ঢাকাTuesday , 11 August 2026
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ধানমন্ডিতে অর্ণবের রহস্যমৃত্যু: সম্পত্তির দ্বন্দ্বে হত্যার অভিযোগ

Link Copied!

রাজধানীর ধানমন্ডিতে ছাদ থেকে পড়ে আল মুক্কাবির ইসলাম অর্ণবের রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে রহস্য কাটছে না। ৩২ বছর বয়সী এই যুবকের মৃত্যুর দুই মাস পরেও নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। মৃত্যুর পর একটি হত্যা মামলাও করে পরিবার। সেই মামলা নিবিড়ভাবে তদন্ত করছে পুলিশ। কিন্তু স্বজনরা প্রথম থেকেই অভিযোগ করে আসছেন এই মৃত্যুর পেছনে শতকোটি টাকার সম্পদ। বাবার রেখে যাওয়া শতকোটি টাকার সম্পদ হাতিয়ে নিতে তার চাচা ও ফুপুরা সুপরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন নিহত অর্ণবের মা হালিমা খাতুন। মৃত্যুর দু’দিন আগেও অর্ণব তার খালা ও মাকে জানিয়েছে তাকে মানসিক নির্যাতন করছেন তার চাচা। তার চাচা ওসমান গণি ও তার স্ত্রী অর্ণবের বাসায় এসে তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলে আখ্যা দেন। তারা তাকে তাদের পরিচিত ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য চাপ দিলে অর্ণব অস্বীকৃতি জানান। পরে তারা অর্ণবকে জোর করে তুলে নেয়ার পরিকল্পনা করে। বিষয়টি বুঝতে পেরে অর্ণব কৌশলে সিগারেট কেনার নাম করে ঘরে থেকে বেরিয়ে খালা শাহনাজ বেগমের বাসায় চলে যান সেখানে তাদের সবকিছু খুলে বলেন।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, বাবার মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই ছেলে অর্ণব পৈতৃক শতকোটি টাকার সম্পদ বুঝে নেয়ার চেষ্টা করার পর থেকে ছোট চাচা ওসমান গণি, জাহিদ মিয়া ও হারুনের সঙ্গে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। অর্ণবকে তার পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রিতেও বাধা দেয়া হয়। সুপরিকল্পিত এই হত্যাকান্ডকে ধামাচাপা দিতে এবং আইনি জবাবদিহি থেকে রেহাই পেতে পরবর্তীতে ঘটনাটিকে আত্মহত্যার নাটক হিসেবে সাজানো হয়েছিল, যাতে প্রকৃত সত্য কখনো সামনে না আসে। গত ২রা মে দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডি ১১ নম্বর সড়কের একটি ১১ তলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে অর্ণবের (৩৪) রহস্যজনক মৃত্যু হয়। ভবনটির লিফটের মেশিন কক্ষের ওপর থেকে নিচে পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে জানায় ধানমন্ডি থানা পুলিশ। প্রাথমিকভাবে এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়। তবে গত ২১শে মে অর্ণবের মা হালিমা খাতুন অর্ণবের ৩ চাচা-ফুপুসহ ১২ জনকে আসামি করে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন, সেখানে ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকা- হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মামলার অন্যতম আসামিরা হলেন- অর্ণবের চাচা ওসমান গণি ভূঞা (৬৮) ও তার স্ত্রী মাসুদা বেগম মায়া (৭০), আরেক চাচা জাহেদ ভূঞা (৭২) ও তার স্ত্রী সেনুয়ারা বেগম রেনু (৬২)।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, রফিকুল ইসলামের মৃত্যুর পর থেকেই তার রেখে যাওয়া বিপুল সম্পত্তি নিয়ে পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র দ্বন্দ্ব চলছিল। আসামিরা যৌথভাবে এই সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে অর্ণবকে তার পৈতৃক সম্পত্তি ভোগদখল, বিক্রি বা হস্তান্তরে বারবার বাধা দিয়ে আসছিলেন। এমনকি অর্ণবের স্বাভাবিক চলাফেরা ও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকারও নানাভাবে সীমিত করে রাখা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা থেকেই আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে অর্ণবকে সরিয়ে দেয়ার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেন। এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, বাসায় কর্মরত গৃহকর্মীদের মাধ্যমে অর্ণবকে ঘুমের ওষুধ বা অন্য কোনো অচেতনকারী দ্রব্য খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল এবং এই ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রেরই একপর্যায়ে তাকে হত্যা করা হয়। সুপরিকল্পিত এই হত্যাকান্ডকে ধামাচাপা দিতে এবং আইনি জবাবদিহি থেকে রেহাই পেতে পরবর্তীতে ঘটনাটিকে আত্মহত্যার নাটক হিসেবে সাজানো হয়েছিল, যাতে প্রকৃত সত্য কখনো সামনে না আসে। অনুসন্ধানে জানা যায়, অর্ণবের বাবা রফিকুল ইসলাম ছিলেন পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক। তার রেখে যাওয়া সম্পদের মধ্যে রয়েছে, রাজধানীর ধানমন্ডির ৮/এ নম্বর রোডে একটি ফ্ল্যাট, ধানমন্ডির৩২ নম্বরে একটি ফ্ল্যাট, সেগুনবাগিচায় কয়েক কোটি টাকা মূল্যের অ্যাপার্টমেন্ট, উত্তরায় একটি ফ্ল্যাট এবং মালিবাগের মীরবাগে ৫ তলা বাড়ি। এ ছাড়া যাত্রাবাড়ীতে রফিকুল ইসলাম স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কিশোরগঞ্জের আকবপুরে ১০ একর জমির ওপর উমেদ আলী ভূঞা উচ্চ বিদ্যালয় এবং নীলগঞ্জে আড়াই একর জায়গার উপর রফিকুল ইসলাম কলেজ রয়েছে। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে কিশোরগঞ্জের খালিয়াজুড়িতে প্রায় একশ’ একর কৃষিজমি ও খামারবাড়ি, তাড়াইল উপজেলায় ২০ একর জমি, দোতলা বাড়ি এবং কিশোরগঞ্জ শহরে ১০ শতাংশ জমি রয়েছে। মৃত্যুর আগে অর্ণব তার মা ও খালাকে জানিয়েছেন, বাবার মৃত্যুর পর সব সম্পদ বুঝে নেয়ার চেষ্টা করার পর থেকে ছোট চাচা ওসমান গণি, জাহিদ মিয়া ও হারুনের সঙ্গে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয় এবং সম্পদের হিসাব বুঝিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান। গত দুই বছর ধরে তাকে হুমকি-ধমকি এবং অপমান করে আসছিলেন। এমনকি অর্ণবের বাবার প্রতিষ্ঠান রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে অবস্থিত রফিকুল ইসলাম স্কুল অ্যান্ড কলেজের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করা হয়। এরপর তার চাচা ওসমান গণি ফন্দি করেন তার ছোট মেয়েকে অর্ণবের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে তার সমস্ত সম্পদ তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখবেন। কিন্তু অর্ণব তার চাচাতো বোনকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানালে তারা বিয়ে করার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন।
অভিযোগের তীর গৃহকর্মীদের দিকে: অর্ণবের খালা শাহনাজ বেগম বলেন, বাসায় কর্মরত গৃহকর্মীদের মাধ্যমে অর্ণবকে ঘুমের ওষুধ বা অন্য কোনো অচেতনকারী দ্রব্য খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। বাসায় কর্মরত দুই গৃহকর্মী জেস্টিনা ম্রং ও তানজিলা বেগম অর্ণবকে সবসময় চাপের মধ্যে রাখতেন। তারা অর্ণবের চাচা ওসমান গণির হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করতেন। অর্ণব তার মা ও খালাদের মৃত্যুর আগে কয়েক দফায় জানিয়েছিলেন, গৃহকর্মীরা তার ওপর খবরদারি করে। তাকে অপমান করে, সে কখন কি করছে, বাসা থেকে কখন বের হয়, কার সঙ্গে কথা বলে এ সকল কিছু তারা ভিডিও করে চাচা ওসমান গণিকে দিতো।
অর্ণবের মা হালিমা খাতুন বলেন, ২০১৭ সালে অর্ণবের বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই তার চাচা ওসমান, জাহেদ ও ঝরনা সব সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নেয়। গত দুই বছর ধরে অর্ণবকে হুমকি-ধমকি এবং অপমান করে আসছিলেন। সে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। তার ইচ্ছা ছিল নিজে ব্যবসা করবে। মারা যাওয়ার আগের দিন শুক্রবার রাত ১০টায় সে আমাকে কল দিয়ে বলে মা চলো আমরা দেশের বাইরে চলে যাই। তিনি বলেন, আমার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে, একটা সুস্থ ছেলে কেন আত্মহত্যা করবে। আমি চাই প্রকৃত তদন্ত হোক। বাসায় কর্মরত দুই গৃহকর্মী জেস্টিনা ম্রং ও তানজিলা বেগম ও চাচা ওসমান গণিকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সব সত্য বেরিয়ে আসবে। তার খাবারে স্লো পয়জন দেয়া হতে পারে বা চেতনানাশক মিশ্রিত করে দেয়া হতে পারে। অর্ণবের মামা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, অর্ণব মৃত্যুর আগে মঙ্গলবার আমাকে কল দিয়েছিল। পারিবারিক অনেক ইস্যু নিয়ে অভিযোগ করেছে। সে বলতো তার চাচা তাকে সম্পত্তির হিসাব দিতো না। সে নিজে ব্যবসা করতে চাইতো এবং তার দুই বোন তাকে সবসময় অপমান করে কথা বলে। সর্বশেষ আমরা প্ল্যান করি সবাই মিলে মালয়েশিয়ায় যাবো। কিন্তু সে কখনো আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে পারে না। আমরা চাই সুষ্ঠু তদন্ত হোক। রফিকুল ইসলাম স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ জসিম উদ্দিন বলেন, আমি আসার আগে ৩ জন অধ্যক্ষকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল রফিকুলের বোন ঝরনা ও তার স্বামী। রফিকুল সাহেব মারা যাওয়ার পর তার ভাই ওসমান গণি, বোন ঝরনা ও তার স্বামী স্কুলের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিতে আমাকে অন্যায়ভাবে স্কুল থেকে বিদায় দেয়। আমি এ নিয়ে মামলা দায়ের করেছি। স্কুলের আয়-ব্যয়ের হিসাব সব নিয়ন্ত্রণ করেন ওসমান গণি। ঝরনার জামাই, ওসমান গণি স্কুল নির্মাণের রড সিমেন্ট লুকিয়ে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি করেছে। রফিকুল ইসলামের সন্তানরা তার কাছে অসহায় ছিলেন। সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে অর্ণবের চাচা ওসমান গণি। ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব বলেন, এই মামলাটি একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা দিয়ে তদন্ত করানো হচ্ছে। মামলাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিনিয়ত মামলার তদারকি করছেন আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। আশা করছি পুলিশি তদন্তে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উঠে আসবে।