লালমনিরহাট প্রতিনিধি : ৬৮ বছরের বন্দিদশা। সেই কষ্টের জীবন থেকে মুক্তি মিলেছে তাদের। সেই মুক্তির আনন্দ কি সহজে ভাষায় প্রকাশ করা যায়? তাই তো মুক্তির আনন্দ প্রকাশ করতে গিয়ে হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী ছিটমহলের মোমেনা বেগম ও সখিনা বেওয়া বললেন, আইজ ঈদ ঈদ নাগেছে। মুই আইজ খুব খুশি, ঈদের দিন হামা এত খুশি হই না।’
সদ্য স্বাধীন হওয়ার আনন্দ। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ছিটমহল বিনিময় কার্যকর হয়েছে। এই খুশিতে শুক্রবার রাত ১২টা ১ মিনিটে বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠেন তারা।
গোতামারী ছিটমহলের বাসিন্দা রেজাজুল বলেন, ‘আজ শনিবার থেকে হামাক আর ছিটমহলের বাসিন্দা কেই কইবে না। হামরা এখন বাংলাদেশী।’ ছিটমহল বিনিময়ের মধ্য দিয়ে ভারত-বাংলার দীর্ঘ ৬৮ বছরের লাঞ্ছনা-বঞ্চনা ও অবরুদ্ধ অন্ধকার জীবনের অবসান ঘটল। ভারত-বাংলাদেশে আর কখনো শোনা যাবে না ছিটমহলের কথা।
দীর্ঘ ৬৮ বছরের বন্দীদশা থেকে মুক্তির আনন্দে মধ্যরাতে ছিটমহলবাসী বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে ওঠেন। এ আনন্দ আর খুশিকে সবার মাঝে ভাগাভাগি করে নিতে ছিটমহলবাসীর উদ্যোগে দিনভর নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশের জাতীয় খেলা হাডুডু, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা ও বিভিন্ন ধরনের শিশুতোষ খেলাধুলা দিয়ে শুক্রবার সারাদিন অতিবাহিত করে ছিটমহলবাসী। পশ্চিম আকাশে সূর্যের আলো নিভে যাওয়ার আগেই লাঠিখেলা দিয়ে শেষ করে ছিটমহলবাসী সারাদিনের কর্মসূচি।
সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয়ে রাত ১২টা পর্যন্ত চলে পালাগান, সারিগান, যাত্রাপালা, বিভিন্ন নাচ-গান ও ঢাক- ঢোলের সুরে ছিটবাসীর আনন্দের বাজনা। তারা সবাই অধির আগ্রহে বসেছিলো কখন রাত ১২টা ১ মিনিট হবে।
লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী ইউনিয়নে ভারতীয় ১৩৫/১ ও ১৩৫/২ ছিটমহল অবস্থিত। আধুনিকতার ছোঁয়া ও সভ্যতার বিকাশে মানুষ আজ অনেকটা এগিয়ে। ক্রমাগত প্রতিযোগিতা করে দেশ ও দেশের মানুষ এগিয়ে চলছে।
কিন্তু তারা ছিলেন আধুনিকতার বাইরে। তারা শুধু আধুনিকতার বাইরে নয়; মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত ছিলেন। এ রকম কয়েক হাজার মানুষের বসবাস ছিটমহলে। তারা কেউ ইচ্ছে করে ছিটমহলে যাননি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তাদের ছিটমহলে বসবাস। তারা ইচ্ছা করেও সেখান থেকে ৬৮ বছর বের হতে পারেননি।
হাতীবান্ধা উপজেলা থেকে গোতামারী ছিটমহল ১০ কিলোমিটার। সেখানে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম মোটরসাইকেল। সেখানকার মানুষ প্রতিনিয়ত জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছেন। এ যেন মৃত্যুপুরীতে বসবাস। শুধু গোতামারী নয়, জেলার ৫৯টি ছিটমহলের একই অবস্থা। ১ আগস্ট ছিটমহলবাসীর বিজয় দিবস। তাই তারা ৩১ জুলাই রাত ১২টা ১ মিনিটে বিজয় উল্লাস করেছে।ছিটমহল শহরে রাত ১২টা খুব বেশি রাত না হলেও গ্রামে রাত ১২টা গভীর রাত। তার পর আবার ছিটমহলে। ছিটমহলে বিদ্যুৎ, স্কুল, কলেজ, ক্লিনিক নেই। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে সবাই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। কিন্তু শুক্রবার রাত ১২টা বাজলেও কারও চোখে ঘুম ছিল না।
ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে। একেকটা সেকেন্ড অতিক্রম করছে আর উচ্ছ্বসিত হচ্ছে ছিটমহলবাসী। ঘড়ির কাঁটায় ১২টা ১ মিনিট। সঙ্গে সঙ্গে ৬৮টি মোমবাতি জ্বালিয়ে ও জয় বাংলা বলে চিৎকার দিয়ে ওঠে গোতামারী ছিটমহলের বাসিন্দারা।
ছিটমহলবাসী একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে উল্লাস। মিষ্টি বিতরণ করেন। মধ্যরাতের অন্ধকার যেন ছিটমহলবাসীর অনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। শুধু গোতামারী ছিটমহলে নয়, লালমনিরহাট জেলার ৫৯টি ছিটমহলে এ বিজয় উৎসব পালিত হয়।
বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির লালমনিরহাট জেলা সাধারণ সম্পাদক ও গোতামারী ১৩৫/১ নম্বরের বাসিন্দা আজিজুল ইসলাম আশিক বলেন, ‘আমরা মহাখুশি। আমরা আজ মুক্ত।’
গোতামারী ১৩৫/১ ও ১৩৫/২ ছিটমহলের সভাপতি ছকবর হোসেন বলেন, ‘আমি কতো খুশি তা বোঝাতে পারব না। তবে মনও খুব খারাপ, হিন্দু ভাই- বোনদের সঙ্গে এতদিন একসঙ্গে ছিলাম। তারা ভারতে চলে যাবে তাই খুব খারাপ লাগছে।’

