চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : নির্বাচিত হওয়ার প্রায় তিন মাস পর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন আ জ ম নাছির উদ্দিন।
রোববার বেলা ১২টা ৫ মিনিটে ভারপ্রাপ্ত মেয়র মোহাম্মদ হোসেনের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি এ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পাশাপাশি নির্বাচিত ৪১ সাধারণ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও ১৪ সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরও দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তবে এদের মধ্যে অনেকে পুনঃনির্বাচিত হয়েছেন।
এ উপলক্ষে সিটি করপোরেশনের কে বি আব্দুস সাত্তার মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রোববার সকালে খতমে বুখারী শরীফ শেষে চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও কল্যাণ কামনায় বিশেষ মুনাজাত শেষে মেয়র দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় করেন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন কমিশন থেকে গত ৩০ এপ্রিল সিটি মেয়রের গেজেট প্রকাশিত হয়। এরপর ৬ মে সিটি মেয়র এবং কাউন্সিলররা শপথ নেন। কিন্তু স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন আইন), ২০০৯-এর ৬ ধারা অনুযায়ী গত মেয়র ও কাউন্সিলরদের প্রথম বৈঠকের দিন থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর মেয়াদ থাকে। এতে করে সাবেক সিটি মেয়র এম মনজুর আলম এবং কাউন্সিলরদের মেয়াদ ২৫ জুলাই শেষ হয়েছে।
আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন এবং কাউন্সিলরদেরকে প্রায় তিন মাস অপেক্ষা করার পর দায়িত্ব বুঝে নিতে হয়েছে। এরআগে সাবেক মেয়র মনজুর আলমের নেতৃত্বাধীন পরিষদের মেয়র পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই গত ৭ এপ্রিল নির্বাচনে অংশ নিতে মেয়র পদ থেকে পদত্যাগ করেন মনজুর আলম। তখন ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন প্যানেল মেয়র মোহাম্মদ হোসেন।
নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর গত তিন মাস ধরে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব পালন না করলেও জলাবদ্ধতা নিরসন, ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার এবং বিল বোর্ড উচ্ছেদ নিয়ে কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের সাথে ধারাবাহিক বৈঠক এবং প্রয়োজনীয় মৌখিক নির্দেশনা প্রদান করেছেন। অনুষ্ঠানিক দায়িত্ব না নিলেও এতদিন তার নির্দেশেই চলছিল করপোরেশনের সামগ্রিক কার্যক্রম।
এদিকে দায়িত্বগ্রহণ অনুষ্ঠানে সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও এম মনজুর আলমকে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও এদের কেউই অনুষ্ঠানে আসেননি। তবে এসময় সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তা কাজী শফিউল আলম ও সচিব রশিদ আহমেদ সহ কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে নগরপিতা হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার আগেই সব ধরনের মামলা থেকে মুক্তি পেয়েছেন নাছির। সর্বশেষ নিজ দলের কর্মী সুফিয়ান সিদ্দিকী হত্যাচেষ্টার মামলায় আদালতের রায়ে বেকসুর খালাস পান নাছির। ১৯৯৩ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ক্যান্টিনের চিকিৎসক মিজান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স পরীক্ষার্থী বোরহানসহ ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় দায়ের করা মামলারও আসামি ছিলেন আ জ ম নাছির। ২০০১ সালে এ মামলা থেকে বেকসুর খালাস পান তিনি। ১৯৯৯ সালে মারামারির অপর একটি মামলায়ও আদালত থেকে খালাস পান তিনি।
প্রসঙ্গত চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন ১৯৮১ সাল থেকে পরপর দুবার চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর দুবার কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি হন। ১৯৮৬ সালে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্নেল ফারুক ফ্রিডম পার্টি গঠন ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করেন। তখন আ জ ম নাছির উদ্দিনের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ লালদীঘি মাঠে কর্নেল ফারুকের জনসভা পণ্ড করে দেয়। দলীয় কোন্দলের কারণে গত একদশক ধরে তিনি চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সদস্যপদ থেকেও বঞ্চিত ছিলেন। তবে ২০১৪ সালের শুরুতে তিনি নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি তিনি একজন ক্রীড়া সংগঠক। তিনি চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সহ-সভাপতি।
প্রসঙ্গত, ৩১ শে জুলাই ১৯৯০ চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনকে নাম পরিবর্তন করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নামকরণ করা হয়। সরকার কর্তৃক মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রথম মেয়র নিযুক্ত করা হয়। পরবর্তিতে ১৯৯৪ সালের প্রথম নির্বাচন পর্যন্ত মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন মেয়র হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৯৪ সালের ৩০ জুন প্রথম নির্বাচনে নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরী বিএনপির মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন। এরপর ২০১০ সালের নির্বাচনে ৯৫ হাজারের বেশী ভোটের ব্যবধানে মেয়র হিসেবে এক সময়ের রাজনৈতিক গুরু মহিউদ্দিন চৌধুরীকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করেন বিএনপির এম মনজুর আলম।
সূত্র জানা যায়, ২০০০ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন আইন সংশোধন করে ৪১টি ওয়ার্ডকে ভাগ করে মহিলাদের জন্য ১৪টি সংরক্ষিত মহিলা কমিশনার আসন রাখা হয়। তারা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে থাকে। সংখ্যার বিচারে এখন রয়েছেন ৪১ জন ওয়ার্ড কমিশনার এবং ১৪ জন সংরক্ষিত আসনের নির্বাচিত মহিলা কমিশনার। ২০০৮ সালে কমিশনার পদবি পরিবর্তন হয়ে নামকরণ হয় কাউন্সিলর।

