পটুয়াখালী প্রতিনিধি : শিশু বয়স, কিন্তু তাতে কি। সিগারেট দিয়েই শুরু করে শিশুরা জড়িয়ে পড়ছে মাদকে সেবনে। মাদকের নেশায় পিছিয়ে নেই পটুয়াখালীর চরাঞ্চরের শিশুরাও। লোকজনের আড়ালে সিগারেট কিংবা বিড়ি জ্বালিয়ে নেশা করছে।
এভাবেই মাদকের নেশায় পটুয়াখালীর শহর ও এর আশপাশের শিশুরাই আজ বিপথগামী। কেউ বিড়ি, কেউ সিগারেট, কেউবা আবার ইয়াবা ও ফেনসিডিল সেবন করে নীল হয়ে যাচ্ছে। কেউ নেশা করছে শখের বসে, কেউবা আবার অজ্ঞতাই জড়িয়ে পড়ছে। পটুয়াখালীর বিভিন্ন স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া কিংবা পথশিশুরা এসব নেশার টানে বিভোর। সিগারেট দিয়ে শুরু করে জড়িয়ে পড়ছে অন্যান্য মাদকে সেবনে।
১৫ বছরের সবুজ (ছদ্মনাম)। ঢাকায় মৃৎ শিল্পের ব্যবসা করে। বাড়ি পটুয়াখালীর শহর সংলগ্ন লাউকাঠী এলাকায়। শহরের নিউ মার্কেট এলাকার একটি খাবার হোটেলে এসে সবুজ এক শলাকা সিগারেটে আগুন জ্বালিয়ে দিল। প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট বসে থেকে আরেকটি সিগারেট জ্বালায় সে। কত বছর থেকে সিগারেট সেবনের অভ্যাস জিজ্ঞেস করতেই সবুজ বলে, ‘আরও দুই তিন বচ্ছর আগে হইতে সিকারেট খাই।’
এখন বয়স কত জানতে সহজ সরল উত্তর ’১৪ অথবা ১৫ অইবে।’ সিগারেট খাও কেন এমন প্রশ্নের জবাবে সবুজ বলে, ‘ব্যবসা করি তো সিকারেট খাওয়া লাগে।’
শুধু সবুজ নয় পটুয়াখালীর বিভিন্ন স্কুলগামী শিশুরাও ক্লাস ফাঁকি দিয়ে লোকজনের আড়ালে সিগারেট ও মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। শহরের লতিফ স্কুল রোড এলাকার এক অভিভাবক নাম গোপন রাখার শর্তে জানান, তাঁর স্কুল পড়ুয়া ছেলে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে প্রথমে সিগারেটের নেশায় জড়িয়ে পড়ে। পরে অন্যান্য নেশায় জড়িয়ে না বাঁচার উপক্রম হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর সুস্থ হয় তার ছেলে। এ ঘটনার পর থেকে ছেলেকে সার্বক্ষণিক চোখে চোখে রাখেন পরিবারের সদস্যরা।
তিনি আরও জানান, স্কুল কিংবা কলেজ পড়ুয়া প্রত্যেক ছেলে-মেয়েকে সব বাবা-মায়ের উচিত কঠোর নজরদারীতে রাখা। এছাড়াও শিশুদের কাছে সিগারেট কিংবা বিড়ি বিক্রি করা আইনগত ভাবে নিষিদ্ধ থাকলেও সে আইন মানেন না দোকানীরা। এ কারণে ছোটরা খুব সহজে সিগারেট ও মাদক জাতীয় নেশা সংগ্রহ করতে পারে। দোকানী, অভিভাবক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবাই যে যার অবস্থানে থেকে নৈতিক দায়িত্ব পালন করলে শিশুদের নেশায় জাড়িয়ে পড়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে।
তবে শহরের শ্রমজীবী অভিভাবকদের অধিকাংশ শিশু সন্তানেরা ১০ থেকে ১২ বছর বয়সে সিগারেট কিংবা বিড়ি সেবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। অভাবকে তাড়াতে গিয়ে সারাদিনে সন্তানদের খোঁজ নেয়ার সময় হয়ে ওঠে না। এ কারণে ওইসব শিশুরা খুব দ্রুত মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ে।
সদর উপজেলার লোহালিয়া এলাকার বাসিন্দা দিনমজুর মো. মোসলেম খাঁ (ছদ্মনাম) বলেন, ‘হারাদিন কামাই করতে শহরে পইরগা থাহি ভাই। একটা মাইয়া দুইডা পোলা অগো খোঁজ লওনের সোমায় পাই না। আমার বড় পোলা রফিক (১২) (ছদ্মনাম) অয় বিড়ি না সিকারেট খাইছে কান্দার (এলাকার) লোকজোনে কইলে। আমি হ্যাগোরে কইছি আবার দ্যাখলে ঠ্যাং ভাইংগা দেবা। বাপ-মায় ধারে না থাকলে গুরাগ্যারা ভাল অয় না।’
শুধু শহরে নয় চরের শিশুরাও জড়িয়ে পড়ছে মাদকের নেশায়। নিজের ধূমপানে জড়িয়ে পড়ার বর্ণনা দিল দশমিনা উপজেলার চর হাদির মো. হাছিব (১৩) (ছদ্মনাম)। তার বক্তব্য, ‘হারাদিন নদীতে থাহি, মাছ ধরি পানিতে শইলডা (শরীর) ভিজ্জা যায়। বিড়ি সিগাকারেটে টান দেলে শইলডা গরম অয়। এক বচ্ছর আগের তোন বিড়ি খাই। প্রথম চুরি কইরা খাইছি। এ্যাহন দোকান তোন কিন্না খাই।’
হাছিবের বড় ভাই শফিকুল (১৫)(ছদ্মনাম) তিন বছর আগে সিগারেটের নেশায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। হাছিব কিংবা তার ভাই শফিকুলের মত পটুয়াখালী বিভিন্ন চরের হাজারো শিশু মাদকের ভয়ানক নিকোটিন দিয়ে বুকের মধ্যে বিষের জাল বুনছে। চর ওয়াডেলের হানিফ (ছদ্মনাম) (১৪) এখন নিয়মিত ধূমপান করে। তার বাবা সেরাজ মিয়া (ছদ্মনাম) (৩৫) একজন নিয়মিত ধূমপায়ী। দিনমজুর এ লোকটির সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই তার ছেলে হানিফ কাজের যোগান দিয়ে আসছে। নিজের ধূমপানের নেশা উঠলে প্রায় সময় ছোট ছেলে হানিফকে বলতেন বিড়িতে আগুন জ্বালিয়ে নিয়ে আসার জন্য। বাবার বিড়ির আগুন জ্বালাতে গিয়ে তাতে টান দিতে হতো এভাবেই শিশু বয়স থেকে হানিফ ধূমপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
অল্প বয়সে শিশুদের ধূমপানে জড়িয়ে পড়া সম্পর্কে পটুয়াখালী সদর হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. আতিকুর রহমান বলেন, ‘শিশু বয়স থেকে ধূমপান খুবই ভয়াবহ। এতে করে প্রথমেই বাঁধাগ্রস্ত হয় শিশুর মানসিক ও দৈহিক বিকাশ। এছাড়াও অল্প বয়সে ব্রঙ্কাইটিস রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশী থাকে। শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের ক্যান্সার, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়া, যক্ষা, গ্যাস্ট্রিক আলসার, বার্জার ডিজিসসহ সিওপিডি রোগ হতে পারে। এজন্য জনসচেতনতা, অভিভাবকদের বেশী দায়িত্বশীল হওয়া, তামাকজাত পণ্য বিক্রেতাদের নৈতিকভাবে সচেতন হওয়া ছাড়া শিশুদের এ পথ থেকে ফেরানোর বিকল্প নেই।
পটুয়াখালী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক বলেন, ‘আইন দিয়ে সব অপরাধ দমন করা যায় না। শিশুদের ধূমপান বন্ধে প্রয়োজন সচেতনতা। কারণ দোকানীরা লাভের আশায় অপ্রাপ্ত বয়স্কদের কাছে বিড়ি সিগারেট বিক্রি করে। এজন্য অভিভাবকসহ ওই ব্যবসায় জড়িতদের সচেতনতার বিকল্প নেই।’

