
নিজস্ব প্রতিবেদক : লাকসাম-চট্টগ্রাম মিরসরাইয়ের চিনকি আস্তানা পর্যন্ত নবনির্মিত ৬১ কিলোমিটার ডাবল রেললাইন খুলে দেয়া হচ্ছে। বহু আকাঙ্ক্ষিতি এই ডাবল রেললাইন আজ শনিবার বিকেল ৫টায় উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তিনি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এর উদ্বোধন করবেন। একইসময় চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন ইয়ার্ড রিমডেলিং কাজের উদ্বোধন, লাকসাম থেকে আখাউড়া পর্যন্ত ডুয়েল গেজ ডাবল রেললাইন নির্মাণ এবং বিদ্যমান রেললাইনকে ডুয়েল গেজে রূপান্তর কাজেরও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী।
এ বিষয়ে গত শুক্রবার রেলপথমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক লাকসাম-চিনকি ডাবল রেললাইন পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আধুনিক ও যাত্রীসেবা উন্নয়নে নতুন নতুন উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। চলমান প্রকল্পের কাজগুলো দ্রুত এগিয়ে চলছে। পর্যাক্রমে পুরো রেলওয়ে ডাবল লাইন নির্মাণ করা হবে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে প্রায় ৩২১ কিলোমিটার রেলপথের মধ্যে ২০৪ কিলোমিটার রেলপথে সিঙ্গেল লাইন রয়েছে। সিঙ্গেল লাইন থাকায় এ লাইনে প্রতিদিন ৩৬ জোড়া ট্রেন চলাচল করতে পারত। আজ শনিবার ডাবল লাইন উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এ লাইনে ৭০ জোড়া ট্রেন চলাচল করতে পারবে। ডাবল লাইনে উন্নীত হওয়ায় এখন থেকে দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো কারণে একটি লাইন বন্ধ থাকলেও ট্রেন চলাচল চালু রাখা সম্ভব হবে।’
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ১ হাজার ৬০৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে লাকসাম-চিনকি আস্তানা পর্যন্ত ৬১ কিলোমিটার ডাবল লাইন নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে গত ৩১ মার্চ। ২০১১ সালের ২ নভেম্বর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথও ডাবল লাইনে উন্নীত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৬১ কিলোমিটার রেলপথের কাজ শেষ হয়েছে।
এছাড়া এই পথে ৮টি মেজর সেতু, ৩৪টি কালভার্ট এবং ১১টি পাইপ কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। শর্শদী, গুণবতী, চিনকি আস্তনা ও হাসানপুরে ৪টি স্টেশনে নতুন স্টেশন ভবন নির্মাণ হয়েছে। ৮টি স্টেশনে ফুটওভার ব্রিজ, ৪টি স্টেশনে ক্যানোপি এবং ১৩টি নতুন প্ল্যাটফরম নির্মাণ করা হয়েছে। ১২টি স্টেশনে টেলিকমিউনিকেশন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ করা হয়েছে।
জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ও বাংলাদেশ সরকারের (জিওবি) অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। নতুন এ লাইন দিয়ে ১০০ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চালানো সম্ভব। তবে অনুমোদিত স্পিড ৮০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত হওয়ার কারণে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন ইয়ার্ড রিমডেলিং কাজও শেষ হয়েছে। যা একইদিনে প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধন করবেন।
স্টেশন বড় করতে, প্ল্যাটফর্ম তথা লাইন বাড়াতে প্রায় ২৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে স্টেশনের বাড়তি ৩টি লুপ ও ১টি শেডসহ প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ কাজ শেষ করা হয়েছে। নির্মাণ হয়েছে ইঞ্জিন ঘোরানোর জন্য নতুন ত্রিকোণা লাইন।
এছাড়া চট্টগ্রাম মার্শালিং ইয়ার্ড ও পাহাড়তলী স্টেশনের মধ্যে ৮০০ মিটার রেলওয়ে ট্র্যাক পুনর্বাসন করা হয়েছে। ফুটওভারব্রিজসহ ৩০০ বর্গফুট প্ল্যাটফর্ম ক্যানোপি, ১০০০ মিটার বাউন্ডারি ওয়াল, ২৭০০ বর্গফুট সংযোগ সড়ক ও ২০০০ মিলিমিটার পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে আগে যেখানে ২৩ জোড়া ট্রেন পরিচালনা করা যেত এখন সেখানে ৫০ জোড়া ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
ডাবল লাইন নির্মাণ ও স্টেশন ইয়ার্ড রিমডেলিংয়ের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে ট্রেন চলাচলে প্রায় ২ ঘণ্টা সময় সাশ্রয় হবে। একই দিন লাকসাম থেকে আখাউড়া পর্যন্ত ডুয়েল গেজ ডাবল রেল লাইন নির্মাণ এবং বিদ্যমান রেললাইনকে ডুয়েল গেজে রূপান্ত কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রায় ৬ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হবে ২০২০ সালের জুন মাসে। এ প্রকল্পে ৭২ কিলোমিটার সিঙ্গেল লাইনকে ডাবল লাইনে রূপান্তর করা হবে। মেইন লাইন ১৪৪ কিলোমিটার ও লুপ লাইন ৪০ কিলোমিটার মোট ১৮৪ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হবে। নির্মাণ শেষে এ লাইনে ১২০ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চালানো সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, লাকসাম-চিনকি আস্তানা পর্যন্ত রেল লাইনটি গত বছর ২৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধন করার কথা ছিল। কিন্তু নিম্নমানের নির্মাণকাজের জন্য পরীক্ষামূলক ট্রেন চলাচলেই (ট্রায়াল রান) ঝুঁকি ধরা পড়ে লাইনটিতে। বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের উপযোগী না হওয়ায় বাতিল হয়ে যায় উদ্বোধনও।
রেলওয়ের তথ্য মতে, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের কুমিল্লার লাকসাম থেকে মিরসরাইয়ের চিনকি আস্তানা পর্যন্ত ৬১ কিলোমিটার ডাবল লাইনের এ অংশটি উদ্বোধনের আগে গত ১৪ অক্টোবর লাকসাম থেকে হাসানপুর পর্যন্ত সাড়ে ১৮ কিলোমিটার নতুন ট্র্যাকে পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেন চালানো হয়। নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি দেখা দেয়ায় রেললাইনটি বাণিজ্যিকভাবে ট্রেন চলাচলের উপযোগী নয় বলে চিহ্নিত করে ডাবল লাইন প্রকল্প সম্পর্কিত কারিগরি কমিটি। ফলে রেললাইন উদ্বোধন পিছিয়ে দেয়া হয়।
লাকসাম-চিনকি আস্তানা ডাবল লাইন প্রকল্পের পরিচালক এসএম লিয়াকত আলী বলেন, অক্টোবরেই ৩৮ কিলোমিটার ডাবল লাইন নির্মাণ শেষে উদ্বোধনের কথা ছিল। এজন্য ২৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে সময় নেয়া হয়। সেদিন লাকসাম-হাসানপুর সাড়ে ১৮ কিলোমিটার নতুন রেলপথে ট্রেন চলাচল শুরুর কথা ছিল। কিন্তু কারিগরি জটিলতায় নতুন ট্র্যাক ট্রেন চলাচলের উপযোগী না হওয়ায় তা বাতিল করা হয়।
অভিযোগ উঠেছে, রেলওয়ের নিজস্ব কারখানার পরিবর্তে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তৈরি নিম্নমানের কংক্রিট স্লিপার ব্যবহার করা হয়েছে। নাট-বোল্টু ব্যবহার করা হয়েছে দেশীয় একটি কোম্পানির, যা মানসম্পন্ন নয়। এসব কারণেই রেলপথটিতে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

