
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক : দেশের বাজারে গত সপ্তাহে সোনার দাম কিছুটা কমেছে। আর এতে সোনার বাজারে ক্রেতাদের ভিড় থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু এবার দাম কমার পরও সোনার বাজারে ক্রেতাদের তেমন ভিড় বাড়েনি। শনিবার রাজধানীর তাঁতীবাজার, বায়তুল মোকাররম, মৌচাক, বসুন্ধরা মার্কেট ঘুরে জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপকালে এমনটিই জানা গেছে।
সোনা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সোনার প্রতি মানুষের আগ্রহ আগের চেয়ে কমেছে। আগের চেয়ে ভ্যাট বাড়ানোর কারণেই ক্রেতাদের আগ্রহ কমেছে বলে জানান তারা। এছাড়া বিকল্প হিসেবে অন্যান্য গহনার ব্যবহার বাড়ার কারণেও সোনার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে তরুণীরা।
জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতনের কারণে দেশের বাজারে গত বৃহস্পতিবার থেকে সোনার দাম কমানো হয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) ঘোষিত নতুন মূল্য অনুযায়ী বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম কমেছে ১ হাজার ৫৪০ টাকা, ২১ ক্যারেট ১ হাজার ৫৩৯ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের দাম ১ হাজার ৫৪০ টাকা কমেছে।
নতুন দর অনুযায়ী, প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেট সোনার দাম ৪২ হাজার ৯৮১ টাকা, ২১ ক্যারেট ৪০ হাজার ৮৮২ এবং ১৮ ক্যারেট ৩৪ হাজার ২৩৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সনাতন পদ্ধতির সোনা ২২ হাজার ৮৬১ টাকা ভরি। এছাড়া প্রতি ভরি রূপার দাম ৯৯১ টাকা।
এর আগে দেশের বাজারে প্রতি ভরি সোনা ২২ ক্যারেট ৪৪ হাজার ৫২১ টাকা, ২১ ক্যারেট ৪২ হাজার ৪২১ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের দাম ৩৫ হাজার ৭৭৩ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অন্যদিকে সনাতন পদ্ধতির সোনা প্রতি ভরি ২৪ হাজার ৮৬ টাকায় এবং প্রতি ভরি রূপা (ক্যাডমিয়াম) এক হাজার ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
দেশের বাজারে সোনার দাম কমানোর পর ক্রেতাদের সাড়া পাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক খান বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারে সোনার দাম বাড়ে-কমে। আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুদিন ধরে সোনার দাম কম থাকায় দেশের বাজারেও কমেছে। তবে ঈদের পর দাম কমার কারণে বিষয়টি অনেকে জানে না। ফলে দাম কমার পরও সোনার দোকানগুলোতে ক্রেতাদের তেমন সাড়া পড়েনি।’ তবে কয়েকদিন পর থেকে ক্রেতাদের সাড়া পড়বে বলে মনে করেন তিনি।
বায়তুল মোকাররম মার্কেটের শারমিন জুয়েলার্সের কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘মাত্র ঈদ গেলো। আর ঈদের ছুটিতেই সোনার দাম কমেছে। তবে ঈদের আগে দোকানে ক্রেতাদের ভিড় ছিল লক্ষ্যণীয়। কিন্তু ঈদের ছুটিতে দাম কমার কারণে ক্রেতাদের তেমন সাড়া নেই।’
তাঁতীবাজারে সোনা ব্যবসায়ী শরীফ জুয়েলার্সের সত্ত্বাধিকারী শরীফ হোসেন জানান, আগে সোনার প্রতি মানুষের আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। এখন মানুষ সোনার গহনা কম পরে। মেয়েরা এখন পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে গহনা পরে। সোনার চেয়ে পুঁতি, কড়ি, শেল, সুতা, স্টোন, কাঠ ও পিতলের তৈরি গহনার প্রতিই তরুণীরা এখন বেশি আগ্রহী। তবে উচ্চ-মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তদের বেশি আগ্রহ ডায়মন্ডের গহনায়। এছাড়া রূপার ওপর সোনার প্রলেপ দেয়া গহনা ও ইমিটেশনের গহনায়ও চাহিদা মেটাচ্ছেন মধ্যবিত্তরা। আর এসব কারণেই সোনার দাম কমার পরও ক্রেতাদের তেমন সাড়া নেই বলে জানান তিনি।
মৌচাক মার্কেটের রানা জুয়েলার্সের বিক্রয়কর্মী আহসান হাবিব জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম অনেক কমেছে, সেই তুলনায় দেশের বাজারে তেমন কমানো হয়নি। যদি সোনা মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আনতে হয় তাহলে দেশের বাজারে সোনার দাম আরো কমাতে হবে। তাহলেই ক্রেতারা সোনার দোকানে ভিড় জমাবে বলে মনে করেন তিনি।
সোনার দাম কমার পর কাস্টমারদের কেমন সাড়া পড়ছে জানতে চাইলে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) সভাপতি দিলীপ রায় বলেন, ‘কাস্টমার মনে করছে সোনার দাম আরো কমবে। অনেকে আমাদের দোকানগুলোতে ফোন দিয়ে জানতে চাইছেন সোনার দাম আরো কমবে কি নাও। আরো কমার অপেক্ষায় রয়েছে ক্রেতারা। তাই দোকানগুলোতে দাম কমার পরও ভিড় কম।’
তিনি বলেন, ‘সোনা কেনার উপর ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করার পর থেকে কাস্টমাররা আগ্রহ হারাতে থাকে। সোনার দাম কমার পর কাস্টমারদের যতোটা আগ্রহ বেড়েছে ভ্যাট বাড়ানোর কারণে ততোটাই হারাচ্ছে। যদিও এর আগে ৩ শতাংশ ভ্যাট ছিল। তবে সোনার দাম যদি আর না বাড়ে তাহলে দোকানগুলোতে কাস্টমার দিন দিন আরো বাড়বে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সোনা তো মানুষ কোনো জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কিনে না। বিশেষ করে বিয়ে সাদির সময় সোনার বেশি দরকার হয়।’
উল্লেখ্য, গত কয়েক দিনে এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে সোনার দামের নিম্নমুখি প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, চীনের সাম্প্রতিক সোনা মজুদের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশের পর এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এশিয়ার নগদ টাকার বাজারে (স্পট) সোনার আউন্সপ্রতি দাম দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮৮ ডলার পাঁচ সেন্ট।
২০১০ সালের ২৬ মার্চের পর গত সোমবারই প্রথমবারের মতো মূল্যবান এ ধাতুর দাম আউন্সপ্রতি ১ হাজার ১০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে বিবিসি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়াতে পারে। মূলত এ অনিশ্চয়তা থেকে নিরাপদে থাকতে বিনিয়োগকারীরা সোনা বিক্রি করে নগদ অর্থ তুলে নিচ্ছেন। ফলে সোনার দাম কমেছে ৫ শতাংশ।

