চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : নিরাপদ ও আরামদায়ক হিসেবে রেলপথে ট্রেন ভ্রমনকে যাত্রীরা প্রথম পছন্দে রাখলেও বাংলাদেশ রেলওয়ে সেই আরাম দিতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। কয়েকদফা টিকিটের দাম বাড়ালেও নিশ্চিত করতে পারেনি যাত্রী সেবার বিষয়টি। এমনকি মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে পৃথক রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠনের পর কয়েকটি প্রকল্প হাতে নিয়ে ট্রেনের টিকিটের দাম বাড়ালেও যাত্রী সেবার মান বাড়াতে পারেনি নতুন এই মন্ত্রণালয়ও।
যাত্রীসেবার মান নিয়ে রেলওয়ের প্রধানতম বিলাসবহুল ও দামী ট্রেন সুর্বণ এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রীসেবার সরেজমিন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
গত ২৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ৭০২ নম্বর সুবর্ন এক্সপেসে চেপে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ভ্রমণ করেন সংগঠনটির পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। তারা কথা বলেছেন ওই ট্রেনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে। শুনেছেন ট্রেনের যাত্রীদের অভিযোগগুলো।
সরেজমিনে পর্যবেক্ষণকালে রেলের বগি, আসন, বাথরুমের অবস্থা, ক্যান্টিনে খাবারের মান, বেসরকারী স্টুয়ার্ড, ক্লিনার, বেয়ারারদের অবস্থা, পরিস্কার পরিছন্নতাসহ সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি যাত্রীসেবার মান নিয়ে যাত্রী, গার্ড, কর্তব্যরত কর্মকর্তা, কর্মচারী, পুলিশের দ্বায়িত্বরত কর্মকর্তা ও সদস্যদের সাথে তারা কথা বলেছেন।
এসময় যাত্রীরা অভিযোগ করেন, ভাড়া অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেলেও রেলের যাত্রী সেবার মান দিন দিন ক্রমাবনতি হচ্ছে। ২০১২ সালে রেলের ভাড়া বৃদ্ধির সময় যাত্রী সেবার মান বৃদ্ধির যে অঙ্গীকার সরকারের পক্ষ থেকে যাত্রীদের কাছে করা হয়েছিল তা রক্ষা করা হয়নি।
সুবর্ণ এক্সপ্রেসের মান পর্যবেক্ষণ করার পর যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ট্রেনটির সিট ভাঙ্গা, সিটের গিয়ার স্প্রিং নষ্ট, হাতল নষ্ট, সিটের ফোম নষ্ট থাকায় যাত্রীরা আরামদায়ক ভাবে বসতে পারে না। বাথরুমের দরজার লক নষ্ট, ভিতরে পানির লাইন নষ্ট, বেসিনে পানির পাইপ নষ্ট, লাইট নষ্ট থাকায় বাথরুম ব্যবহার করা যায় না। কাউন্টারে টিকিট পাওয়া যায় না বলে যাত্রীরা কালোবাজারী থেকে চড়া দামে টিকিট কিনতে বাধ্য হয়। এসি বগিতে এসি নষ্ট, এসির পানি পড়ে, সিট ও মেঝে ভিজে র্দূগন্ধ ছড়ায়।
স্টুয়ার্ডরা বেতন পায় না বলে টিকিট কালোবাজারী ও যাত্রীদের কাছ থেকে অবৈধ সুযোগ সুবিধা আদায়ে ব্যস্ত থাকায় যাত্রীরা কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দরজা/ জানালা কাচ ভাঙ্গা, লক নষ্ট থাকায় যাত্রী নিরাপত্তা ব্যহত হচ্ছে। প্রতিটি সিটের টি-ট্রে নষ্ট থাকায় তা ব্যবহার অনুপযোগী, ট্রেন চলাকালীন সময় যাত্রীদের গায়ে খুলে পড়ে। অনির্ধারিত স্থানে ট্রেন থামিয়ে অবৈধ পন্য উঠানো নামানো হয়। নিন্ম মানের খাদ্য অত্যাধিক দামে বিক্রি করাহয়। কর্তব্যরত স্টুয়ার্ড, বেয়ারার, পুলিশ, রেলওয়ে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা নেইম প্লেটবিহীন অবস্থায় দ্বায়িত¦ পালন করে। ছারপোকা, তেলাপোকা উপদ্রোপ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি। এসি বগির যাত্রীরা তাদের কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে যেমন ( সাবান, টাওয়েল, এয়ার ফ্রেশনার)। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নানান অনিয়মের মাধ্যমে রেলের দীর্ঘ দিনের অর্জিত সুনাম ভূলন্ঠিত করছে।
যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে যাত্রী কল্যাণ সমিতির সুপারিশ মালাগুলো হচ্ছে-রেলের টিকিট কালোবাজারী বন্ধে জাতীয়তা সনদ/ মোবাইল নাম্বার সহ যাত্রীর স্ব-স্ব নামে টিকিট ইস্যু করা। বেসরকারী অপারেটর প্রতিষ্ঠান কি কি যাত্রী সেবা প্রদান করবে এবং যাত্রীরা কি কি সহযোগিতা তাদের থেকে নেবে তার একটি তালিকা রেলের প্রত্যেক বগিতে টাঙ্গানো এবং ট্রেনের টিভির স্ক্রিনে প্রদশনের ব্যবস্থা করা। প্রতিটি খাদ্য দ্রব্যেও মান মাঝে মাঝে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা এবং মূল্য তালিকা অনুযায়ী মেমো দ্বারা মূল্য আদায়ের ব্যবস্থা করা।
উন্নত যাত্রী সেবার স্বার্থে ক্যান্টিনে ফ্রিজ ও ওভেন জরুরী ভিত্তিতে চালুর ব্যবস্থা করা। নিয়মিত ভাবে প্রতি সপ্তাহে ট্রেনের বগি চেক করে কোন বগিতে কি সমস্যা আছে তা চিহ্নিত কওে সমাধানের ব্যবস্থা করা। নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে প্রতিটি ট্রেনে পুলিশ সদস্য বৃদ্ধি করা এবং যাত্রীর নিরাপত্তায় কোন গাফিলতি হচ্ছে কিনা তদারক করা। জরুরী ক্ষেত্রে যাতায়াতকারী যাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে ভারতের ন্যায় তৎকাল টিকিটের ব্যবস্থা করা। রেল কর্তৃপক্ষ ও যাত্রী প্রতিনিধির সমন্ময়ে যাত্রী সেবার মান পরিদর্শন টিম গঠন করা।

