মাদারীপুর প্রতিনিধি: ‘মোরা এক ঘাটেতে রান্দি-বারি, আরেক ঘাটেতে খাই, মোদের সুখের সীমা নাই..।’ বেদে সম্প্রদায়ের নিজস্ব এ গানটির সঙ্গে কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না বর্তমান বেদে সম্প্রদায়ের জীবন জীবিকায়।
সভ্যতার নিত্যনতুন আবিষ্কার বেদে সম্প্রদায়ের আয়ের পথ সংকুচিত করে দিয়েছে। তাই আজ আর আগের মতো সুখ ছুঁয়ে যায় না জলে ভেসে বেড়ানো এই জীবনে। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে আগের মতো তেমন আয়-রোজগার হয় না। সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সচেতনতা বেড়ে যাওয়ায় এখন আর বেদেনীদের কাছ থেকে ঝাড়-ফুঁক নেয় না গ্রাম্য মানুষরা। ফলে বেদেদের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম এ খাত থেকে আয় কমে গেছে অনেক। যাতে করে বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে টিকে থাকতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বেদেদের।
আড়িয়াল খাঁ নদ দিয়ে যাওয়া বেদেদের ৩১টি নৌকার বহর গত কয়েকদিনের জন্য আশ্রয় নেয় আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরে।
এ সময় বেদে সম্প্রদায়ের লোকগুলোর সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, তাদের বর্তমান অবস্থার কথা। বেদে সম্প্রদায়ের নারীরা পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করে।
আয়-রোজগারে পুরুষদের ছাড়িয়ে যায় বেদে নারীরা। মূলত এ সম্প্রদায়ে নারীর আয়কেই প্রধান উপার্জন মনে করে। কাক ডাকা ভোরে নৌকার ভেতর রান্না-বান্না সেরে কোলের শিশুকে কাপড়ের পেঁচিয়ে আয়-রোজগারের উদ্দেশে বেড়িয়ে পরে বেদে নারীরা। তন্ত্র-মন্ত্রের মাধ্যমে দাঁতের পোকা ফেলা, সিংগা লাগিয়ে পুরোনো বাতের ব্যথা সারানো, বশীকরণ তাবিজ দিয়ে অবাধ্যকে বশ করা, অষ্টধাতুর তাবিজ, কড়ি বিক্রি করে তাদের সনাতন পেশাকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহ করে আসছে বেদে সম্প্রদায়। জীবিকা অর্জনে পুরুষের ভূমিকা ছোট করে দেখার নয়।
নারীর পাশাপাশি এখন পুরুষরাও আয়-রোজগার করছে সমান তালে। বেদে সর্দার কালাই ধর জানান, আদি ও ঐতিহ্যবাহী এ জলে ভেসে বেড়ানোর পেশা তারা ছাড়তে পারে না। তাদের আত্মার সঙ্গে একাকার হয়ে মিশে আছে এ পেশা। তবে বর্তমানে অনেক বেদেরাই এ জীবন থেকে বেড়িয়ে এসে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিদেশযাত্রাসহ অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত আছে। জল ছেড়ে স্থলে ঘর তুলে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে অনেকেই।
বেদে যুবক জীবন জানান, বরিশাল থেকে সিলেটের উদ্দেশে তারা বেড়িয়েছে। বৈশাখ আসার আগেই তারা যাত্রা করে বহর নিয়ে।
বিভিন্ন ঘাটে কাটিয়ে এক সময় সিলেটে যাবে। এই মৌসুমে তারা সাপ ধরতে বের হয়। বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ধরে ঢাকার সাভারে বিক্রি করে থাকে।
বেদে নারীরা জানায়, গ্রামে গ্রামে আয়-রোজগার এখন হয় না বললেই চলে। সারাদিন ঘুরেও পঞ্চাশটি টাকা আয় করতে কষ্ট হয় এখন।
আগের গ্রামের সরল প্রাণ নারীদের ও রোগাক্রান্তদের ভুলিয়ে-ভালিয়ে ২/১ কেজি চাল, ডাল, পুরাতন জামা-কাপড়, টাকা-পয়সা বাগিয়ে নিতে পারতো। কিন্তু বর্তমানে গ্রামাঞ্চলের মানুষ সচেতন হয়ে উঠায় বেদেনীরা তেমন সুবিধা করতে পারছে না এ পেশায়। পেশাচ্যুতি ও দারিদ্রতার কারণে বেদে সম্প্রদায় দিনদিন অভাবের সম্মুখীন হচ্ছেন।
বেদে বহরের অপর এক যুবক ঝান্টু জানায়, বরিশালের গৌরনদীতে তার বাড়ি। বাড়িতে এ বছর ঘর তুলেছে। এই পেশায় আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের চিন্তা করছেন তিনি। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা করানোর চিন্তাও তাড়া করে তাকে। মৌসুম শেষ করে এ পেশায় থাকবেন না বলেও জানান।
দীর্ঘদিন ধরে নৌকায় চড়ে জলে বসবাস করলেও এ বেদেরা বিভিন্ন স্থানে জমি কিনে ঘর-বাড়ি করে বসবাস শুরু করেছেন। যাদের জমি কেনার সামর্থ নেই তারা বিভিন্ন স্থানে খোলা জায়গায় ঝুপড়ি বেঁধে বসবাস করছেন। নৌকা নির্ভর জলজীবন থেকে বের হয়ে আসার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায় বেদে সম্প্রদায়ের মাঝে।
এদিকে, মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার আড়িয়াল খাঁ নদীর পুরাতন ফেরিঘাট, বাখরেরকান্দি পুরাতন রাস্তা এবং ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার পুলিয়া এলাকার আড়িয়াল খাঁ মরা নদীর পাড়ে সরকারি খাস জমিতে দীর্ঘদিন ধরে বেদে সম্প্রদায়ের বেশ কিছু পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছে। আলাপ করে জানা গেছে এ সব বেদে পরিবার আগের মতো এখন আর নৌকা নিয়ে বের হয় না। এরা মাছ ধরা, ছুতোর কাজসহ ছোট ছোট পেশায় নিয়োজিত হয়ে পরেছে।

