আন্তর্জাতিক ডেস্ক : গণমাধ্যমগুলোয় শুনতে পাওয়া যায় আজ এখান থেকে তো কাল ওখান থেকে অমুক তমুক যোগ দিয়েছে ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে। অনেকেই জানেন না, এর বিপরীতটাও ঘটছে, অর্থাৎ ইসলামিক স্টেটবিরোধী শিবিরেও বিভিন্ন দেশ থেকে গিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে যোগ দিচ্ছে বেসমারিক মানুষ, যদিও অনুপাত বা সঠিক পরিসংখ্যান জানা নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ বিশ্বের বহু দেশ থেকেই তরুণরা যুদ্ধের জন্যে সমবেত হতে চাইছে, হচ্ছেও বটে, বিশেষত কুর্দি সেনাবাহিনী পেশমেগরার সঙ্গে, আর পেশমেগরা যে তাদের উদ্বাহু হয়ে গ্রহণ করছে তা নয়, অভ্যর্থনাটা হচ্ছে শীতল, কিন্তু তারপরও ভিনদেশী তরুণদের আগ্রহে ভাটা পড়ছে না কোনো। তরুণরা আইএস সম্পর্কিত যে সমস্ত অনৈকতার চর্চা শুনতে পেয়ে তাদের মুখোমুখি হতে চাইছে, তাতে সামান্য শীতল অভ্যর্থনা তাদের ফেরানোর জন্যে যথেষ্ট নয়।
তরুণরা বানের মতো আসছে বটে, কিন্তু পেশমেগরার সেনানীরা কী বলছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তারা বলছে, প্রয়োজন আরও এবং আরও অস্ত্র, নতুন মানুষ নয়। নতুন মানবসম্পদের প্রয়োজন যে নেই তা কিন্তু নয়, কারণ সম্মুখযুদ্ধে কী বিমানহামলায় পেশমেগরার সেনারা তো মারা যাচ্ছে প্রতিনিয়ত, কিন্তু বেসামরিক অপ্রশিক্ষিত মানবসমাজ থেকে উঠে আসা এক দুঃসাহসী তরুণ; তা সে যতই দুঃসাহসী হয়ে থাকুক না কেন; একজন প্রশিক্ষিত সেনার মতো তৎপরতা দেখাতে তো পারে না। উপরন্তু সহযোদ্ধাদের জন্যে অনেক সময় সমস্যা সৃষ্টি করে, যদিও তাদের কিছু শিখিয়ে পড়িয়েও কাজে লাগানো যায়। বিশেষত গুপ্তচরবৃত্তির কাজে। কিংবা সাঁজোয়াগুলোকে পেছনে থাকলে তাদের মনে যখন বাড়তি সাহস ভর করে, তখন তারা ঠিক ততোটা খারাপ দেখায় না।
এ সংক্রান্ত একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক গণমাধ্যম ইনডিপেন্ডেন্টে, ঐ মুখপত্রের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল অমন যোদ্ধাদের একজনের সঙ্গে, নিজেকে স্কট বলে পরিচয় দিয়েছে ঐ সৈনিক। মিনেসোটার ছেলে। আইসিস ফ্রন্ট থেকে আধমাইলেরও কম দূরত্বে তাঁবু ফেলা পেশমেগরা সেনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে চলেছেন। মিনেসোটায় থাকতে যখন শুনেছেন অন্যায়ভাবে অপর দেশের ভূমি দখল করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বিতাড়িত ও মাথা কেটে হত্যা করে নারীদের দাসী বানিয়ে দুর্বার গতিতে অগ্রসর হচ্ছে একদল মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণাতাড়িত এবং শুধুমাত্র আধুনিক অস্ত্র ছাড়া আর সব রকম আধুনিকতা থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন রাখা একদল কঠিন হৃদয়ের মানুষ, তখন তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার প্রয়োজন অনুভব করেন ত্রিশ বছরের স্কট। তার মতো আগ্রহী ছিল আরও অনেকেই, যে কারণে পেশমেগরার সঙ্গে যোগাযোগ হতে বেশ বেগ পেতে হলেও ইচ্ছেশক্তির কাছে সব বাধা পরাজিত হয়েছে।
পেশমেগরা নিয়ন্ত্রণক মন্ত্রকের পক্ষ থেকে বিশেষ মুখপাত্র হেলগার্দ হেকমত কুর্দিস্তানী কর্তৃপক্ষের মতটি জানিয়েছেন। বিদেশ থেকে আসা তরুণরা কখনও রণাঙ্গনের প্রথম সারিতে থেকে যুদ্ধ করতে পারবে না, কারণ তাতে পেশাদার পেশমেগরা যোদ্ধাদের বেশ অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। এমন নীতির ছায়া কুর্দি সেনাদের কর্তৃত্বময় চোখেও পড়ে বৈকি। এরপরও দিনের শেষে কুর্দিরা নিরুৎসাহীতও করতে চায় না ওদের। কারণ প্রাণ দিয়ে যুদ্ধ করার মানসিকতার পাশাপাশি তারা একটা তরুণসুলভ উন্মাদনা নিয়ে আসে, যেটা প্রকারান্তরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পুরো সেনাবাহিনীতে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্বদেশী তরুণদেরও উদ্বুদ্ধ করে। দীর্ঘকাল স্বাধীকারের দাবি নিয়ে লড়তে থাকা কুর্দিদের পাশে যখন ভিনদেশি তরুণেরা অস্ত্র ধরেছে শত্রুনিধনযজ্ঞে, নিঃসন্দেহে ওটা ঐ অঞ্চলের মানুষের মনে একটা প্রচ্ছন্ন কৃতজ্ঞতাবোধেরও জন্ম দেয়, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য। আগতদের সবাই কুর্দি দলগুলোয় যোগ দিচ্ছে তাই নয়, খ্রিস্টান আধাসামরিক দলের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে কেউ কেউ।
পেশমেগ্রার হয়ে যুদ্ধ করার জন্যে কিন্তু বিদেশি তরুণদের কাছে প্রিয় এক রণক্ষেত্র আছে, ওটা তার নেতার গুণে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। নেতার নাম কর্নেল তারিক আহমেদ। তারিক প্রতিদিন অন্তর্জালে সামাজিক যোগাযোগরক্ষার মাধ্যমগুলোয় প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অনুরোধপত্র পাচ্ছেন আগ্রহী তরুণদের, যারা আসতে ইচ্ছুক, তার মুঠোফোনটিও সদাব্যস্ত, ওখানেও লাগাতার বার্তা আসছে। তারিক আহমেদ বেশ হাসিখুশি, আমুদে এবং নবাগতদের প্রশিক্ষণ দিতে বিশেষ সিদ্ধহস্ত আর মাতিয়েও রাখতে পারেন বেশ, সে কারণে তরুণরা তাকে বিশেষভাবে পছন্দ করে, তার অধীনে থেকে যুদ্ধ করতে চায়। যদিও ওদের নিয়ে তারিক আশাবাদী, তারপরও মনে একটা গোপন অপরাধবোধ জেঁকে বসে থেকে থেকে, তা হলো, ভিনদেশের এই ছেলেগুলো নিজেদের পরিবার, পরিচিত সমাজ, নিরাপদ আবাস ছেড়ে তাদের হয়ে লড়তে এসেছে, এবং এখানেই শেষ নয়; কখনও ভুল করে, কখনও বীরত্বের সঙ্গে মারা যাচ্ছে প্রতিনিয়ত, তার চোখের সামনেই। এটা তিনি ঠিক নিতে পারেন না। গ্লানির একটা ধূসর পর্দা তাকে ঘিরে রাখে।
এরই মধ্যে আমোদের উপকরণও পেয়ে যান। তরুণদের বেশিরভাগই আসে ভিডিও গেমসে বীরত্ব ফলানো বিলাসী বেসামরিক মানুষদের দেশ থেকে, যে কারণে এখানকার রণমুখী বাস্তবতা বুঝে উঠতে অনেকেরই বেশ সময় পেরিয়ে যায়। এখানে এসে অনেককেই খোঁজ করতে দেখা যায় মদের দোকান, কিংবা নৈশপ্রমোদকেন্দ্র। এরা স্রেফ অস্পষ্ট একটা অভিযানতাড়না থেকে এখানে এসেছে, মানবপ্রেম বা স্বাধীকার বড় নয়, যেটা বুঝতে পেরে বিরক্ত না হয়ে তারিক আহমেদের কোনো উপায় থাকে না।
ইরাকের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত কুর্দিস্তানের সুন্দরতম শহর আরবিল চিররঙিন। এই ঘোরতর যুদ্ধের বেলায়ও সেনাপ্রধান থেকে শুরু করে সবাই যতটুকু সম্ভব প্রমোদসমর্পন করেন এখানে এসে, কিছুটা হালকা হওয়ার উপকরণ পান সাময়িক আমোদযজ্ঞের ভেতর। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা তরুণদের মধ্যে কম বয়সহেতু পীড়িত মানবতার প্রতি দরদটা নিজস্ব ফ্যাশানচেতনার সঙ্গে একটা মিশেল তৈরি করে, এবং নিজেদের কাছে তার সঙ্গত উপস্থাপনের দাবি তারা রাখে তো বটেই। যে কারণে আরবিলে এসে তারা বাহুতে একটি বিশেষ ট্যাটু আঁকিয়ে নেয়। বেশ নাটকীয় ওটা। তাতে আঁকা থাকে একটা কঙ্কালায়িত নরমুণ্ডু, নিচে আড়াআড়ি দুটো বন্দুক; এটুকু জলদস্যুর স্মারকচিহ্নের মতো হলেও পার্থক্যটা গড়ে দেয় খুলির পেছনে স্বাধীনতার সোনালী সূর্যটা। বলা হচ্ছে, যারা ‘আইসিস হান্টিং ক্লাবে’ আছে তাদের জন্যে এ ট্যাটু আঁকানো আবশ্যক। বাড়তি একটা নাটকীয়তা, একটা রঙের প্রলেপ, যা দিয়ে পরিবার থেকে দূরবর্তী হয়ে অপর দেশের স্বাধীনতার জন্যে লড়াইরত তরুণরা মনের গায়ে সাময়িক বাসন্তী হাওয়া লাগিয়ে, বীরোচিত ঔদার্যে শেলের সামনে বুক পেতে দেয়ার প্রেরণা নেয়।

