অর্থনৈতিক প্রতিবেদক : ‘দেইখ্যা লন দুইশ, বাইচ্ছা লন দুইশ’- সবারই কমবেশি পরিচিত এ সুরে ও ছন্দে হাঁকডাক করে ক্রেতা আকর্ষণ করে চলেছেন ফুটপাতের হকাররা। হকারদের সমস্বরে হাঁকডাক ও তাদের ছন্দের দ্যোতনায় গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে চলছে মেলার আমেজ। এখানে সব পণ্যের দামই যে দুইশ টাকা তা নয়। নানা দামে, নানা দরে পাওয়া যায় শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবি ও জুতাসহ নানা পণ্য। তবে সবই মিলছে এক দামে। বিক্রেতা তার পণ্য যত দিয়ে বিক্রি করতে চান তিনি তত দরই হাঁকছেন- দেইখা লন…বাইচ্ছা লন…।
মঙ্গলবার ভর দুপুর। সবাই যে যার মতো ব্যস্ত। রাজধানীর গুলিস্থান যেন আরো ব্যস্ত এলাকা। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ চত্বরে অন্য দিনগুলোতে তেমন দোকানের দেখা মেলে না। তবে এবার চিত্র ব্যতিক্রম। এই চত্বরে বসেছে অর্ধ শতাধিক ভাসমান কাপড়ের দোকান। এখানে প্রতিদিন চলছে হরদম বেচাবিক্রি। কাঠের খাট বিছিয়ে তার উপর রাখা হয়েছে পণ্য। হাঁকডাকের তালে তালে চলছে বেচা-বিক্রি।
দেইখ্যা লন-বাইচ্ছা লন- ছন্দে বেশ জোরেসোরেই হাঁকডাক করে নতুন পাঞ্জাবী কেনার জন্য ক্রেতা আকৃষ্ট করছেন গুলিস্থান ফুটপাতের কাপড় ব্যবসায়ী সুজন মিয়া। তার সঙ্গে যোগ দিয়ে গলার মেলাচ্ছেন তার সহকর্মী রিপন।
১০ রমজানের পর থেকেই তারা পাঞ্জাবি বিক্রি শুরু করেছেন। তবে তারাই শুধু নয় তাদের সঙ্গে একই ফুটপাতে আরও কয়েকজন এইভাবেই কাপড় বিক্রি করছেন। শুধু গুলিস্তান নয়, এমন চিত্রের দেখা মিললো মতিঝিল এলাকায়ও। সেখানেও ভাসমান দোকানিরা হাঁকডাক করে পাঞ্জাবি বিক্রি করছেন। দুই মার্কেটের দামের পার্থক্যও নেই তেমন একটা।
এখানকার দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ‘এসব পাঞ্জাবি সুতি কাপড় দিয়ে তৈরি। হাতে ও গলায় রয়েছে কারুকাজ। মানেও খুব একটা খারাপ নয়। তবে ছোট-বড়, তরুণ-বৃদ্ধ ভেদে ডিজাইনে ভিন্নতা রয়েছে। যার যেটা পছন্দ সেটা কিনে নিচ্ছেন ক্রেতার। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য এসব পাঞ্জাবি সাধ্যের মধ্যে কেনাকাটার মতই।
দুইশ থেকে তিনশ টাকায় মাঝারি মানের এবং পাঁচশ টাকায় বেশ ভাল মানের পাঞ্জাবি পাওয়া যায় বলে জানালেন এখানকার দোকানি আব্বাস উদ্দিন। তিনি আরও জানান, পাঞ্জাবি কিনতে এসে ক্রেতারা তাদের পাঞ্জাবির সঙ্গে শিশুদের জন্যও পাঞ্জাবি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। মাত্র পাঁচশ টাকায় শিশুদের পাঞ্জাবি ও পাজামা পাওয়া যাচ্ছে বলেও জানালেন তিনি।
এখানে পাঞ্জাবির পাশাপাশি পাওয়া যায় বড়দের পাজামাও। আর এসব পাজামার দাম বেশ নাগালের মধ্যেই। মাত্র দেড় থেকে দুই টাকা। ফলে স্বল্প আয়ের ক্রেতারাও হুমড়ি খেয়ে কিনছেন এসব পাজামা।
পাঞ্জাবি কিনে যাওয়ার সময় কথা হলো যাত্রাবাড়ীর একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের সহকারী শিক্ষক আব্দুল্লাহ আরিফের সঙ্গে। তিনি জানান, তার আয় খুব কম। আর এই আয় দিয়ে বড় মার্কেট থেকে দামি পাঞ্জাবি কেনা তার পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব নয়। তাই কয়েক বছর ধরে তিনি এই মার্কেটেই পরিবারের অন্যদের জন্য ঈদের কেনাকাটা সারেন।
বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের রাস্তা ধরেই হেঁটে যাচ্ছিলেন শনির আখড়ার আকতার হোসেন। শিশুর পাঞ্জাবি দেখেই তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং দেখে পছন্দসই তার তিন বছরের শিশু রাইয়ানের জন্য একটি পাঞ্জাবি ও পাজামা কিনলেন।
মতিঝিলের ফুটপাতেও এবার জুতা ও কাপড়ের পাশাপাশি পাঞ্জাবির দেখা মিললো। এখানে বৌদ্ধ মন্দির এলাকা থেকে আসা রুহুল আমিন জানালেন, তার দুই ছেলের জন্য তিনি দুটি পাঞ্জাবি কিনেছেন।
মতিঝিলের এ ফুটপাতে কয়েক বছর ধরে অন্য কাপড় বিক্রি হতো। তবে এবার পাঞ্জাবির দোকান বসেছে প্রচুর। এখানে পাঞ্জাবি বেশ ভালই চলছে বলে জানালেন দোকানি আসলাম। আসলামের মতোই অনেক দোকানি এবার অন্য কাপড় বিক্রি না করে শুধুই পাঞ্জাবি ও পাজামা বিক্রি করছেন।
শুধুই পাঞ্জাবি বিক্রি করার কারণ জানতে চাইলে তারেক হোসেন নামের এক দোকানি জানান, ঈদে শার্ট ও গেঞ্জির চেয়ে পাঞ্জাবির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তাই এই সুযোগটাকেই তিনি কাজে লাগিয়েছেন। আবার ঈদ শেষ হলে আগের ব্যবসায় ফিরে যাবেন বলেও জানালেন তিনি।

