের প্রথম ও শেষ সভা।
তৎকালীন সেলটির অন্যতম সদস্য ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার জ্যেষ্ঠ সদস্য সানাউল হক বলেন, ‘আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে সব লিগ্যাল এ্যাকশন পুলিশের হাতে। আমরা কাউকে গ্রেপ্তারের অধিকার রাখি না। প্রসিকিউশনের মত মনিটরিং সেলের কোনো কার্যক্রম আমাদের কাছেও দৃশ্যমান হয়নি। তবে আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করে যাচ্ছি। আসামিদের গ্রেপ্তারে সম্ভাব্য ঠিকানা খুঁজে বের করার বিষয়ে আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।’
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের ৫ জনের বিরুদ্ধে ৭টি অভিযোগের ওপর রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। এ মামলার অভিযুক্ত পাঁচ আসামির মধ্যে অ্যাডভোকেট শামসুদ্দিন আহমেদ গ্রেপ্তার আছেন। আর পলাতক বাকি চার আসামি হলেন- শামসুদ্দিনের সহোদর সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন মো. নাসিরউদ্দিন আহমেদ, রাজাকার কমান্ডার গাজী আব্দুল মান্নান, আজহারুল ইসলাম ও হাফিজ উদ্দিন।
কিশোরগঞ্জের শামসুদ্দিনের এই মামলার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাক্ষী বলেন, ‘শামসুদ্দিনের মামলায় এখনো অনেক আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। তবুও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আমি এখানে সাক্ষ্য দিতে এসেছি। অনেকেই এখানে সাক্ষ্য দিতে আসতে নিষেধ করেছিলো। কিন্তু তাদের কথা না শুনে এখানে সাক্ষ্য দিলাম।’
এলাকায় পলাতক আসামিরা বিভিন্ন লোকের মাধ্যমে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছে জানিয়ে তিনি বলেন,‘পলাতক আসামিরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় পরিবার নিয়ে অনেক ভয়ের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।’
এদিকে ট্রাইব্যুনালে মামলা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পলাতক যুদ্ধাপরাধীর সংখ্যাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার মধ্যে কক্সবাজারের ২০ আসামির মধ্যে এখনো পলাতক রয়েছেন ১৪ জন আসামি। এর পাশাপাশি যশোরের ৯ আসামির মধ্যে ৬ জন, জামালপুরের ৫ জন, নেত্রকোনার ৫ জন, কিশোরগঞ্জের ৪ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ২ জন, নোয়াখালীর ২ জন, ময়মনসিংহের ৪জন, মৌলভিবাজার ৩ জনসহ অসংখ্য আসাম পলাতক রয়েছেন।

