নিজস্ব প্রতিবেদক: দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত এমন কোনো দৃষ্টান্তমূলক কাজ করে দেখাতে পারেনি, যাতে করে দুর্নীতিবাজরা দুর্নীতি করতে ভয় পাবে। তাই আগামী ২০১৬ সালের মধ্যে অন্তত সাতটি দৃষ্টান্তমূলক কাজ বা রুই-কাতলা ধরে দেখাতে বললেন দেশের বিশিষ্টজন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
বুধবার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত ‘রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও প্রশাসনিক সংস্কার, দুয়ে মিলে হতে পারে দুর্নীতির প্রতিকার’ শীর্ষক সেমিনারে তারা এ কথা বলেন।
দুর্নীতিই জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটায় মন্তব্য করে সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘জঙ্গিবাদকে ঠেকাতে প্রথমে দুর্নীতিকে নির্মূল করতে হবে। কেননা সম্প্রতি একটি গবেষণায় তালেবানদের উত্থানের মূল কারণ হিসেবে দুর্নীতিকে দেখা হয়েছে। তাই দুর্নীতি দমনে দুদকের ভূমিকা অনিস্বীকার্য। তারা (দুদক) যদি একটি রাঘব বোয়ালকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারতো, তাহলে এ সংস্থাটির প্রতি মানুষের আস্থা বাড়তো। তাই জনগণের আস্থা বাড়াতে দুদককে একটি দৃষ্টান্তমূলক কাজ করে দেখাতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আপনারা (দুদক) নিজে নিজে যতোই বলছেন আমরা স্বাধীন, আমরা স্বাধীন- জনগন ঠিক ততোই সন্দেহ করছে আপনারা আসলেই স্বাধীন কি না। মুখে নয়, আপনাদের স্বাধীনতা কাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে।’
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও প্রধান তথ্য কমিশনার এম. জমির বলেন, ‘রাজনৈতিক অঙ্গীকারের চেয়ে সদিচ্ছার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আর কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই দুর্নীতির প্রতিকার সম্ভব। কেননা রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে দায়বদ্ধতা থাকবে, নতুবা অঙ্গিকার দিয়ে কিছু হবে না। আমাদের ভূমি জরিপ অফিসসহ সরকারি অফিসগুলো সবচেয়ে দুর্নীতিযুক্ত এলাকা। কোনো জিনিস যদি আপনি চান, তাহলে তাদের টাকা দিতে হবে। এছাড়া তথ্য অধিকার আইন থাকলেও তার কোনো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। দুর্নীতি দমনের জন্য প্রশাসনের পাশাপাশি এসব জায়গায় বেশি গুরুত্ব দিয়ে দৃষ্টান্তমূলক কাজ করে দেখাতে হবে।’
মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ‘দুর্নীতি অনেকটা রাজনৈতিক ইস্যু। আমাদের দেশের রাজনীতি নানা অপসংস্কৃত দ্বারা আক্রান্ত। নির্বাচনে নমিনেশন দেয়া হয় টাকাওয়ালাদের। ফলে মেধাবী রাজনীতিকরা বঞ্চিত হচ্ছে। আর এসব কারণে এ দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করা খুবই দুরূহ কাজ হয়ে পড়েছে।’
সরকার ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান স্বাধীন নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সকল প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতার ভান করে। আমাদের দেশে বর্তমান সরকার ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানই স্বাধীন নয়। যার ফলে দুর্নীতি অবাধে বিচরণ করছে। তাই দুদকের কাছে আশা করবো আগামী ২০১৬ সালের মধ্যে অন্তত সাতজন রুই-কাতলাকে ধরে আইনের আওতায় আনেন। এরকম দৃষ্টান্তমূলক কাজ করে দেখান।’
ব্যারিস্টার আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ দুদক ঘোষণা করেছে তার প্রতি কোনোভাবেই শিথিলতা প্রদর্শনের সুযোগ নেই। এই যুদ্ধে জয় লাভ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কেননা দুর্নীতি জিতলে, হেরে যাবে বাংলাদেশ। তাই দুর্নীতির কাছে কোনো আপস করা যাবে না। দুদকের দৃষ্টান্তমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমেই এটিকে দমিয়ে রাখতে হবে।’
সাবেক সচিব ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘রাজনীতি ও প্রশাসনের মাঝে আজ সমতা বিরাজ করছে। আর বর্তমান প্রশাসন সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। কেননা বর্তমানে সচিব ছাড়াও প্রশাসনিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রাজনীতি করছেন।’
তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, ‘আজকে আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন- যে কোনো উপায়ে হোক নির্বাচনে জিততে হবে। তখন আর প্রশাসন কীভাবে কাজ করবে? এভাবে সবাই নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন করছে। এদিকে দুদক গঠিত হয়েছিল ২০০৪ সালে। অথচ প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এমন কোনো কাজ করে দেখাতে পারেনি যাতে দুর্নীতিবাজরা ভয় পায়। তাই দুর্নীতিবাজদের দমনে দৃষ্টান্তমূলক কিছু করে দেখাতে হবে।’
সেমিনারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ‘দুর্নীতিরোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি প্রশাসনিক সংস্কার করতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে প্রশাসনিক সংস্কার এখনো হয়নি। দুদক ভালো কাজ করলেও মানুষ এখনো দুর্নীতিকে ভয় পায় না। তাই দুদককে এমন কাজ করতে হবে, যাতে দুর্নীতিকে মানুষ ভয় পায়।’
অধ্যাপক মাহফুজা খানম বলেন, ‘এখন আমাদের দেশে দুর্নীতি দমনের সাংস্কৃতি কমে যাচ্ছে। আমরাই এখন দুর্নীতি করতে বেশি আগ্রহী হই। দুর্নীতিবাজদের উৎসাহিত করি। যেমন টাকাওয়ালা দুর্নীতিবাজ বেয়াই ও জামাই খুঁজতে আমরা লাইন ধরি। তাহলে আমাদের দেশ থেকে দুর্নীতি যাবে কি করে? তবে দেশকে দারিদ্রমুক্ত করতে হলে, উন্নত দেশে পরিনত করতে গেলে দেশ থেকে প্রথম দুর্নীতি দমন করতে হবে। যেভাবে মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়া বিনির্মাণে করেছিলেন।’
চুনোপুটির দিকে নজর না দিয়ে দুদককে রাঘব বোয়ালদের প্রতি নজর দেয়ার পরামর্শ দেন নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। তিনি বলেন, ‘আমরা সম্প্রতি ডিসিসির প্রার্থীদের যতো আয় দেখছি। তা চোখ উপরে উঠার মতো। তাদের এ আয় থেকে আয়কর দেয়া হয় কি না সে ব্যাপারে খেয়াল এবং এসব আয়ের উৎস কী তাও খতিয়ে দেখা উচিৎ দুদকের। তাই এখন আর চুনোপুটির দিকে নজর না দিয়ে, একটু বড়দের দিকে নজর দিন।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি আবদুল মান্নান বলেন, ‘দুদক চেষ্টা করে যাচ্ছে এটা সত্য। কিন্তু তাদের কাজের ফলাফল নিয়ে আমি সন্দিহান। তাদের ফলাফল যে একিবারেই কম সেটা বলছি না, তবে দৃষ্টান্তমূলক ফলাফল অনেক কম। যা আমরা উদাহরণ হিসেবেও দেখাতে পারবো।’
সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, ‘যখন কোনো দুর্নীতিবাজের খবর প্রকাশ করা হয়, তখন দুর্নীতিবাজ দ্বারা সাংবাদিকরা আক্রান্ত হন। কিন্তু গণমাধ্যম আক্রান্ত হলে কেউ পাশে দাঁড়ায় না। তাই আমাদের খবর যদি সত্য হয়, আশা করছি দুদক আমাদের পাশে দাঁড়াবে। সেই সঙ্গে গণমাধ্যমকে সহায়তার জন্য মিডিয়া সাপোর্ট সেল গঠন করা হবে।’
এ সময় দুদক কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বলেন, ‘২০০৪ সালে দুদক প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমরা দৃশ্যমান কিছু উদাহরণ স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছি। আগে যা ছিল না তার চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে দুদক। আর আপনাদের আজকের বক্তব্যগুলোকে আমাদের কাজের পরামর্শ হিসেবে গ্রহণ করে আরো এগিয়ে যাবো।’
সভাপতির বক্তব্যে দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান বলেন, ‘এ সেমিনারে আনো গুণীজনকে আমরা ডেকেছিলাম। কিন্তু তারা আসেননি, তাই আমরা হতাশ। আমরা আমাদের আপ্রাণ চেষ্ঠা দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। দুদক ইতিমধ্যে অনেক দৃষ্টান্তমূলক কাজ করেছে, বিশেষ এই দুই বছরে অনেক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আশা করছি আগামীতেও করবে। আর এজন্য সবার এবং সব প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা আমরা চাচ্ছি।’
সেমিনারে আলোচ্য বিষয়বস্তুর ওপর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মোহাব্বত খানের একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনটি উপস্থান করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন মিথিলা ফারজানা।
সেমিনারে দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এ টি এম শামসুল হুদা। এছাড়া সেমিনারে আরো উপস্থিত ছিলেন দুদক কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. নাসিরউদ্দীন আহমেদ, সাংবাদিক রাহাত খান, কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, সাংবাদিক সিরাজুল ইসলামসহ দেশের খ্যাতনামা বিশিষ্টজনরা।

