শেরপুর প্রতিনিধি : মোঘল গেল, গেল বৃটিশ; হলো পাকিস্তান। এসব আমলের সমাপ্তি হয়ে বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের জন্ম হলো। বাংলাদেশি হিসেবে স্বীকৃতি পেল সবাই কিন্তু আজও নিজেদের ভূমি অধিকার ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়নি আদিবাসীরা। দেশের অন্যান্য স্থানের আদিবাসীদের মতো ভালো নেই শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি জনপদের আদিবাসী সম্পদায়ের লোকেরাও। কেউ রাখেনা তাদের খোঁজখরব। প্রতি বছরের ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে ছোট পরিসরে তারা তাদের দাবিগুলো তুলে ধরলেও কোনো উন্নতি নেই তাদের জীবনমানের।
সরকার আসে, সরকার যায়, উন্নয়ন হয় অনেক কিছুর। কিন্তু সীমান্তবর্তী পাহাড়ি জনপদের আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। অভাব-অনটন, দুঃখ-দুর্দশাই যেন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। বর্তমানে সারাদেশের আদিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে তারাও তাদের ভূমি অধিকার ও স্বীকৃতি’র জন্য আন্দোলন ও দাবি জানিয়ে এলেও তাদের নিজেদেরে অস্তিত্ব রক্ষায় হিমসিম খেতে হচ্ছে তাদের।
দেশের উত্তর-পুর্বাঞ্চলের গারো পাহাড়ের পাদদেশে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত ঘেষে অবস্থিত শেরপুর জেলার নালিতাবড়ি, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবর্দী উপজেলা। ওইসব উপজেলাসহ জেলা সদর এবং নকলা উপজেলায় প্রায় ৫০ হাজার আদিবাসী লোকের বসবাস রয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে গারো, ক্ষত্রিয় বানাই, কোচ, হাজং, ডালু, হদি, বর্মন ও রাজ বংশী সম্প্রদায়ের লোকজন। এর মধ্যে পাহাড়িরা সবচেয়ে অবহেলিত ও কষ্টে রয়েছে।
আদিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের মধ্যে প্রায় ৭০ ভাগই দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে। অথচ এককালে এদের সব ছিল। ছিল গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ ও গোলা ভরা ধান। কিন্তু কালের আবর্তে সবকিছু হারিয়ে আজ তারা দিশেহারা। আদিবাসী সম্প্রদায়ের ৭০ ভাগ লোকই তাদের কৃষি জমিতে চাঁষাবাদ এবং ভূমিহীনরা তাদের শ্রম বিক্রিসহ নানাভাবে পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবন নির্বাহ করে আসছে। বাকি ৩০ ভাগ আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকদের জমি-জমা থাকলেও বন্য হাতির তাণ্ডবে গত প্রায় ২০ বছর ধরে তাদের জমিতে কোনো ফসল উৎপাদন করতে পারছে না। প্রতি বছর এসব এলাকায় প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে কোন আবাদ করতে পারে না। ফলে বছরে তারা প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের ফসল ফলাতে না পেয়ে ব্যপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া অনেক আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকজনের জমি-জমা জাল-জালিয়াতীর মাধ্যমে জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী সন্ত্রাসীরা। ফলে এ উপজেলার আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকজন দিন দিন ভূমিহীন ও দিনমজুরে পরিনত হচ্ছে। এসব এলাকায় হতদরিদ্র আদিবাসী নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা কৃষির উপর শ্রম বিক্রি করে যা পায় তা দিয়ে কোনো রকমে পরিবারের সদস্যদের জীবন জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।
এক সময় আদিবাসী সম্পদায়ের লোকেরা পাহাড়ে জুম চাষসহ বিভিন্ন প্রজাতির ধান চাষ করতো। কিন্তু পাহাড় উজাড় হওয়ার পাশাপাশি বন্য হাতির তাণ্ডবে এখানের আদিবাসীদের জুম চাষ হারিয়ে গেছে। ধান চাষও কমে গেছ। এরা গত ২০ বছর ধরে বন্য হাতির সঙ্গে লড়াই করে কোনো রকমে বেঁচে আছে। এসব এলাকায় আজো গড়ে উঠেনি ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য সেবার কোনো চিকিৎসালয় বা হাসপাতাল, এমন কি রাস্তা-ঘাট ও বিদ্যুতায়নও হয়নি ওইসব জনপদে।
সীমান্তের আদিবাসীদের দাবি তদের ভূমি অধিকার ও সীকৃতি’র পাশাপাশি দেশের অন্য নাগরিকদের মতো সকল প্রকার নাগরিক সুবিধা, পাহাড়ি এলাকার রাস্তা-ঘাট উন্নয়ন, বিদ্যুতায়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং স্বাস্থ্যসেবার জন্য ক্লিনিক বা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা।
শ্রীবর্দী উপজেলা ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক প্রাঞ্জল এম. সাংমা বাংলামেইলকে বলেন, ‘আমরা দুই দশক ধরে আদিবাসীদের জীবনমান উন্নয়ন তথা তাদের নৈতিক ও মৌলিক অধিকার প্রাপ্তির জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছি। এরমধ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান, পৃথক ভূমি কমশন গঠন, আদিবাসী অঞ্চল সমূহে তাদের সাংস্কৃতি চর্চা, স্বাস্থ্য-শিক্ষা-চিকিৎসাসহ বিভিন্ন মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ চাকরির ক্ষেত্রে আমাদের সুবিধা প্রদান করার দাবি জানিয়ে এসে দীর্ঘ দিনেও সরকার আমাদের সে দাবিগুলো পূরণ করছে না ফলে আমারা এখন হতাশ হয়ে পরেছি।’

