পাঞ্জেরী ডেস্ক : একাত্তরের উত্তাল মুহূর্তগুলো তখন বর্তমান। বন্দিশিবিরে গেরিলা যোদ্ধা আজাদের উপর চলছিল নির্মম নির্যাতন। পাক বাহিনী আজাদের কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য জানতে চায়। কিন্তু আজাদের কাছ থেকে কোনো তথ্যই বের করতে পারে না পাকিস্তানিরা। একদিন আজাদকে বন্দিশিবিরে দেখতে গেলেন মা সাফিয়া বেগম। পাক বাহিনীর নির্যাতনে মলিন হয়ে যাওয়া ছেলের মুখে বুলিয়ে দিলেন মমতার পরশ। মাকে বলা হয়, ছেলে যদি সবার নাম-ধাম বলে দেয় তবে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। দৃঢ়চেতা জননী ছেলেকে আদেশ দিয়েছিলেন-মরে গেলেও যেন কিছু না বলে। আজাদ মুখ খুলেনি। ক্লান্ত আজাদ মায়ের কাছে আব্দার করে বলেছিল- ‘মা দুদিন ভাত খাই না, ভাত নিয়ে এসো।’ মা পরের দিন ভাত নিয়ে হাজির হন বন্দিশিবিরে। কিন্তু ছেলের আর দেখা মেলে না। আর কখনো দেখা মেলেওনি। সেই মা জীবনে আর কোনোদিন ভাত খাননি। আরামদায়ক বিছানা ছেড়ে ঘুমিয়েছেন শক্ত মেঝেতে।
সত্য এই কাহিনী সবারই জানা। একাত্তরের বীরযোদ্ধা শহীদ আজাদের মা সাফিয়া বেগমের জীবনকাহিনীর ক্ষুদ্র অংশ এটি। সাফিয়া বেগম- তিনি শুধু আজাদেরই মা নন, একজন মায়ের বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
জগৎ-সংসারের প্রতিটি মা-ই এমন মমতাময়ী, ক্ষমাশীল। প্রয়োজনে দৃঢ়চেতাও। সন্তান হাজার কষ্ট দিলেও মায়ের মুখ থেকে কখনো অভিসম্পাতের নিঃশ্বাস নিঃসৃত হয়না। বরং সকল যন্ত্রণা, গ্লানী মুখ বুঁজে সহ্য করে সন্তানের জন্য প্রতিমুহূর্তের মঙ্গল কামনাতেই তাদের সকল সুখ। সর্বসহা, সর্বহারা জননীর আমৃত্যু আশির্বাণীই সবসময়ের সম্বল সন্তানদের। কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার কবিতায় যথার্থই বলেছেন- ‘সর্বসহা সর্বহারা জননী আমার/তুমি কোনোদিন কারো করোনি বিচার/ কারেও দাওনি দোষ।’
মা- ছোট্ট এই শব্দটির মধ্যে লুকিয়ে আছে কতশত আবেগ, অনুভূতি। রয়েছে আদরের আশ্রয়, শাসনের প্রশ্রয়। মায়ের শ্রেষ্ঠত্ব ‘অমর, অক্ষয়, অব্যয়, অজর’। আজ দিনটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মায়েদের জন্য। আজ ১০ মে রোববার বিশ্ব মা দিবস।
জগতের সবচেয়ে আপন মানুষটিকে আরও বেশি ভালোবাসার, মনে করার দিন আজ। মায়ের প্রতি ভালোবাসার জন্য কোনো বিশেষ দিনের যদিও প্রয়োজন নেই। তবু বিশেষভাবে মায়ের অপার মহিমা তুলে ধরার জন্য প্রতি বছরের মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্ব মা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হবে।
বিশ্বের প্রতি প্রান্তে অন্যান্য দিনের মতো আজও মাকে ভালোবাসবে সন্তানরা। তবে আজ কিছুটা ব্যতিক্রম, আড়ম্বরতায় পূর্ণ, অনুভূতির বিস্তৃতিতে দীর্ঘ এ দিনটি সন্তানদের জন্য নিঃসন্দেহে একটি উত্তম উপলক্ষ। কেউ হয়তো দিনটি উদযাপন করবেন মায়ের হাতে মা দিবসের কার্ড দিয়ে, কিংবা মায়ের প্রিয় রঙের শাড়িটি তার হাতে তুলে দিয়ে। অথবা মাকে চমকে দিয়ে তার প্রিয় খাবারটি নিজের হাতে রান্না করেও সন্তানরা দিনটি উদযাপন করতে পারেন। অপরিশোধ্য মাতৃঋণের বদলে ক্ষণিকের আনন্দ দিয়ে মাকে আজ বলে দিতে পারেন, তাকে কতটা ভালোবাসেন। অথবা কাছে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে হৃদয় থেকে বলে উঠতে পারেন- ‘মা’।
দূরে থাকা মায়ের ছোঁয়া যারা পাবেন না, তারা দ্বারস্থ হবেন মুঠোফোনের। আর মাতৃহারা সন্তান বুকের সব কষ্ট চেপে মনে মনে বলে উঠবে- ‘আকাশের ঐ নীল তারাটি, সে বুঝি মা তুমি/ তাইতো রাতে চুপিসারে এসে আমারে যাও চুমি/ মাঝে মাঝে ঘুমের ঘোরে তোমায় স্বপ্নে দেখি/ জাগিয়া দেখি তুমি নাই পাশে, সবই মিথ্যা ফাঁকি।’
না বললেই নয়, বর্তমানে প্রচলিত এ মা দিবসের সূচনা হয় ১৯০৮ সালে। বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার অ্যানা জারভিস নামের এক স্কুলশিক্ষিকা সেখানকার পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা দেখে মর্মাহত হয়ে মায়ের জন্য বিশেষ দিন পালনের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করার কথা ভাবলেন। তার সে ভাবনা বাস্তবায়নের আগে ১৯০৫ সালের ৯ মে তিনি পরলোক গমন করেন। তার মৃত্যুর পর মেয়ে অ্যানা এম জারভিস মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণের উদ্দেশ্যে কাজ শুরু করেন। বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে ১৯০৮ সালে তার মা ফিলাডেলফিয়ার যে গির্জায় উপাসনা করতেন সেখানে সব মাকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মা দিবসের যাত্রা শুরু করেন।
১৯১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আনুষ্ঠানিকভাবে মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে মায়েদের জন্য জন্য উৎসর্গ করে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়। অনেক দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে মা দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে মা দিবসটি পালনের ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। অবমুক্ত বিশ্ব আর তথ্যপ্রযুক্তির পথ ধরে যেসব অনুষঙ্গ নাগরিক জীবনে এসেছে, মা দিবস তার একটি।

