নিজস্ব প্রতিবেদক : মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ব্যাপকহারে ইয়াবা পাচারের গোয়েন্দা তথ্য বিশ্বাসই করতে পারছেন না বাংলাদেশে সফররত দেশটির প্রতিনিধি দল। মিয়ানমারের কিছু ইয়াবা তৈরির কারখানার তালিকা তাদের হাতে দিয়ে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে এসব কারখানার ইয়াবা বাংলাদেশে পাচার হয়ে আসছে। ফলে এ মাদকদ্রব্যের অপব্যবহারের ভয়ংকর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে।
এদিকে ইয়াবার কারখানার তালিকাসহ সব তথ্যের ব্যাপারেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা। তারা বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের বলেছেন, এসব তথ্য যাচাই করে দেখবে মিয়ানমার। পাশাপাশি তারা ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদকদ্রব্য পাচার নিয়ন্ত্রণে সহায়তাও করবে।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থার মধ্যে দ্বিতীয় দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে বুধবার সন্ধ্যায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) মহাপরিচালক (ডিজি) মো. বজলুর রহমান এসব তথ্য জানিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের বলেছি এখন পর্যন্ত আমাদের সামনে বড় হুমকি ইয়াবা। এটি নিয়ন্ত্রণে আমাদের কী সহায়তা প্রয়োজন, তা আমরা জানিয়েছি। তারা আমাদের এই ইস্যুটি গ্রহণ করেছে। তাদের ভুখণ্ডে কিছু কিচেন ল্যাবের মতো কারখানা আছে। তারা এগুলো বিশ্বাস করতে পারছে না।’
বজলুর রহমান আরও বলেন, ‘আমরা তাদের বলেছি- ভাই তোমরা যাও, দেখ। আমরা তোমাদের চাপ দিচ্ছি না। দেখে ব্যবস্থা নাও। এগুলো ধ্বংস কর। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা এগুলো সনাক্ত করেছে।’
দুই দিনব্যাপী দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে ডিএনসি সদর দপ্তরে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলেরও উপস্থিত থাকার কথা ছিল। তবে সেনা সরকারের বিধি-নিষেধের কথা বলে তারা যৌথ সংবাদ সম্মেলনটি এড়িয়ে যান। কর্মসূচীর শেষভাগে যৌথ ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরের কথা থাকলেও মিয়ানমার প্রতিনিধিরা যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেননি।
ডিএনসি সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে উভয়পক্ষের আলোচিত বিষয়গুলোই যৌথ ঘোষণাপত্রে রয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন আছে বলে সেখানেও স্বাক্ষর করেনি মিয়ানমার দলের প্রধান। তবে এই বৈঠকের ফলে সহযোগিতার মাধ্যমে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ফলপ্রসু হবে বলে মনে করছেন ডিএনসির কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, মিয়ানমার এবার বাংলাদেশকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএনসির ডিজি মো. বজলুর রহমান বলেন, ‘এবারের বৈঠকে প্রথম দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। ১০টি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এর আগেও ইয়াবা কারখানা ও ব্যবসায়ীদের তালিকা দেয়া হয়েছিল। এবার আপডেট তালিকা তাদের দেয়া হয়েছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে ডিজি বলেন, ‘তিন ধরনের তালিকা বা তথ্য আমরা তাদের দিয়েছি। রুট, যারা বিক্রি করে তাদের এবং কিচেন ল্যাবগুলোর। এ ছাড়া সীমান্ত এলাকায় লিয়াজো অফিস স্থাপনের ব্যাপারেও আলোচনা হয়েছে।’
প্রথম দফার বৈঠকেও তথ্য দিয়ে সহায়তা চাওয়া হয়, কার্যত কোনো অগ্রগতি হয়নি- এমন প্রশ্ন করা হলে বজলুর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর হলেও বৈঠক শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে ভাল কিছু আশা করছি। চার বছর পর নতুন করে দরজা খুলছে। এটা খোলা রাখতে চাই।’
তিনি বলেন, চুক্তি অনুযায়ী প্রতিবছর বৈঠক হওয়ার কথা। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তিন বছর পর দ্বিতীয় বৈঠক হলো। ভবিষ্যতে নিয়মিত এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) প্রণব কুমার নিয়োগী বলেন, ‘১৯৯৪ সালে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পর ২০১১ সালে প্রথম বৈঠক হয়। বৈঠক না হলেও আমরা বিভিন্নভাবে যোগাযোগ রক্ষা করার চেষ্টা করছি। এ কারণেই হয়ত ইয়াবা কম আসছে। এটি বন্ধ করতে সময় লাগবে।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে বজলুর রহমান বলেন, ‘তালিকা করে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। কক্সবাজার ও টেকনাফ এলাকায় ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। আবারও বিশেষ অভিযানের চিন্তা-ভাবনা আছে।’
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বৈঠকে মাদক পাচারের উৎস, রুট, মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত চক্রকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ, ইয়াবা উৎপাদন রোধে কঠোর নজরদারী, মাদকদ্রব্য পাচার রোধে সুষ্ঠু সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরো উন্নত করা, সীমান্তে অবৈধ মাদকদ্রব্যের পাচার রোধে আইন প্রয়োগের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা, উভয় দেশের সীমান্তবর্তী জেলার উপযুক্ত প্রতিনিধিদের মধ্যে নিয়মিত বৈঠকসহ ১০টি বিষয়ে আলোচনা হয়।
প্রসঙ্গত- গত মঙ্গলবার, ৫ মে থেকে শুরু হওয়া বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে ডিএনসির ডিজি বজলুর রহমানসহ ১৫ জন এবং মিয়ানমারের পক্ষে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় কমিটির (সিসিডিএসি) প্রধান পুলিশ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চিউ হুইনসহ চার সদস্যদের প্রতিনিধি দল অংশ নেয়। আজ বৃহস্পতিবার সকালে মিয়ানমারের উদ্দেশে দলটি ঢাকা ছাড়বে।

