অর্থনৈতিক প্রতিবেদক : ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত দাতাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের ঋণের প্রতিশ্রুতিই আদায় করতে পারেনি সরকার। এমন তথ্যই উঠে এসেছে অর্থনীতি সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) একটি প্রতিবেদনে।
উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ইআরডি এখন পর্যন্ত দাতাদের সঙ্গে তেমন বড় ধরনের কোনো ঋণের প্রতিশ্রুতি চুক্তি করতে পারেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে।
নাম না প্রকাশের শর্তে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘এ অর্থবছরের মাত্র ৩ মাস গেল। দাতারা আমাদের কর্মকাণ্ড অবজার্ভ করবে এরপর তারা প্রতিশ্রুতি দিবে। নভেম্বর ডিসেম্বরের দিকে পাইপ লাইনে থাকা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলে দাতাদের সঙ্গে বড় ধরনের চুক্তি হবে বলে আশা করছে ইআরডি।’
তবে এ সময়ের মধ্যে দাতাদের সঙ্গে ঋণ চুক্তি না হলেও সামান্য পরিমাণে অনুদানের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে সরকার। যার পরিমাণ মাত্র ৫ কোটি ২৮ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে দাতাদের কাছে মোট প্রতিশ্রুতি আদায়ের পরিমাণ ছিল ৪৩ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। এরমধ্যে ঋণের প্রতিশ্রুতি ছিল ৩৮ কোটি ডলার আর অনুদান ছিল ৫ কোটি ৮৪ লাখ ডলার।
গত মঙ্গলবার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন নিয়ে সচিবদের সঙ্গে বৈঠক শেষে পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘গত ৩ মাস বৃষ্টি হওয়ার কারণে রাস্তার কাজ হয়নি। অনেকে আবার বলছেন, পাথর পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে তাদের কাজের অগ্রগতি হচ্ছে না। আমি তাদের উদ্দেশ করে বলেছি, পাথর নাই; তাই বলে তো কাজ বন্ধ থাকবে না।’
ঠিকাদারদের উদ্দেশ করে এসময় মন্ত্রী বলেন, ‘পাথর পাওয়া না গেলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন, আমদানি করার চেষ্টা করেন। পৃথিবীর কোথাও না কোথাও তো পাথর আছে।’
তিনি বলেন, ‘যেসব ঠিকাদার তাদের কাজ ঠিকমত করছে না তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলেছি। কাজ নেয়ার আগে সময়মত কাজ শেষ করবে বলে কথা দেয়। কিন্তু কাজ শুরু করে তা সময়মত করতে পারে না। এটা তো মেনে নেয়া যায় না।’
প্রসঙ্গত, চলতি অর্থবছরে দাতাদের কাছ থেকে ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে মোট ৫৭৩ কোটি ডলারের বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরেও দাতাদের কাছে থেকে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বৈদেশিক সহায়তা আদায় করতে পারেনি সরকার। উন্নয়ন প্রকল্পে ৬০০ কোটি ডলার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছিল ৫২১ কোটি ডলার।
এদিকে দাতাদের প্রতিশ্রুতি আদায় না হলেও অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে দাতাদের অর্থছাড় বেড়েছে। প্রথম প্রান্তিকে মোট অর্থছাড় হয়েছে ৫০ কোটি ২২ লাখ ডলার। এর মধ্যে ঋণ হিসাবে ছাড় হয়েছে ৪০ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। আর অনুদান হিসাবে ছাড় হয়েছে ৯ কেটি ৪৩ লাখ ডলার।
এদিকে দাতাদের মধ্যে সর্বোচ্চ অর্থছাড় দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এর মধ্যে সংস্থাটি ঋণ হিসাবে ১৯ কোটি ২০ লাখ ও ৫ কোটি ৭৩ লাখ ডলার অনুদান হিসেবে ছাড় করেছে। জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (জাইকা) ঋণ হিসাবে ৪ কোটি ১৬ লাখ ডলার এবং অনুদান হিসাবে ৩৮ লাখ ডলার অর্থছাড় দিয়েছে। এছাড়া এডিবি ৭ কোটি ৬২ লাখ ডলার (ঋণ), ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক ৪ কোটি ২৫ লাখ ডলার (ঋণ), রাশিয়া ২ কোটি ২৭ লাখ ডলার (ঋণ) ছাড় করে। অনুদান হিসাবে জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনডিপি) অনুদান ছাড় করে ১ কোটি ১৯ লাখ ডলার।
গতবছরের একই সময়ে মোট অর্থছাড়ের পরিমাণ ছিল ৪৭ কোটি ১ লাখ ডলার । এর মধ্যে ঋণ ৪২ কোটি ৩০ লাখ ডলার আর অনুদান ৪ কোটি ৭ লাখ ডলার।
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সরকার ঋণের সুদও আসল হিসাবে বিভিন্ন দাতা সংস্থাকে মোট পরিশোধ করেছে ২৩ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। এর মধ্যে আসল ১৮ কোটি ২০ লাখ ডলার আর সুদ ৫ কোটি ৫৭ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে আসল ও সদসহ পরিশোধের পরিমাণ ৩৫ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। এর মধ্যে আসল ৩০ কোটি ১৪ লাখ ডলার আর সুদ ৫ কোটি ৩১ লাখ ডলার।
এদিকে, প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব আদায়ও কমেছে অনেকটা। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খোদ অর্থমন্ত্রী। এসময় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩৬ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এই প্রান্তিকে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ৫ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা। যদিও গত বছরের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ৯ দশমিক ৫১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে।
মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ‘গত পাঁচ বছরে এত কম রাজস্ব আদায় হয়নি। এটা ব্যাড সিগন্যাল। আই অ্যাম আনহ্যাপি।

