কক্সবাজার প্রতিনিধি : বর্তমান সময়ে আলোচনার শীর্ষ বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে মানবপাচার। থাইল্যান্ডের গহীন জঙ্গল থেকে পাচার হওয়ার লোকজনের গণকবরের সন্ধান মেলার পর থেকে এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। প্রতিনিয়ত সাগর এবং বিভিন্ন দেশের উপকূল থেকে পাচার হয়ে যাওয়া বিপন্ন লোকজন উদ্ধার হওয়ায় বিষয়টি ‘টপ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ এ পরিণত হয়েছে। এ নিয়ে নড়েচড়ে বসে জাতিসংঘসহ পুরো বিশ্ব। পরিস্থিতি যখন এমন পর্যায়ে তখন কি অবস্থায় আছে মানবপাচারের রুট বাংলাদেশের কক্সবাজার? এমন প্রশ্নই স্বাভাবিক!
থাইল্যান্ডে গণকবরের সন্ধান পাওয়া পর সর্বাগ্রে আলোচনায় উঠে আসে কক্সবাজার। কেননা বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক কক্সবাজারে সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ উপকূল দিয়ে স্বপ্নে দেশ মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছে। দ্বিতীয়ত, মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের মূলহোতারা প্রায়ই কক্সবাজারের বাসিন্দা। সে কারণে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে শীর্ষ আলোচিত মানপাচারের সঙ্গে কক্সবাজারও আলোচিত হচ্ছে। এ ধারা থেকে বর্তমানে কক্সবাজারের সর্বস্থরের লোকজনের মধ্যে একমাত্র আলোচনায় মানবপাচার বিষয়টি।
একটু খানি পেছন ফেরা: সাগরপথে মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের বাংলাদেশের একমাত্র রুট সীমান্ত উপজেলা কক্সবাজারের টেকনাফ। এ রুট দিয়ে মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের সূচনা হয় ২০১০ সালে। প্রথম দিকে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি প্রশাসন। পরে স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমাতে গিয়ে সৃষ্টি হয় জটিলতা। মাঝপথে সাগরে বোট ডুবি, জিম্মি করে টাকা আদায়, থাইল্যান্ডের গহীণ জঙ্গলে আটকে রেখে নির্মম নির্যাতন, পাচার করতে অপহরণসহ আরো কয়েকটি কারণ নিয়ে হুট করে মালয়েশিয়া মানবপাচারের বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। এসব বিষয় সরকারের দৃষ্টি এড়ালে নড়ে চড়ে বসে প্রশাসন। এরপর চলে ধরাপাকড়। তারপরও নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি মানবপাচার।
কথিত আছে, সরকারি দলের লোকজনের প্রভাব আর প্রশাসনের বাহিনীর অনৈতিক লেনদেন এবং নীরবতায় বহাল তবিয়তে চলে আসে মানবপাচার। সেই সঙ্গে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হয় নতুন নতুন দালাল। মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের মূলহোতারা সবাই কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া, মহেশখালীর কুতুবজোম, কক্সবাজার সদর ও পেকুয়া-চকরিয়ার। এসব দালালরা দেশব্যাপী ক্ষুদ্র দালালের মাধ্যমে পাচারের জন্য সারাদেশ থেকে মানুষ নিয়ে আসেন কক্সবাজারে।
কষ্টের কাহিনী: খোজঁ নিয়ে জানা গেছে, প্রায়ই স্বপ্রণোদিত হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছেন অনেকে। কিন্তু অনেকে আবার অপহরণ হয়ে মালয়েশিয়ার বোটে উঠতে বাধ্য হয়েছেন। এরকম সংখ্যাও চমকে উঠার মতো! বিভিন্নভাবে প্রলোভনে ফেলে অনেককে জোর করে দালালরা উঠিয়ে দিয়েছেন মালয়েশিয়াগামী বোটে। তারপর থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের আস্তানায় জিম্মি করে টাকার জন্য ফোন করা হয় পরিবারে কাছে। কিন্তু প্রস্তুতিহীন নিরুপায় পরিবারের তখন কিছুই করার থাকে না। আটকে পড়া ও নিহত মালয়েশিয়াগামীদের মধ্যে সবাই এই ‘নিরুপায়’ পরিস্থিতির শিকার হয়ে নির্মম পরিণতি ভোগ করেছেন।
থাইল্যান্ডের জঙ্গলে অত্যাচারের শিকার হয়ে ফিরে আসা কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক এলাকার ছৈয়দ নুর জানান, থাইল্যান্ডের নির্জন জঙ্গলে গাদাগাদি করে শুইয়ে রাখা হয়। সেখানে টাকার দাবিতে দালালরা নির্মম নির্যাতন করেন বন্দীদের। দেয়া হয় না খাবার; মারা হতো লোহার চেইন দিয়ে। নির্যাতন ও খাবার না পেয়ে অনেকে মারা যায়। আবার অনেকে গুরুতর অসুস্থ হয়। তাদের গণকবের কবর দেয়া হতো।
ছৈয়দ নুর আরও জানান, সেন্টমার্টিন সাগর উদ্ধার হয় ১১৬ জন মালয়েশিয়াগামী। উদ্ধার হওয়া এসব ভুক্তভোগীরা তাদের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন এভাবে ওই বোটে প্রায় দু’মাস ধরে তারা সাগরে ভাসমান অবস্থায় ছিলেন, মূলত দালালদের দাবিকৃত টাকা না দিলে এভাবে সাগরে ভাসিয়ে রাখা হয়। সেখান থেকে যারা টাকা জোগাড় করে দিতে পারতো তাদের অন্য বোটে করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া জাহাজে তুলে দেয়া হতো। এর মধ্যে দেয়া হতো না পর্যাপ্ত খাবার ও পানি। খাবার না পেয়ে অনেকে অসুস্থ হয়ে মারা যেত। আবার গুরুতর অসুস্থদের সাগরে ফেলো দেয়া হতো। ওই বোট থেকে এ রকম ৭ জনকে সাগরের ফেলে দেয়ার কথা জানিয়েছেন উদ্ধারপ্রাপ্তরা।
কেন বন্ধ হচ্ছে না পাচার?: প্রশাসনের নজরদারি সত্ত্বেও বন্ধ করা যায়নি মানবপাচার। এর জন্য খোদ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, মানবপাচার বন্ধ না হওয়ার মূলে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব ও স্থানীয় প্রশাসনের লোকজন। তারা প্রশাসনকে চাপ ও আর্থিকভাবে বশে নিয়ে মানবপাচার অব্যাহত রেখেছে। এর সঙ্গে জড়িত সরকারের দলের নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তাদের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে অপ্রতিরোধ্য রয়েছে মানবপাচার।
পুলিশের ভাষ্য: জেলা পুলিশ সূত্র মতে, ২০১২ সালে মানবপাচারবিরোধী আইন পাশ হলে কঠোর হয় প্রশাসন। সেই থেকে সর্বশেষ সময় পর্যন্ত কক্সবাজারে মানবপাচারের ৩০৬টি মামলা হয়েছে, এসব মামলায় আসামি ১৫৩১ জন। গ্রেপ্তার হয়েছে ৪৭৭ জন। একই সঙ্গে উদ্ধার করা হয়েছে ৩১ হাজার ৬০ জন মালয়েশিয়াগামী।
সম্প্রতি সময়ে থাইল্যান্ডের গহীন জঙ্গলে বাংলাদেশ-মায়ানমারের অধিবাসীদের গণকবর সন্ধান পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসে কক্সবাজারের স্থানীয় প্রশাসন। মানবপাচারকারীদের গ্রেপ্তারে শুরু হয় তোড়জোড়। এর মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তৈরি করা হয় মানবপাচারকারীদের তালিকা। এই তালিকা ধরে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশকে সামনে শুরু হয় অভিযান। সর্বশেষ তথ্য মতে, কক্সবাজারের ২৫০ মানবপাচারকারীকে চিহ্নিত করেই পুলিশ অভিযান পরিচালনা করছে।
‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ৫ মানবপাচারকারী: পুলিশ কঠোর হলে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ এরই মধ্যে জেলার ৫ শীর্ষ মানবপাচারকারী নিহত হয়েছেন। ৮মে টেকনাফে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন টেকনাফের শীর্ষ তিন মানবপাচারকারী। তারা হলেন- শাহপরীরদ্বীপ বাজারপাড়ার ধলু হোসেন ওরফে ধলু মাঝি (৫৫), কাটাবুনিয়ার জাহাঙ্গীর আলম (৩০) ও হারিয়াখালী জাফর আলম (২৫)। এরপর ‘বন্দুকযুদ্ধে’ উখিয়া নিহত হয়েছেন বহুল আলোচিত মানবপাচারকারী জাফর আলম ওরফে জাফর মাঝি। ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন শীর্ষ মানবপাচারকারী কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল ইউনিয়নের কাওয়ারপাড়া গ্রামের মোস্তাক আহমদের ছেলে বেলাল হোসেন।
অধরা পাচারকারীরা: বরাবরের মতোই অধরা থেকে যাচ্ছে মানবপাচারকারীরা। একাধিক মামলার আসামি হয়েও এতদিন পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন এসব অপরাধীরা। কিন্তু সম্প্রতি পুলিশি তৎপরতা ও ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা ঘটলে গা ঢাকা দিয়েছে সব মানবপাচাকারী। দাবি মতে, পুলিশ তৎপরতা চালালেও করলেও স্বররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ২৫০ জন মানবপাচারীর নাগাল পাচ্ছে না!
সর্বশেষ অবস্থা: থাইল্যান্ডের গহীণ জঙ্গলে মালয়েশিয়াগামী বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের গণকরের সন্ধান পাওয়ার পর দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় এক হাহাকার। কেননা দীর্ঘদিন নিখোঁজ অনেক মালয়েশিয়াগামীর স্বজনরা এ খবরে আতকে উঠেন। এত দিন নিখোঁজ থাকলেও আশাবাদী স্বজনরা এখন অনেকটা মিইয়ে গেছেন। এতগুলো গণকবরে নিশ্চয়ই তাদের স্বজনরা থাকতে পারে! এ আশঙ্কায় মালয়েশিয়াগামী নিখোঁজদের ঘরে ঘরে চলছে আকাশ ভাঙা আহাজারি। পরিবারের একমাত্র অধিকর্তার এমন পরিণতি মনে করে স্বজনরা একেবারে ভেঙে পড়েছেন। একই সঙ্গে প্রতিক্ষণে নিখোঁজের তালিকায় বাড়ছে সংখ্যা।
সার্বিক প্রসঙ্গে কক্সবাজার পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার নাথ বলেন, ‘মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। পুলিশ পাচারকারীদের তালিকা হাতে নিয়েই কাজ করছে। তিনি মানবপাচারকারীদের ধরতে সর্বোচ্চ অবস্থানের কথা জানান।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, ‘মানবপাচার দেশের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবপাচারের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। তাই মানবপাচার রোধে আইন প্রয়োগকারিসংস্থাকে কঠোর নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। পাশপাশি নিখোঁজদের উদ্ধারে কাজ চলছে।’

