বার বার বিদ্যুৎ বিভাগের নজরে আনা হলেও রহস্যজনক কারণে ঘুমিয়ে আছে কর্তৃপক্ষ। কি কারণে বিদ্যুৎ বিভাগের মাথা ব্যথা তা নিয়ে এবারের প্রতিবেদন। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ উপদেষ্টা ফাওজুল কবীরের নগ্ন থাবায় বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা আরইবির সাবসিডিয়ারী প্রতিষ্ঠান আরপিসিএল এখন মাফিয়াদের দখলে। সকল রীতিনীতি, আইনকানুন, বিধি বিধান এবং জবাবদিহিতা উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ গায়ের জোরে রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সংস্থা আরপিসিএল-এ একজন অযোগ্য ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি এখন ডুবতে বসেছে। শুধুমাত্র অযোগ্য ও অদক্ষতার কারণে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা এবং চেইন অব কমা- ভেঙ্গে পড়েছে। কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চরম প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার মধ্য দিয়ে অযোগ্য ও অদক্ষ প্রকৌশলী এএইচএম রাশেদকে আরপিসিএল’র এমডি পদে বিগত ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর বিদ্যুৎ বিভাগের কোম্পানী অ্যাফেয়ার্স-২ শাখার স্বারক নং ২৭.০০.০০০০.০৮৯.১১.০০২.১৬.৫০৫ এবং আরপিসিএল এর স্বারক নং ২৭.২৬.০০০০.০০০.০০৫.০৩.০০৩১.২৫.১২৯৯, তারিখ: ০৩/১১/২০২৫ইং মূলে সবাইকে অন্ধকারে রেখে ৩ বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। উক্ত নিয়োগপত্রে বলা হয়, গত ০১/১১/২০২৫ইং তারিখ অনুষ্ঠিত রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) এর ৩৭৬তম বোর্ড সভার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে আরপিসিএল এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে জনাব এএইচএম রাশেদ (জন্ম তারিখ: ১৫/০১/১৯৭১) কে যোগদানের তারিখ হতে ৩ বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পরামর্শ প্রদান করা হলো। অথচ আরপিসিএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগের লক্ষ্যে প্রার্থী কর্তৃক নির্বাচনী পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের সামারী শীট পর্যালোচনায় দেখা যায়, সিলেকশন কমিটির স্বাক্ষরিত পরীক্ষার ফলাফলে মোট ১১জন প্রার্থীর মধ্যে প্রকৌশলী মোঃ কামরুজ্জামান পেয়েছেন ৭৬.৩৩ নম্বর। অন্যদিকে প্রকৌশলী এএইচএম রাশেদ পেয়েছেন ৭৪.৮৩ নম্বর। প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, প্রকৌশলী মোঃ কামরুজ্জামান প্রথম স্থান অধিকার করায় সিলেকশন কমিটি আরপিসিএল’র এমডি পদে তাকে নিয়োগের সুপারশিট করেন। এর প্রেক্ষিতে আরপিসিএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকারী আরইবির সদস্য ড. নাজমুস সায়াদাত গত ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর, স্বারক নং-২৭.২৬.০০০০.০০০.০০৫.০৩.০০৩১.২৫.১২৯৯ মূলে আরপিসিএল ব্যবস্থাপনা পরিচালকের শূন্য পদে কর্মকর্তা নিয়োগ প্রদানের লক্ষ্যে গত ০১/১১/২০২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত কোম্পানীর ৩৭৬তম বোর্ড সভায় নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত (সিদ্ধান্ত নং-২৭১৭) গৃহীত হয়। এতে বলা হয়, আরপিসিএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে কর্মকর্তা নিয়োগের লক্ষ্যে নিয়োগ কমিটির মূল্যায়নে মেধাতালিকার ১ম স্থান অধিকারী মোঃ কামরুজ্জামানকে আরপিসিএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান; মেধা তালিকার ২য় স্থান অধিকারী এএইচএম রাশেদ এবং ৩য় স্থান অধিকারী মোঃ আবুল হোসেনকে অপেক্ষমান বিকল্প প্রার্থী হিসেবে রেখে বিদ্যুৎ বিভাগের পরামর্শ কমিটির নিকট প্রস্তাবনা প্রেরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। অতি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের পত্রটি প্রেরণ করা হয় বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবের দপ্তরে। কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, উক্ত পরীক্ষার সিলেকশন কমিটির সদস্যরা হলেন যথাক্রমে-আহ্বায়ক (নিয়োগ কমিটি) আরইবির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এসএম জিয়া-উল-আজিম। এছাড়া নিয়োগ কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন-বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) কে. এম আলী রেজা, বাপবিবোর্ডের সদস্য (অর্থ) ও আরপিসিএল’র পরিচালক ড. নাজমুস সায়াদাত, আরইবির সদস্য ও আরপিসিএল’র পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মোঃ শহিদুল ইসলাম, মিলিটারী ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজীর (এমআইএসটি) অধ্যাপক ড. হোচ্ছাম-ই-হায়দার, বাপবিবোর্ডের সদস্য (বিতরণ ও পরিচালন) এবং আরপিসিএল’র পরিচালক মোঃ আব্দুর রহিম মল্লিক এবং আরইবির সদস্য (সমিতি ব্যবস্থাপনা) ও আরপিসিএল’র পরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, গাজীপুর পবিস-১ এর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার ও আরপিসিএল’র পরিচালক মোঃ আবুল বাশার আজাদ, নারায়ণগঞ্জ পবিস-২ এর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার ও আরপিসিএল’র পরিচালক প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ, ঢাকা পবিস-১ এর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার ও আরপিসিএল’র পরিচালক মোঃ আক্তারুজ্জামান লস্কর, ময়মনসিংহ পবিস-২ এর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার ও আরপিসিএল’র পরিচালক মোঃ আকমল হোসেন, ঢাকা পবিস-৩ এর জেনারেল ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) এবং আরপিসিএল’র পরিচালক মোঃ গোলাম কাউসার তালুকদার। আরইবি চেয়ারম্যান, বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিবসহ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিলেকশন কমিটির পরীক্ষার প্রাপ্ত ফলাফলে প্রকৌশলী মোঃ কামরুজ্জামান প্রথম স্থান অধিকার করার পরেও অদৃশ্য শক্তির কালো থাবায় মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে অকৃতকার্য (ফেল) প্রকৌশলী এএইচএম রাশেদকে আরপিসিএল’র এমডি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই খবর আরপিসিএল-এ পৌঁছালে ওখানে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং প্রকৌশলীদের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অথচ আরপিসিএল বিদ্যুৎ জেনারেশনকারী (উৎপাদন) প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর একটি প্রতিষ্ঠান। যা এখন ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। সূত্র জানায়, পর্দার আড়ালে থাকা একটি মাফিয়া সিন্ডিকেট তাদের ব্যবসা এবং আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে অযোগ্য ও অদক্ষ প্রকৌশলী এএইচএম রাশেদকে আরপিসিএল’র এমডি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া আরপিসিএল’র এমডি এএইচএম রাশেদ ইতোপূর্বে ২০২৫ সালে উক্ত প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক পদে নিয়োগ পরীক্ষা দিয়েও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। বিগত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা সরকারের আমলে নিজের রাজনৈতিক আমলনামা লুকিয়ে ধুরন্ধর এই প্রকৌশলী এএইচএম রাশেদ দুটি পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিজকে জামায়াত ইসলামের রূপ ধারণ করে সুকৌশলে অবৈধভাবে আরপিসিএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিতে সক্ষম হন। আর এতে ডুবতে বসেছে সরকারী সংস্থা আরপিসিএল। সূত্র জানিয়েছে, তার অযোগ্যতার কারণে আরপিসিএল’র উৎপাদন ব্যবস্থা বর্তমানে চরম নাজুক অবস্থায় রয়েছে। অপরদিকে পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অবস্থাও ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে এগুচ্ছে। পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রেরও (আরএনপিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বেও রয়েছেন আরপিসিএল’র এমডি। বাংলাদেশ সরকারের আরপিসিএল ও চায়না সরকারের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র (আরএনপিএল) কলাপাড়া উপজেলায় অবস্থিত একটি আধুনিক পাওয়ার প্লান্ট। এটিও এখন মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ময়নসিংহের শম্ভুগঞ্জে ২১০ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক কম্বাইড সাইকেল পাওয়ার প্লান্টের ইনচার্জ হিসেবে প্রকৌশলী এএইচএম রাশেদ কর্মরত ছিলেন। সেখানে একটি ইউনিট ১ বছর অকেজো হয়ে পড়ে থাকলেও তা মেরামতের উদ্যোগ তিনি নিতে পারেননি। আরপিসিএল’র নির্বাহী পরিচালক পদে পরীক্ষায় তিনি পাশ করতে পারেননি। এমডি পদে লিখিত পরীক্ষায়ও ফেল করেছেন। তবুও কেন তাকে রাষ্ট্রীয় এই গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সংস্থা আরপিসিএল-এ এমডি হিসেবে নিয়োগ দিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিতর্কিত বিদ্যুৎ উপদেষ্টা ফাওজুল কবীর। এমডি নিয়োগের গোপন নথিপত্র পর্যালোচনা করে এর তথ্য উপাত্ত যাচাই বাছাই করে দেখা যায়, এর আগেও আরপিসিএল’র এমডি নিয়োগে বিদ্যুৎ বিভাগের তৎকালিন উপদেষ্টা ফাওজুল কবীর সিন্ডিকেট চরম স্বেচ্ছাচারিতা আশ্রয় নেয়। গত ২৮/০৬/২০২৫ ইং তারিখ শনিবার এমডি নিয়োগের পরীক্ষায় প্রকৌশলী মোঃ সেলিম ভূঁইয়া ৭৮.৮৩ নম্বর পেয়ে ১ম স্থান অধিকার করেন। হাই পাওয়ারের সিলেকশন কমিটি প্রকৌশলী মোঃ সেলিম ভূঁইয়াকে আরপিসিএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালকের শূন্য পদে নিয়োগের সুপারিশ করে বিদ্যুৎ বিভাগে পরীক্ষার প্রাপ্ত ফলাফলসহ পত্র প্রেরণ করে। যার স্মারক নং-আরপিসিএল-২৭.২৬.০০০০.০০০.০০৫.০৩.০০০২.২৪.১; তারিখ: ৩০/০৬/২০২৫ ইং। অথচ সেই নিয়োগও বিদ্যুৎ বিভাগের কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-২ শাখার উপ-সচিব রোকসিন্দা ফারহানা স্বাক্ষরিত স্বারক নং-২৭.০০.০০০০.০৮৯.১১.০০৭.২৪.২৮৯; তারিখ: ১৪/০৭/২০২৫ ইং তারিখ বাতিল করে দেন। নিয়োগ প্রক্রিয়া শতভাগ স্বচ্ছ হলেও রহস্যজনক কারণে একের পর এক বিদ্যুৎ বিভাগের স্বেচ্ছাচারিতায় ভয়ানক সঙ্কটে পড়েছে আরপিসিএল। সুতরাং মাফিয়া সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি আরপিসিএল’র এমডি নিয়োগে যারা দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী উঠেছে। অপরদিকে অবৈধভাবে এমডি নিয়োগের সঙ্কট মোকাবেলায় সরকারের সর্বোচ্চ দপ্তরের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন দেশের সচেতনমহল। এ খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের দ্রুত উন্নয়নের লক্ষ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিতরণকারী সংস্থার শীর্ষ নেতৃত্বকে কঠোর নজরদারি এবং জবাবদিহিতার আওতায় আনতে না পারলে গণতান্ত্রিক সরকার ভবিষ্যতে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে পারে। উল্লেখ্য, গত ১৭ মার্চ ”ডুবতে বসেছে বিদ্যুৎখাতের টাইটানিক আরপিসিএল” শীর্ষক একটি তথ্যবহুল প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় দৈনিক পাঞ্জেরীতে।

