বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় ব্যাপক আলোচিত হওয়া ও পরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বরখাস্ত হওয়া পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূর মিয়ার দীর্ঘ ১৫ বছর পর আবার পুলিশের চাকরি ফিরে পেয়েছেন। এই খবর সংবাদ মাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আগের বরখাস্ত আদেশ বাতিল করে তাকে বকেয়া বেতন ভাতাসহ চাকরিতে পুনর্বহাল করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার।
সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কর্মরতদের মধ্যে এবং এটি আমলাতন্ত্রের পেশাদারত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে বলে মনে করেন তারা।
তাদের মতে, যারা বঞ্চিত ছিলেন তাদের প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা দিয়ে ভিন্নভাবে কাজে লাগাতে পারে সরকার কিন্তু সেটি না করে দীর্ঘকাল ধরে কাজে সম্পৃক্ত না থাকা এসব ব্যক্তিকে সরাসরি একই পেশায় ফিরিয়ে আনলে সেটি কর্মরত যারা আছেন তাদের জন্য ক্ষতিকর হবে।
আরো পড়ুন
২ টি বিষয় বাদে জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ বাস্তবায়ন করবে সরকার
যদিও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেওয়া বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ বিনির্মাণের’ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
সেখানে বলা হয়েছিল, ‘বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই হবে একমাত্র মাপকাঠি। কেউ যাতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়, সেটাও নিশ্চিত করা হবে।’
বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ২০০১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার ক্ষমতায় আসার কয়েক বছরের মধ্যেই আলোচিত হয়ে উঠেছিলেন তখনকার পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূর মিয়া।
ওই আমলে একসময় তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার ছিলেন। বিসিএস ১২ ব্যাচের এই কর্মকর্তা ময়মনসিংহ জেলার পুলিশ সুপার হিসেবেও কাজ করেছেন। এই ব্যাচের অনেক কর্মকর্তারা বর্তমানে অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদায় রয়েছে বা অবসরে গেছেন।
তবে ২০০২ সালের জুলাইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলে গভীর রাতে পুলিশি অভিযানের ঘটনায় তিনি ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছিলেন। ওই ঘটনার জেরে তীব্র আন্দোলনের মুখে তখনকার উপাচার্যকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল।
বিএনপি সরকারের সময়েই তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছিল। যদিও এসব মামলা থেকে তিনি খালাস পেয়েছেন। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০০৯ সালের অক্টোবরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোহিনূর মিয়াকে প্রথমে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এর দুই বছর পর ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে চূড়ান্ত বরখাস্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরপর তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
এখন আবার সরকার তাকে পুলিশের চাকরিতে ফিরিয়ে আনার পর এ নিয়ে আলোচনা- সমালোচনার ঝড় উঠেছে। চাকরি থেকে বিদায় নেওয়ার দীর্ঘ বিরতির পর ফিরে আসার ক্ষেত্রে কোহিনূর মিয়াই একমাত্র উদাহরণ নন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেউ অন্যায়ভাবে বঞ্চিত বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকার সেটি পর্যালোচনা করে তাকে প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা ও পেনশন দিয়ে অন্য কোনোভাবে কাজে লাগাতে পারতো।
এদিকে অবসরের পর দীর্ঘ বিরতিতে যাদের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল তারা এখনকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেননি- এমন কথাও প্রচলিত আছে সচিবালয়ে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া বলছেন, এটি করা হয়েছিল এজন্য যে সরকার যেন বিশেষভাবে দক্ষ কর্মকর্তাদের অবসরের পরেও চাইলে কাজে লাগাতে পারে।
‘চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ রাজনৈতিক বিবেচনায় পুরস্কৃত করার জন্য ব্যবহৃত হলে এটা খারাপ নজির তৈরি করবে। এগুলোর মাধ্যমে দক্ষ, নিরপেক্ষ ও ভালো প্রশাসন আর কখনোই হবে না। ভালো আমলাতন্ত্র হবে না। অথচ সরকারের ভিশন বাস্তবায়নের জন্যই দক্ষ আমলা দরকার। মনে রাখতে হবে দশ বছর আগের প্রশাসন আর এখনকার প্রশাসন তো এক না।’
তার মতে, খুব দক্ষ ছাড়া কাউকে চুক্তিভিত্তিতে আনা হলে তারা শেষ পর্যন্ত সরকারের জন্য বোঝা হবে এবং এদের কারণে প্রশাসনে অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা তৈরির হতে পারে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা

