নিজস্ব প্রতিবেদক : মুক্তমনা লেখক অভিজিৎ রায়কে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে রমজান ওরফে সায়েম এবং নাঈম নামের দুই যুবক। তারাই সিলেটে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাসকে একইভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। আর এই দুই হত্যার পরিকল্পনা করেন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) অর্থ উপদেষ্টা ও আইটি বিশেষজ্ঞ তৌহিদুর রহমান।
‘ইসলাম বিরোধী’ অনলাইন এক্টিভিস্টদের ধারাবাহিক হত্যার মিশন নিয়ে প্রায় তিন বছর আগে তিনি দেশে আসেন। তিনি সাইবার জগতে ঘুরে ইসলাম বিদ্বেষী সব ব্লগারদের শনাক্ত করে এবিটি প্রধান কারাবন্দী জসিম উদ্দিন রাহমানিকে সরবারাহ করেন। এই তথ্যের বাহক ছিলেন এবিটির স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নাদেক আলী মিঠু এবং রাহমানীর ভাই আবুল বাশার। এই চক্রের যোগসাজসেই দুই ব্লগারকে হত্যায় অংশ নেয় পাঁচজন। সেখানে মিঠুও ছিলেন। তবে সরাসরি খুন করেন সায়েম ও নাঈম। আর হত্যার পর তৌহিদুরের নির্দেশনায় জুলহাস বিশ্বাস ও জাফরান আল হাসান নামে দুই যুবক অনলাইনে হত্যার দায় স্বীকার করে বার্তা দেয়।
এবিটির তিন অনুসারীকে গ্রেপ্তারের পর র্যাব কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানিয়েছেন। তারা বলছেন, গোপন সাধারণ জীবন-যাপন করা তৌহিদুর ও মিঠুর মাধ্যমে সক্রিয় ছিল এবিটির খুনীদল। রাহমানী গ্রেপ্তারের পর তারাই সংগঠনকে চাঙ্গা রাখেন। পলাতক দুই খুনী যুবককে তৌহিদুর রহমান ছাড়া গ্রেপ্তারকৃতরা ভালোভাবে চিনেন না। তারা দুই খুনে অংশ নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে। ফলে সম্প্রতি খুন হওয়া নীলাদ্রি চট্টপাধ্যায় নিলয় এবং ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যায় এই চক্রটি জড়িত কিনা তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘দুই কিলার যারা হিট করেছে, তাদের ব্যাপারে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তৌহিদুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে অনলাইনের মাধ্যমে সক্রিয় ছিল। সে মুলত ওয়াচ করত। কারা কী লিখছে। তারপর হত্যার টার্গেট করত। তার আর্থিক ও কৌশলগত সহায়তায়ই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অপর হত্যাগুলোর ব্যাপারে এখনো জানা যায়নি।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, গোয়েন্দা পুলিশ আজ (বুধবার) তিন আসামিকে অভিজিৎ হত্যায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করবে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা পুরো খুনী চক্রটির ব্যাপারে তথ্য নেয়ার চেষ্টা করবে বলে জানা গেছে।
র্যাবের সূত্র জানায়, তৌহিদুর রহমানের বাবার নাম মৃত রশিদুর রহমান। তার বাড়ি যশোরের খরকী গ্রামে। তিনি ১৯৭৬ সালে পটুয়াখালী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। ১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডাটা সংগ্রহের প্রতিষ্ঠান আইএসআরটিতে (ইন্সটিটিউট অব রিসার্চ ট্রেনিং) তিন মাস চাকুরী করেন। এরপর ইস্টার্ন ক্যাবল এবং ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব পপুলেশন রিচার্স অ্যান্ড ট্রেনিংয়েও চাকুরি করেন। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ বিমানে ফিল্ড সার্ভিস এ্যাসিসটেন্ট পদে যোগদান করে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চাকুরি করেন। তিনি ১৯৯১ সালে ইংল্যান্ডে চলে যান। সেখানে গিয়ে তিনি রেস্টুরেন্টে কাজ করার পাশাপাশি আইটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন। এর মধ্যে- মাইক্রোসফট সার্টিফাইড সিসটেম ইঞ্জিনিয়ারিং (এমসিএসই), নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ারিং (এনই), হার্ডওয়ার, ইন্টারনেট ও গ্রাফিক্স-ডিজাইনের উপর কোর্স করেন। ১৯৯৭ সালে লন্ডনের একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে এক বছর কম্পিউটার টাইপিস্ট হিসেবে চাকুরী করেন। ২০০৩ সালে শিশুদের একটি স্কুলে নেটওয়ার্ক সাপোর্টার হিসেবে চাকুরী করেন তিনি। দীর্ঘ ২২ বছর ইংল্যান্ডে থাকাকালীন ৩/৪ বার বাংলাদেশে এসেছেন তৌহিদুর। তিনি ১৫ বছর আগে পূর্ব লন্ডনের প্যালিস্ট শহরের নাগরিকত্ব লাভ করেন। ব্যক্তিজীবনে তৌহিদুর একজন চিরকুমার।
সুত্রমতে, ২০০৭ সালে রাহমানির সঙ্গে পরিচিত হয়ে তার মতার্দশে উদ্বুদ্ধ হন তৌহিদুর রহমান। তিনি প্রায়ই রহমানিকে আর্থিক সাহায্য করতেন সংগঠন পরিচালনা করার জন্য। রহমানী তাকে সংগঠনের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করেন। তিনি আইটি বিশেষজ্ঞ হওয়ায় অনলাইনে সক্রিয় ব্যক্তিদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করতেন সহজেই। এরপর মিঠু ও বাশারের মাধ্যমে রাহমানীকে ওই তথ্য পৌঁছে দিতেন। একই সঙ্গে যারা ‘ইসলাম বিরোধী’ লেখালেখি করছে, তাদের হত্যার টার্গেট করতেন তৌহিদুর।
সূত্র জানায়, ২০১২ সালে দেশে এসে আর ফিরেননি তৌহিদুর। দীর্ঘ দিন লন্ডনে থাকার কারণে অভিজিৎ রায় বাংলাদেশে আসার বিষয়টি জানতে পারেন তিনি। খবরটি রমজান ও নাঈমকে জানিয়ে হত্যার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেন। তার নির্দেশনায় ঘটে অনন্ত বিজয় হত্যাকান্ডও। এসব হত্যার পর পরই জুলহাস ও জাফরানের দায়িত্ব ছিলো অন-লাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন নামে (আনসারুল্লাহ বাংলাটিম-১, ২, ৩, ৭ ও ৮) এর দায় স্বীকার করা। তারা সে অনুযায়ী কাজ করে গা ঢাকা দেয়।
আসামি মিঠু র্যাবকে জানিয়েছে, হত্যাকান্ডে সরাসরি অংশ নেয়া নাঈম ও সিয়ামকে গ্রেপ্তারকৃত তৌহিদুর রহমান ব্যক্তিগতভাবে চেনেন। এ ছাড়া বছিলা ফাতিমা-তুজ-জোহরা মাদ্রাসার পরিচালক শামীম এবং রায়বাজার (মধুবাজার) মাদ্রাসার পরিচালক মাজহার আলীও এই দুজনকে চেনেন।
র্যাব কর্মকর্তারা জানান, সাদেক আলী মিঠু লক্ষীপুর জেলার রামগঞ্জ থানার মাছুমপুর গ্রামের মৃত মোহাম্মদ আলীর ছেলে। রাজধানীর নীলক্ষেত এলাকার একটি কম্পিউটারের ব্যবসা করেন তিনি। পরিবার নিয়ে থাকেন ওই এলাকার ৪৩ নম্বর শাহ সাহেব বাড়িতে। ঢাকা কলেজ থেকে ইংরেজী বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করা মিঠু চাকুরি না করে টিউশনিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। ২০০৭ সালে নীলক্ষেতের একটি প্রেসে আনসারুল্লাহ প্রধান জসিম উদ্দিন রাহমানির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরবর্তীতে ২০১১ সাল থেকে মিঠু রাহমানির মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ও আস্থাভাজন হয়ে উঠেন। ২০১২ সাল পর্যন্ত জসিম উদ্দিন রাহমানির স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
মিঠু প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, তিনি কাশিমপুর কারাগারে গিয়ে রাহমানির সঙ্গে দেখা করে সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রমের দিকনির্দেশনা নিয়ে আসতেন। তিনি মূলত বার্তা বাহকের কাজ করতেন। এক পর্যায় তার সঙ্গে পরিচয় হয় রাহমানির ছোটভাই বাশারের।
র্যাব কর্মকর্তারা দাবি করেন, রাহমানির গ্রেপ্তারের পর ২০১৩ সালে বাশার আর মিঠুই সংগঠন পরিচালনার দায়িত্ব পান। অভিজিৎ রায়কে হত্যার সময় ঘটনাস্থলের কাছে অবস্থান নেন মিঠু। মিশন সম্পন্ন হলে তিনি সটকে পড়েন।
এদিকে আরেক আসামি আমিনুল মল্লিক শরিয়তপুরের সন্তোষপুরের মৃত আব্দুল জব্বার মল্লিকের ছেলে। তিনি তৌহিদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আনসারুল্লাহর অনুসারীদের সহায়তা করতেন। তার মূল কাজ ছিল বিদেশে পলাতক এবং পালাতে ইচ্ছুক জঙ্গীদের পাসপোর্ট তৈরি করে দেয়া।

