চাঁদপুর প্রতিনিধি: কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই ও ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে চাঁদপুর পৌরসভা নির্বাচন বর্জন করেছেন সাবেক পৌর চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান ভূঁইয়া।
রোববার দুপুর ১২টায় তার নির্বাচনী কার্যালয়ে সাংবাদ সম্মেলন করে মাধ্যমে তিনি নির্বাচন বর্জন করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, বেলা ১১টার মধ্যে ৪৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪৫টি কেন্দ্র আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা একযোগে দখল করে নেয়। তারা ভোটারদের কাছ থেকে ব্যালট নিয়ে নিজেরাই সিল মেরে বাক্সে ঢুকিয়ে দেয়। অনেক ভোটার এসে ব্যালটের অভাবে ভোট দিতে পারেনি।
তিনি আরো বলেন, ‘চাঁদপুর পৌরসভা নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে বর্তমান সরকার আবারো প্রমাণ করলো তাদের আমলে মানুষের মত প্রকাশের কোনো স্বাধীনতা নেই। এ সরকারের সময়ে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই। ভোটকেন্দ্রগুলোতে সাধারণ মানুষের জান-মালের নিরাপত্তাও আজ ভূলুণ্ঠিত।’
এদিকে সকাল ৮টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হলেও ১০/১৫ মিনিট পর থেকেই জাল ভোট দিতে শুরু করে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ‘মোবাইল’ প্রতীকের সমর্থকরা। অধিকাংশ বুথ থেকে মুহূর্তেই হাওয়া হয়ে যায় মেয়র পদের ব্যালট পেপার। এ কারণে ৫টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ সকাল ৯টা থেকে স্থগিত রাখা হয়।
সকাল থেকে বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শনে যাওয়া সাংবাদিকরাও নিরাপত্তার অভাবে এসব ব্যালট পেপারে সিল মারা ও ছিনতাইয়ের কোনো ছবি তুলতে পারেনি। কেউবা মোবাইলে গোপনে ছবি তুলতেও তাদের মোবাইল ও ক্যামেরা নিয়ে যায় আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসীরা।
বিভিন্ন কেন্দ্রে শাসকদলের কর্মীরা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কমপক্ষে ১৫ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সকাল ১১টায় শহরের হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ব্যালট পেপার ছিনতাই ও ব্যালট বাক্স ভাঙচুরের ছবি তুলতে গেলে সাংবাদিক এম আর ইসলাম বাবুর ক্যামেরা ভেঙে ফেলে ওই কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা শাহরাস্তি থানার ওসি মোজাম্মেল হক। এসময় তিনি ওই সংবাদকর্মীকে গুলি করারও হুমকি দেয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চাঁদপুরের বিভিন্ন উপজেলার চেয়ারম্যান ও ইউপি চেয়ারম্যানদের নেতৃত্বে হাজারো কর্মী বাহিনী পৌর নির্বাচনে বিভিন্ন ব্যাজ ধারণ করে কেন্দ্র দখল, ভোট সিলিং ও সন্ত্রাসী কাজে অংশ নেয়।
এ নিয়ে ভোটার ও সহকারি প্রিজাইডিং অফিসারদের সঙ্গে চলে বাক-বিতণ্ডা। সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা ভোট কেন্দ্রগুলোতে প্রভাব বিস্তার করায় সাধারণ ভোটাররা নিরাপদে ভোট দিতে পারেনি না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা লাইনে দাঁড়ানো ভোটারদের ওপর অকারণে লাঠিচার্জ করে। ভোটাররা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার সুযোগে শাসকদলীয় সন্ত্রাসীরা কেন্দ্রে ঢুকে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে সিল মারে বলে অভিযোগ করেন মেয়র প্রার্থী শফিকুর রহমান ভূঁইয়া।
শহরের সড়কগুলোতে র্যাব, বিজিবিসহ অন্যান্য বাহিনীর কড়া টহল থাকলেও ভোটকেন্দ্রের ভিতরের চিত্র ছিল ভিন্নতর।
সকালে ভোটগ্রহণের শুরুটা উৎসবমুখর থাকলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই তা’ ম্লান হয়ে যায়। আতঙ্কে অধিকাংশ ভোটাররা বাড়ি ফিরে যায়। ফলে সকাল ১০টার মধ্যে অধিকাংশ ভোট কেন্দ্রের মেয়র পদের ব্যালট পেপার না থাকায় ভোটের উৎসব শেষ হয়ে যায়।
পৌর নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার আতাউর রহমান জানান, যেসব কেন্দ্রে সমস্যা হচ্ছে সেখানেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পাঠানো হয়েছে।
পৌরসভায় মোট ভোটার ১ লাখ ১ হাজার ১শ’ ২২ জন। দীর্ঘ ৯ বছর পর এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগ সমর্থিত বর্তমান মেয়র নাছির উদ্দিন আহমেদ (মোবাইল ফোন) এবং স্বতন্ত্র হিসেবে সাবেক পৌর চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা শফিকুর রহমান ভূঁইয়া (জগ) প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
এ ছাড়া ১৫টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে ৯৩ জন ও সংরক্ষিত ৫টি ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ২৭ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ৩ প্লাটুন বিজিবি, বিপুলসংখ্যক পুলিশ, র্যাব, ব্যাটালিয়ন পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুর পৌর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়।
নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলাসহ এ নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে না এমন অজুহাতে নির্বাচন বর্জন করে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট।
চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মো. আমির জাফর নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেন, নির্বাচনে দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। এসময় বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে ২০ রাউন্ড শর্টগানের গুলি নিক্ষেপ করা হয়। জেলা প্রশাসক মো. ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তার সঙ্গে কথা বলা যায়নি।

