বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায় ও ছাত্রদলের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা হতে পারে।
নতুন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে এক ডজনের বেশি নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য পদ নিয়েও চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। শেষ মুহূর্তে পদপ্রত্যাশীদের সাংগঠনিক তৎপরতা ও যোগাযোগও বেড়েছে।
আন্দোলন-সংগ্রাম, সাংগঠনিক দক্ষতা ও ক্লিন ইমেজে গুরুত্ব
নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতার বক্তব্যে উঠে এসেছে।
দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, নেতৃত্ব নির্বাচনে সংগঠনের মাঠপর্যায়ে সক্রিয়তা, বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিটে ভূমিকা এবং সংকটকালীন সময়ে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতাও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
এক বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নতুন কমিটির তালিকা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিবেচনায় রয়েছে। আগস্টে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকায় কমিটি ঘোষণার প্রক্রিয়া কিছুটা পিছিয়েছে। সবকিছু অনুকূলে থাকলে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে।
যাদের নাম আলোচনায়
সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ শীর্ষ পদে আলোচনায় থাকা নেতাদের মধ্যে রয়েছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান, সহ-সভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, মনজুরুল আলম রিয়াদ,
সহ-সভাপতি আরিফুল ইসলাম আরিফ। কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খলিল, কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিত, রাজু আহমেদ, মমিনুল ইসলাম জিসান।
এ তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস ও সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন-এর নামও আলোচনায় রয়েছে।
এ ছাড়া আনোয়ার পারভেজ, মো. খোরশেদ আলম সোহেল, এইচ এম আবু জাফর, ইজাজুল কবির রুয়েল, মোস্তাফিজুর রহমান, শরীফ প্রধান শুভ, মাহমুদ ইসলাম কাজল ও আজিজুল হক জিয়নসহ আরও কয়েকজন নেতার নাম বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে।
ঢাবীয়ানদের পাশাপাশি আলোচনায় জবি, মেডিকেল ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব
নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নেতৃত্বের পাশাপাশি অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উঠে আসা নেতাদের নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের বর্তমান নেতৃত্বের পাশাপাশি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উঠে আসা কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিত, মেডিকেল ইউনিট থেকে উঠে আসা ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, ঢাকা কলেজ থেকে উঠে আসা কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ রহমান এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নেতৃত্ব আবু হুরায়রাসহ কয়েকজনকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বিবেচনা করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
তবে শেষ পর্যন্ত কারা কোন পদে আসছেন, তা নির্ভর করছে দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।
বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ
২০২৪ সালের ১ মার্চ মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের সাত সদস্যের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। একই বছরের ১৫ জুন ৩৯ জন সহ-সভাপতি ও ১১১ জন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ মোট ২৬০ সদস্যের আংশিক পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
বর্তমান কমিটির সময়ে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ, বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা, মহানগর এবং মেডিকেল কলেজসহ বেশ কয়েকটি সাংগঠনিক ইউনিট পুনর্গঠন করা হয়।
নির্ধারিত দুই বছরের মেয়াদ ২০২৬ সালের ১ মার্চ শেষ হওয়ায় এখন নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষায় সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।
আলোচনায় ইয়াহইয়া, আমান, বাসিত ও আউয়াল
শীর্ষ পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়া, আমান উল্লাহ আমান, কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিত ও ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়ালের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
ইয়াহইয়া এর আগে ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হামলায় আহত হন এবং বিএনপির কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করেন বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।
অন্যদিকে আমান উল্লাহ আমান এর আগে কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ২৮ অক্টোবর-পরবর্তী আন্দোলনে গ্রেপ্তার হয়ে তিনি প্রায় দুই মাস কারাগারে ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিত দীর্ঘদিন ধরে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয়। আন্দোলন-সংগ্রামকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল ছাত্রদলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চতর পড়াশোনা করছেন।
নেতৃত্বে কারা আসছেন, সিদ্ধান্ত এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে
নতুন কমিটি ঘিরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে কারা আসছেন, তা নিয়ে সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে চলছে আলোচনা।
তবে আলোচনায় থাকা নামের সংখ্যা অনেক হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো প্রার্থীকে নিশ্চিতভাবে নতুন কমিটির নেতা বলা যাচ্ছে না। বিএনপির হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের পরই বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহকে সামনে রেখে ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহল বাড়ছে। শেষ পর্যন্ত ঢাবীয়ানদের আধিপত্য বজায় থাকবে, নাকি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল, ঢাকা কলেজ ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উঠে আসা নেতৃত্ব নতুন কমিটিতে বড় ভূমিকা পাবে—সেদিকেই এখন নজর সংগঠনটির নেতাকর্মীদের।

