নিজস্ব প্রতিবেদক : অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ অনুসন্ধানে বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) খোন্দকার মো. ইকবালকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই অভিযোগে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকটির সাবেক এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে (অপসারিত) জিজ্ঞাসাবাদের কথা থাকলেও তিনি হাজির হননি।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত টানা তিন ঘণ্টা ইকবালকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। দুদকের উপ-পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে চার সদস্যের টিম তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
প্রণব জানান, বেসিক ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য দুদকের একটি টিমকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সেই অনুসন্ধানের স্বার্থে আজ ব্যাংটির বর্তমান এমডিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ব্যাংকটির সাবেক এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকেও আজ জিজ্ঞাসাবাদের কথা থাকলেও তিনি উপস্থিত হননি। আর না আসার ব্যাপারে কারণও এখন পর্যন্তু দেখাননি।
দুদক সূত্রে জানা যায়, বেসিক ব্যাংকের তিনটি শাখা থেকে চার হাজার ২৪৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। এই ঋণের বড় অংশই দেয়া হয়েছে কোনো নিয়মকানুন না মেনে। ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছে ব্যাংকটি। শাখাগুলোর মধ্যে গুলশান শাখার দেয়া ঋণের পরিমাণ এক হাজার ৮০০ কোটি ২৩ লাখ টাকা, শান্তিনগর শাখা এক হাজার ৫২৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা এবং দিলকুশা শাখা দিয়েছে ৯২৩ কোটি ২১ লাখ টাকা।
এই তিন শাখায় অতি দ্রুততার সঙ্গে ঋণ ছাড় করা হয়েছে। ঋণের বিপরীতে কোনো উল্লেখযোগ্য জামানতও রাখেনি কর্তৃপক্ষ। বরং তালিকার বাইরের নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে এসব জামানতের অভিহিত মূল্য (ফেস ভ্যালু) বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে, যাতে বেশি করে ঋণ পাওয়া যায়।
এসব জালিয়াতির অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা নিতে এই তিন শাখার নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের বিস্তারিত প্রতিবেদন ২০১৩ সালের ২৫ জুলাই দুদকে পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে ব্যাংকটির ওপর বিস্তারিত পরিদর্শন চালায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসিক ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের মার্চে বিবরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। এই চার বছর তিন মাসে ব্যাংক থেকে ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়, যার প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকাই নিয়ম ভেঙে দেয়া হয়েছে।
দুদক সূত্র আরো জানায়, দুদক প্রথমে ব্যাংকের শান্তিনগর, দিলকুশা, গুলশান শাখার ঋণ অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করে। পরে মতিঝিল স্থানীয় কার্যালয়ের ঋণ অনিয়ম অনুসন্ধান করা হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, জামানতবিহীন, ভুয়া জামানতে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ও নানা জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ওইসব ঋণ দেয়া হয়েছে। ব্যাংকের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার অপব্যবহার করে পরস্পর যোগসাজশে ঋণের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে সরকারের ক্ষতি করা হয়েছে। তাই এসব ব্যাপারে জানতে এবং অধিকতর অনুসন্ধানের স্বার্থে আজ ব্যাংকটির সাবেক ও বর্তমান এমডিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়েছিল।
প্রথমে কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১৩ সালের প্রথম দিকে অভিযোগটি অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল উপ-পরিচালক মাহবুবুল আলমকে। তিনি ৩ শাখার ঋণ জালিয়াতির তদন্ত প্রতিবেদন সংগ্রহ করেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। জালিয়াতির মাত্রা ব্যাপক হওয়ায় বিশেষ টিম গঠন করে অনুসন্ধানের প্রস্তাব পেশ করা হয়েছিল কমিশনে। পরে কমিশন উপ-পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বে একটি টিম গঠন করেছিল। টিম লিডার শিবলী ওই সময় হলমার্ক কেলেঙ্কারি অনুসন্ধানে ব্যস্ত থাকায় অভিযোগটি অনুসন্ধানের জন্য উপ-পরিচালক আবুল হোসেনকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি কাজ শুরুর কয়েকদিন পর আবারও উপ-পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হেসেনের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি টিম গঠন করা হয়।
প্রসঙ্গত, এসব অনিয়ম, দুর্নীতির ও ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে বেসিক ব্যাংকের এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বছরের ২৫ মে তাকে অপসারণ করা হয়। একই সঙ্গে তার ওপর আগামী দুই বছর অন্য কোনো ব্যাংকে দায়িত্ব পালনেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় সে সময়।

