ঢাকাSaturday , 1 August 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সোনালী ধান এখন দীর্ঘশ্বাসের নাম

Link Copied!

Sunamgonjসুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : হাওরবেষ্টিত জেলা সুনামগঞ্জ। বোরো ধানই এ জেলার প্রধান ফসল। সারাদেশের খাদ্যচাহিদার একটি বড় অংশ আসে এ জেলা থেকে উৎপাদিত ধান থেকে। এবারো বোরো ধানের হয়েছে বাম্পার ফলন। কিন্তু শিলাবৃষ্টি আর আগাম বন্যায় সোনালী ধান এখন সুনামগঞ্জের কৃষকদের কাছে দীর্ঘশ্বাসের নাম।
এবারের কৃষি মৌসুমে ২১ হাজারেরও বেশি হেক্টরের জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার পরিমাণ প্রায় ৭৮ হাজার মেট্রিক টন। যা গত কৃষি মৌসুমের তুলনায় ৭২ হাজার মেট্রিক টন বেশি। সেই সঙ্গে সরকার নির্ধারিত মূল্যে ধান বিক্রি করতে না পারায় কৃষকদের কাছে যেন ‘মরার ওপর খাড়ার ঘা’।
সুনামগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এ কৃষি মৌসুমে ২ লাখ ১৮ হাজার ৫৬৫ হেক্টর কৃষি জমিতে ৮ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এর কতটুকু অর্জন হয়েছে তা এখনো জানা যায়নি। ২০১২-১৩ কৃষি মৌসুমে ২ লাখ ৩৩৭ হেক্টর জমিতে ৭ লাখ ৩৫ হাজার ৭৫৭ মেট্রিকটন এবং ২০১৩-১৪ মৌসুমে ২ লাখ ১৬ হাজার ১৭০ হেক্টর জমিতে ৮ লাখ ২ হাজার ৭৩৭ মেট্রিকটন ধান উৎপাদিত হয়েছিল। এর মধ্যে হাইব্রিড, উফসী ও স্থানীয় বোরো ধান রয়েছে।

২০১৩-১৪ কৃষি মৌসুমে আগাম বন্যাসহ নানা কারণে ২ হাজার হেক্টর কৃষি জমিতে ৬ হাজার মেট্রিক টন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেখানে এবার ২১ হাজার হেক্টর কৃষি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেখানে ৭৭ হাজার ৯০১ মেট্রিক টন ধান নষ্ট হয়েছে।
এ বছর ধানের চারা লাগানোর সময় থেকে বিপাকে পড়তে শুরু করেন কৃষকরা। চৈত্রের খরতাপের কারণে বোরো ফসলের কিছুটা চিটাজনিত ক্ষতি হয়। তারপরও ধানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে সুনামগঞ্জের কৃষকরা। বৈশাখ মাসে আংশিক ধান কেটে মাড়াই করেও রেখেছিলেন তারা। কিন্তু বেশিরভাগ ধান বিলম্বে পাকা ও শ্রমিক সঙ্কটের কারণে কাটার পর অতিবৃষ্টির জন্য মাড়াইকৃত ধানে চাড়া গজায়। আর এর উপর হঠাৎ করেই অতিবৃষ্টি আর শিলাবৃষ্টির কারণে ব্যাপক আকারে ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষকরা।
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে প্রচুর পরিমানে ফসল নষ্ট হওয়ার পর তারা আশা করেছিল সরকার নির্ধারিত মূল্য পাবেন। কিন্তু সেখানেও ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলায় এবার বোরো ধান চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ১৪ হাজার ৪৫৬ হেক্টর। তবে চাষাবাদ হয়েছিল ২ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৬ হেক্টর জমি। যা লক্ষ্যমাত্রার ছেয়ে ৪ হাজার ১০০ হেক্টর বেশি। ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল চালে ৮ লাখ ৩৫ হাজার ৪৯২ মেট্রিক টন এবং ধানে ১২ লাখ ৫৩ হাজার ২৩৮ মেট্রিক টন। কিন্তু প্রাকৃতিক বির্পযয়, অনাবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, হাওরের বাঁধভাঙা ও অতিবৃষ্টির কারণে পানিতে তলিয়ে গিয়ে প্রায় ২১০ কোটি টাকার ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ১ এপিল থেকে কয়েক দফা প্রাকৃতিক দুর্যোগে সদর উপজেলার কাঠইর ইউনিয়নের ১৫০ কৃষকের ৫০ হেক্টর জমির ফসলের ৬০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় শিলাবৃষ্টি ও পানিতে তলিয়ে গিয়ে শিমুলবাঁক, পাথারিয়া, পূর্বপাগলা, পশ্চিম পাগলা, দরগাপাশা, পশ্চিম বীরগাঁও ও জয়কলস ইউনিয়নের ৯ হাজার ২৪৯ কৃষকের ৩ হাজার ৮৪ হেক্টর জমির ফসলের ৩১ কোটি ৭ লাখ ১৩ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। জামালগঞ্জ উপজেলায় শিলাবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় সদর, ফেনারবাঁক, বেহেলী, সাচনাবাজার ও ভীমখালী ইউনিয়নের ১৭ হাজার ১৪৫ কৃষকের ৬ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমির ফসলের ৮৪ কোটি ১৭ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার শুধুমাত্র পানিতে তলিয়ে গিয়ে ফতেপুর ও পলাশ ইউনিয়নের ৯৫০ কৃষকের ২০০ হেক্টর জমির ২ কোটি ১৭ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
দিরাইয়ে জগদল, করিমপুর, ভাটিপাড়া, রফিনগর, রাজানগর, সরমঙ্গল, তাড়ল, কুলঞ্জ ও চরনাচর ইউনিয়নে শিলাবৃষ্টি ও পানিতে তলিয়ে গিয়ে ১৭ হাজার ৩৩৩ জন কৃষকের ৩ হাজার ১৩৭ হেক্টর ফসলের ৪২ কোটি ৬ লাখ ৬৩ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। শিলাবৃষ্টি ও জলামগ্নতায় শাল্লা উপজেলার আটগাঁও, হবিবপুর, বাহাড়া ও শাল্লা ইউনিয়নের ১৫ হাজার ৬০ জন কৃষকের ৩ হাজার ৯২০ হেক্টর জমির ফসলের ৫০ কোটি ১৭ লাখ ৬ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। ধর্মপাশায় ধর্মপাশা, সেলবরস, পাইকুরাটি, মধ্যনগর, চামরদানী, বংশীকুণ্ডা উত্তর, বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ, জয়শ্রী, সুখাইর রাজাপুর উত্তর, সুখাইর রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের ১০ হাজার ৩৩০ কৃষকের ২ হাজার ৯৪০ হেক্টর জমির ৩৬ কোটি ৪১ লাখ ৫১ হাজার টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে এবং ছাতকের ১১ ইউনিয়নের ৭৭৫ কৃষকের ২২১ হেক্টরের জমির ২ কোটি ৬৫ লাখ ২০ হাজার টাকার ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ফসল ক্ষতি হওয়ার পেছনে প্রতি বছরের মধ্যে এবারো হাওরের বাঁধ, বেড়িবাঁধ নির্মাণের গাফলতি বড় কারণ হিসেবে ছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতায় বিগত বছরগুলোর মতো এতো হাসির মাঝেও কৃষকদের শেষ রক্ষা হয়নি। সুনামগঞ্জ জেলার ৬টি হাওরে বাঁধ ভেঙে পানিতে উঠতি পাকা ফসল ২০ ভাগ ও টানা বর্ষণে ২০ ভাগ ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে জানান স্থানীয় কৃষকরা।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরবর্তীতেও বিপদ পিছু ছাড়েনি এ এলাকার কৃষকদের। কারণ ধানের ফলনের পর সরকারের নির্ধারিত মূল্য আদায় করতে পারেননি কৃষকরা। সরকারিভাবে প্রতি মণ ধানের দাম ৮৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সরকার প্রতি মণের উৎপাদন খরচ নির্ধারণ করে ৭০০ টাকা। সেখানে হাওরের প্রত্যন্তঞ্চলের কৃষকরা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে ধান বিক্রি করেছে। ফলে প্রতি মণ ধানে তাদের লোকসান গুণতে হচ্ছে ১০০ থেকে ২০০ টাকা।
কৃষকরা অভিযোগ করে বলেন, জেলার খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ধানের সরকারি নির্ধারণ করা মূল্য জানানো হয়নি তাদের। তাছাড়া কৃষকদেরকে সরকারিভাবে ধান ক্রয় সংক্রান্ত ব্যাপারে কোনো কিছু জানানোও হয়নি। এই সুযোগে ফায়দা লুটছে অসাধু সিন্ডিকেট। তারা কম দামে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনে বেশি দামে বিক্রি করছে।
সুনমগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এ বছর অনেকটা চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে মাঠের ধান গোলায় তুলতে সক্ষম হলেও সারা বছরের পরিশ্রম অনুযায়ী ফল পাচ্ছেন না। এছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে কৃষকদের কাছ থেকে সরকারের নির্ধারণ করা মূল্য থেকে অনেক কম দামে ধান কিনছে কয়েকটি সিন্ডিকেট। তারা কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি মণ ধান ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা দরে ক্রয় করে খাদ্য বিভাগের লোকদের কাছে সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করছে।
সদর উপজেলার বুড়িস্থল গ্রামের কৃষক আব্দুল মন্নান বলেন, ‘সরকারে কত টেকা দাম ঠিক করছে তা গৃরস্থ (কৃষক) জানে না। আমরা এলাকার কয়েকজন মাইনষের কাছে সাড়ে ৫০০ টেকা মণ হিসাবে ধান বেচলাম। তারা আমরার কাছ থাইক্যা ধান কিন্যা গাড়িত কইরা লইয়া যায়। তারা কত কইরা বেঁচে ইতা আমরা জানি না।’
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার আস্তমা গ্রামের কৃষক মোস্তফা মিয়া বলেন, ‘বন্যায় অনেক ধান খাইয়া ফেললেও সব মিলিয়ে এইবার ধান ভালা অইলেও আমরা বেঁচবার সময় ঠগা খাই। কামলার রোজ আর সব খরচ মিলাইয়া ধান চাষ কইরা তেমন একটা লাভ অয় না। সরকারে দাম কত করছে ইতা আমরা জানি না। আমরার কাছ থাইক্যা কয়েকজন মাইনষে ধান কিনে। তারা আমরারে ৬০০ টেকা মণ দেয়।’
দিরাই উপজেলার সাকিতপুর গামের কৃষক সুহেল মিয়া বলেন, ‘আমরার এলাকায় ওখন পর্যন্ত সরকারিভাবে ধান কিনার খবর জানি না। আমরা এলাকার কয়েকজন নেতার কাছে ৫০০-সাড়ে ৫০০ টেকা মণ দামে ধান বেচলাম।’
জগন্নাথপুর উপজেলার চিনাউড়া গ্রামের কৃষক গোলজার মিয়া বলেন, ‘আমরার কাছ থাকি খাদ্য বিভাগের কেউ ধান কিনে না। এর লাগি আমরা স্থানীয় মাইনষের কাছে ৫০০ টেকা মণ ধান বেচলাম। আমরার এলাকাত সরকারিভাবে কেউ ধানের দাম জানাইছে না।’
এ প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ জাহেদুল হক বলেন, ‘এবার কৃষিতে ফলন ভালো হয়েছে। তবে শিলাবৃষ্টিতে, আগাম বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুযোর্গের কারণে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।’
নায্যমূল্য না পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ আমাদের কাছেও রয়েছে। তবে বিষয়টিকে আমরা গুরত্বের সঙ্গে নিয়েছি। অন্যান্যবারের তুলনায় এবার কৃষকরা ভালো দাম পেয়েছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘সুনামগঞ্জে প্রচুর পতিত আবাদী জমি রয়েছে। এসব জমিকে কাজে লাগানোর জন্য আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করছি। এতে শুধু ধানই নয়, অন্যান্য ফসলও যাতে চাষ করা যায় সে বিষয়টিকেও আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।’