নিজস্ব প্রতিবেদক : আসন্ন তিন সিটি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ সম্পন্ন করতে নানা উদ্বেগের মধ্যেই সব প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ২৮ এপ্রিল ভোট গ্রহণের জন্য তিন সিটির রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে ভোটের সব উপকরণ। আজ থেকে নির্বাচনে নিরাপত্তার জন্য মাঠে নামছে ৮০ হাজার আনসার, পুলিশ ও র্যাবসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য। ইতোমধ্যে তিন সিটির আওতাভূক্ত এলাকায় ভোটের দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে সেনাবাহিনী মোতায়নের ঘোষণা দিলেও সেনাবাহিনী মাঠে কাজ করবে না জানালে কমিশনের প্রতি আস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সমর্থিত প্রার্থীরা। এছাড়া ইসির নানান সিদ্ধান্তের কারণে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ তৈরী হয়েছে।
এদিকে নির্বাচনী প্রচারণার সময় খালেদা জিয়ার উপর কয়েক দফা হামলা, সব প্রার্থী সমানভাবে প্রচারণার সুযোগ না পাওয়া, বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের উপর পুলিশি হয়রানি, অভিযোগ আমলে না নেয়া, প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীর সঙ্গে সংর্ঘষসহ নানান অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সুষ্ঠু নির্বাচনের।
তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের কেন্দ্রের ৮০ ভাগ ভোটকেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ বলে তালিকা প্রকাশ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ইতিমধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকা নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা দেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার করা ওই তালিকা অনুযায়ী ঢাকার দুই সিটির ১ হাজার ৯৮২টি কেন্দ্রের মধ্যে ১ হাজার ৫৮৫টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে উত্তরের কেন্দ্র ৫৮৭টি আর দক্ষিণে ৯৯৮টি। অন্যদিকে চট্টগ্রামে ৭১৯টির মধ্যে ৫৯৫ কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই নগরীকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হচ্ছে। নির্বাচনী কাজ ছাড়া সব প্রকারের যানবাহন চলাচলের ওপর ভোটের দিন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হয়েছে। ভোটারদের নিরাপত্তা আর ভোটদান নির্বিঘ্ন করতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া হচ্ছে চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশ, র্যাব, বিজিবির ও আনসার মিলে প্রায় ৮০ হাজার সদস্য এই নির্বাচনে মাঠে কাজ করছেন। এদের সঙ্গে আজ মাঠে নামছেন ৫শ ম্যাজিস্ট্রেট।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা মোটামুটি হিসাব করে দেখেছি আনসার, পুলিশ, র্যাব, কোস্টগার্ড, বিজিবি মিলে প্রায় ৮০ হাজারের মতো নিরাপত্তাকর্মী নির্বাচনে নিয়োজিত থাকবেন। এছাড়া ক্যান্টনমেন্টে সেনাবাহিনী প্রস্তুত থাকবেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা যখনই মনে করবেন, তখনই সেনাবাহিনী চলে আসবে।’
প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তিন সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য আমরা যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। আমাদের সব লজিস্টিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনী মালামাল প্রস্তুত করা হয়েছে এবং তিন সিটিতে মালামাল পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।’
ইসি কর্মকর্তা সূত্রে জানা যায়, ‘সাধারণ ভোটকেন্দ্রে ২২ জন ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ২৪ জন করে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য নিরাপত্তায় থাকবেন। এছাড়া তিন সিটির প্রতি সাধারণ ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডে পুলিশ, আনসার ও ব্যাটালিয়ন আনসারের সমন্বয়ে একটি করে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স থাকবে। সেই সঙ্গে ভোটকেন্দ্র বিবেচনায় ৭০ প্লাটুন বিজিবি, ৭ প্লাটুন কোস্ট গার্ড ও র্যবের ১০০টি টিম কাজ করবে। আজ ২৬ এপ্রিল থেকে ২৯ এপ্রিল চার দিনের জন্য তারা দায়িত্ব পালন করবেন।
এছাড়া আজ থেকে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বসানো হচ্ছে চেকপোষ্ট। এ এলাকার বাসিন্দা ছাড়া আজ থেকে বহিরাগত ব্যক্তির অবস্থান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভোটের পরের দিন পর্যন্ত সিটি এলাকায় কোন বহিরাগত অবস্থান করলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এবারের তিন সিটি নির্বাচনে মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ১৮০ জন। এর মধ্যে উত্তরে মেয়র পদে ১৬ জন, সাধারণ কাউন্সিলর ২৮১ জন এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর ৮৯জন। দক্ষিণে মেয়র পদে ২০ জন। সাধারণ কাউন্সিল পদে ৩৯০ জন এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৯৭ জন। একই ভাবে চট্টগ্রামে মেয়র পদে লড়াইয়ে রয়েছেন ১২ জন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২১৩ জন এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৬২ জন।
ভোটগ্রহণের দিন প্রায় অর্ধলাখ কর্মকর্তা তিন সিটিতে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য তিনটি পদে কমিশন প্রিজাইডিং, সহকারি প্রিজাইডিং এবং পোলিং অফিসার নিয়োগ কাজ করবে। এ হিসেবে তিনটি পদের জন্য মোট ৪৯ হাজার ৩৩৩ জন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে উত্তরে প্রিজাইডিং অফিসার ১ হাজার ৯৩ জন, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ৫ হাজার ৮৯২ জন ও পোলিং অফিসার ১১ হাজার ৭৮৪ জন। দক্ষিণে প্রিজাইডিং অফিসার ৮৮৯ জন, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ৪ হাজার ৭৪৬ জন ও পোলিং অফিসার ৯ হাজার ৪৯২ জন।
একই ভাবে চট্টগ্রামে প্রিজাইডিং অফিসার ৭১৯ জন, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ৪ হাজার ৯০৬ জন এবং পোলিং অফিসার ৯ হাজার ৮১২ জন। এছাড়া উত্তর সিটিতে রিটার্নিং অফিসার ১ জন এবং সহকারী রিটার্নিং অফিসার ১২ জন, দক্ষিণে রিটার্নিং অফিসার ১ জন ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার ১৯ জন এবং চট্টগ্রামে রিটার্নিং অফিসার ১ জন এবং সহকারী রিটার্নিং অফিসার ১৪ জনসহ মোট ৪৮ জন।
ওয়ার্ড, ভোটার ও ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা : ঢাকা উত্তর সিটিতে সাধারণ ওয়ার্ড ৩৬, সংরক্ষিত ওয়ার্ড ১২; ভোটার ২৩ লাখ ৪৫ হাজার ৩৭৪ জন (পুরুষ ১২,২৪,৭০১, নারী ১১,২০,৬৭৩)। ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে সাধারণ ওয়ার্ড ৫৭, সংরক্ষিত ওয়ার্ড ১৯; ভোটার ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৫৩ জন (পুরুষ ১০ লাখ ৯ হাজার ২৮৬, নারী ৮ লাখ ৬১ হাজার ৪৬৭)। এবং চট্টগ্রাম সিটিতে সাধারণ ওয়ার্ড ৪১, সংরক্ষিত ওয়ার্ড ১৪; ভোটার ১৮ লাখ ১৩ হাজার ৪৪৯ জন (পুরুষ ৯ লাখ ৩৭ হাজার ৫৩, নারী ৮ লাখ ৭৬ হাজার ৩৯৬)। ভোটকেন্দ্র উত্তরে ১ হাজার ৯৩ ও ভোটকক্ষ ৫ হাজার ৮৯২টি, দক্ষিণে ভোটকেন্দ্র ৮৮৯ ও ভোটকক্ষ ৪ হাজার ৭৪৬টি এবং চট্টগ্রামে ভোটকেন্দ্র ৭১৯ ও ভোটকক্ষ ৪ হাজার ৯০৬টি।
উল্লেখ্য, ঘোষিত তফসিল অনুসারে, আগামী ২৮ এপ্রিল এ তিন সিটিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

