অর্থনৈতিক প্রতিবেদক : অবশেষে সুদের হার কমানোর কিছুটা প্রভাব পড়তে শুরু করেছে জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে। গত অর্থবছরজুড়ে রেকর্ড পরিমাণে বিক্রি হয়েছে সঞ্চয়পত্র। যার ধারাবাতিকতা ছিল চলতি অর্থবছরের শুরুতে। কিন্তু তিন মাসে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বিক্রি কমেছে ১২৮ কোটি টাকা। জাতীয় সন্ঞয়পত্র অধিদপ্তরের পাঠানো এক হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ সাড়ে ৬ হাজার ৬৯২ কোটি টাকার বেশি এসেছে, যা গত অর্থবছরের জুলাই মাসের তুলনায় ১২৮ কোটি টাকা কম। গত অর্থবছরের আলোচ্য সময়ে সঞ্চয়পত্রে নিট বিক্রি আসে ৬ হাজার ৮২০ কোটি টাকা। মুনাফা কমে যাওয়ার কারণেই সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে কিছুটা ভাটা পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরের তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টম্বর) নিট বিক্রি হয়েছে ৬ হাজার ৬৯২ কোটি ৪৩ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র; যা গত অর্থবছরের তুলনায় ১২৮ কোটি টাকা কম। গত অর্থবছরের তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) মাসে সঞ্চয়পত্রে নিট বিক্রি আসে ৬ হাজার ৮২০ কোটি টাকা।
এ তিন মাসে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে পরিবার সঞ্চয়পত্র। পরিবার সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯০৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। তিন মাস অন্তর মুনাফা ভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে নিট বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৬০১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা এবং পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে ৭১২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। মূলত এই তিন ধরনের সঞ্চয়পত্রের বিক্রিই বেশি হয়ে থাকে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত জুলাই মাসে সঞ্চয়পত্রে বিক্রি আসে ১ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা, গত বছরের চেয়ে যা ১১৮ কোটি টাকা বেশি। আগস্ট মাসে সঞ্চয়পত্রে বিক্রি আসে ২ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের আগষ্টের তুলনায় ১৮০ কোটি টাকা বেশি। একক মাস হিসেবে সেপ্টেম্বরে বিনিয়োগ আসে ২ হাজার ৬৫ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের তুলনায় ৪২৭ কোটি টাকা কম।
জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে ৪ হাজার ৫২৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা। আর সুদ হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে ২ হাজার ৬২৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা। জুলাই মাসে ডাকঘরের মাধ্যমে সঞ্চয়পত্র বেশি বিক্রি হয়েছে। এই সময়ে ডাকঘরের মাধ্যমে বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার ৩৯২ কোটি ৩৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র। বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে ২ হাজার ৩২৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। সঞ্চয়পত্র ব্যুরোর মাধ্যমে নিট বিনিয়োগ এসেছে ৯৭৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
জানা গেছে, সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় ঋণের ভার কমাতে গত ২৩ মে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদের হার প্রায় ২ শতাংশ করে কমায় সরকার। তবে ওই সময়ের আগে যারা সঞ্চয়পত্র কিনেছিলেন, তারা আগের সুদেই মুনাফা পাবেন বলে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর জানায়। বিক্রি ক্রমাগত বাড়তে থাকায় ঋণের বোঝা কমাতে সরকার ‘বাধ্য হয়েই’ সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমায়। ২৩ মে’র আগ পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার ও পেনশনার সঞ্চয়পত্র কিনলে ১৩ দশমিক ৪৫ ও ১৩ দশমিক ২৬ শতাংশ হারে সুদ পাওয়া যেত। সুদের হার কমানোর পর এখন কেউ পাঁচ বছর মেয়াদি পারিবারিক সঞ্চয়পত্র কিনলে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ হারে সুদ পাবেন। আর পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সুদের হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ হয়েছে। ৩ বছর মেয়াদি ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে সুদ হার ঠিক করা হয়েছে ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে তিন বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে সুদ হার ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে ১৩ দশমিক ১৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ করা হয়েছে।
জানা গেছে, প্রত্যাশার তুলনায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেশি হওয়ায় গত অর্থবছর জুড়েই ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার চাহিদা ছিল কম। গত অর্থবছর ব্যাংক থেকে সরকার নিট ৩১ হাজার ২২১ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও তা নিতে হয়নি। অর্থবছর শেষে ঋণ না বেড়ে ৬ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা কমে সরকারের পুঞ্জিভুত ব্যাংক ঋণ নেমে আসে এক লাখ ৭ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে আট হাজার ৭৪৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এতে মোট পুঞ্জীভত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৪ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। এ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আগে নেয়া তিন হাজার ২৩৪ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে সরকার। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকে সরকারের ঋণ কমে আট হাজার ৬৮১ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১১ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা নেয়ায় ঋণ বেড়ে এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মোট ২৮ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বিক্রি হয়েছিল ১১ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। তার আগে ২০১২-১৩ অর্থবছরে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল মাত্র ৭৭৩ কোটি টাকা। প্রতিদিন যে টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয় তা থেকে আগের কেনা সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর যেটা অবশিষ্ট থাকে সেটাকেই নিট বিক্রি বলে হিসাব করা হয়।

