দি কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লীগ অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (কালব) দখলদার অবৈধ চেয়ারম্যান এবং জুলাই গণঅভ্যূত্থান হত্যা মামলার আসামী আগষ্টিন পিউরিফিকেশনের বিরুদ্ধে বিগত ৩ বছরে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠান থেকে ৫০০ কোটি টাকা লোপাট করার অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমাকৃত এক অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দাম দেখিয়ে জমি ক্রয় করেছেন এবং সেই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। আগষ্টিন পিউরিফিকেশন তার ব্যক্তিগত স্বার্থে সমবায় প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবহার করেছেন এবং জমি কেনার ক্ষেত্রে অবৈধভাবে ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ কাজে লাগিয়েছেন। দুদকে করা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, আগষ্টিন পিউরিফিকেশন তার ব্যক্তিগত সহকারী মোঃ মজিবুর রহমানের নামে প্রকৃত মালিকের কাছ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়ে পরে কালব-এর নামে ওই জমি বেশি মূল্যে ক্রয় করেন। শুধুমাত্র মোঃ মজিবুর রহমানের কাছ থেকেই ১৮২ শতাংশ জমি কিনতে ২০ কোটি ৭২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়, যা বাজারদরের তুলনায় অনেক বেশি বলে অভিযোগে উল্লেখ আছে। এ ছাড়া কালব হাউজিং সোসাইটি থেকে বুক ভ্যালুতে জমি কেনার নামে প্রকৃত মূল্য গোপন করে দুই ধাপে ৮.৫ শতাংশ জমি কেনা হয়। রংপুরেও বোর্ডের অধিকাংশ সদস্যের আপত্তি উপেক্ষা করে জমি কেনা হয় এবং সেখানে শতাংশ প্রতি ১২ লাখ টাকা মূল্য দেখিয়ে ১৭ শতাংশ জমি কেনার সময় দুই কোটিরও বেশি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, কালব ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের জমি ক্রয়, মূল ভবন নির্মাণ, কালব রিসোর্ট অ্যান্ড কনভেনশন হলের উন্নয়নসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়ম-নীতির কোনো অনুসরণ করা হয়নি। বরং এসব প্রকল্পকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। পাশাপাশি বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনি লড়াইয়ের নামে বর্তমানে চলমান মামলাগুলোর জন্য খরচ দেখিয়ে আগষ্টিন পিউরিফিকেশন অন্তত ৫ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে আরও দাবি করা হয়, প্রতিষ্ঠানটির অর্থ বিদেশে পাচারও করা হয়েছে। অবৈধভাবে বোর্ড নিয়ন্ত্রণ করা আগষ্টিন পিউরিফিকেশন নাকি বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বিদেশে, বিশেষ করে আমেরিকায় পাচার করেছেন। তিনি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পরিচিত বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনার তদন্ত করে আগষ্টিন পিউরিফিকেশনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাগেছে, নিজেকে সমবায়ের গডফাদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে এহেন কোনো অপকর্ম নেই যা করেনি আগষ্টিন। বিদ্যমান আইন উপেক্ষা করে চেয়ারম্যান হিসেবে বহাল আছে আগষ্টিন পিউরীফিকেশন। যাকে কালবের একটি অংশ অবৈধ হিসেবে দাবি করছেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও রাজধানীর ২৭ নাম্বার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি শাহাদাত হোসেন চৌধুরী মিন্টুর প্রভাবেই এসব অপকর্ম সম্ভব হয়েছে। আসাদুজ্জামান কামালের আশ্রয় প্রশ্রয়েই তিনি দু’টি সমবায় অবৈধভাবে দখলে রেখে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করেছে বলে দাবি করেছে একই সূত্র।
গাজীপুর জেলার টঙ্গী থানার পাগার গ্রামের দর্জি ও জমির দালাল আগষ্টিন পিউরিফিকেশন ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারির ৩ তারিখে দি মেট্রোপলিটন খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিঃ (এমসিসিএইচএসএল) এর সদস্য হন। বাকি গল্পটা আলাদিনের চেরাগের কাহিনীকেও হার মানিয়েছে, চেরাগ ঘষে এখন হাজার কোটি টাকার মালিক, নামে বেনামে দেশে বিদেশে গড়েছেন অঢেল সম্পদ। সমবায় প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বেহাত করে আবাসন ও ডেভেলপার কোম্পানি ‘স্বস্তি নিবাস লিঃ’ গড়ে তুলেছেন। এমনকি মাফিয়া আগষ্টিন নিজের ইমেজে ঠিক করতে পেশাদার পিআর এজেন্সিও নিয়োগ দিয়েছেন। ১১ নভেম্বর-২০২২ তারিখে অনুষ্ঠিত হয় কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি দি কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লীগ অব বাংলাদেশের নির্বাচন, যে নির্বাচন জন্ম দিয়েছিল নানা বিতর্কের। কালবে নির্বাচন করার জন্য প্রাথমিক যোগ্যতা, সিউডিসিসি কোর্স সম্পন্ন করেন নি আগষ্টিন পিউরিফিকেশন। চেয়ারম্যান প্রার্থী আগষ্টিন পিউরিফিকেশনের সিইউডিসিসি কোর্স না করার কারণে মনোনয়ন বাতিল করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তার নামে ব্যালট মুদ্রণও স্থগিত করেন নির্বাচন কমিটি। কিন্ত কোন এক অদৃশ্য কারণে শেষ সময়ে এসে কোন পত্র ইস্যু করা ছাড়াই তার প্রার্থীতা বহাল রাখে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, আগষ্টিন পিউরিফিকেশনকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করা সম্পূর্ণ বেআইনী। তিনি বেআইনী ভাবে কালবে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। আকু অনুমোদিত কালব পরিচালিত সিইউডিসিসি কোর্সের বিকল্প হিসেবে, কাককো প্রদত্ত সিইউএমডিসিসি সনদ কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটা কোন কর্মে যখন সরকার স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ থেকে সনদ চাওয়া হয়, তখন তার স্থলে প্রাইমারি স্কুলের সনদ দাখিল করার শামিল। কাককো ক্রেডিট ইউনিয়ন ম্যানেজমেন্ট এন্ড ডিরেকটর কম্পিটেন্সি কোর্স (সিইউএমডিসিসি) নামে কোন প্রশিক্ষণ কোর্স কখনো পরিচালনা করেনি, নেই কোন কোর্স কারিকুলামও। সমবায় অধিদপ্তর ও নির্বাচন কমিটি আইন আদালতের সাথে কৌশলে প্রতারণা করেছেন। সমবায় অধিদপ্তরের অতিরিক্ত নিবন্ধক নবিরুল ইসলাম ও যুগ্ম নিবন্ধক কামরুজ্জামানের মত অসৎ কর্মকর্তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় আগষ্টিন সমবায় গডফাদার থেকে সমবায় দানবে পরিণত হয়েছে বলে সূত্র দাবি করছে। ঘুষখোর অসৎ সমবায় কর্মকর্তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রহসনের নির্বাচনের আয়োজন করে আগষ্টিন আরেক মেয়াদের জন্যে কালব দখলে রাখার জন্যে তৎপরতা শুরু করেছেন। সূত্রমতে, দি কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লীগ অব বাংলাদেশ (কালব) এর প্রস্তাবিত প্রধান কার্যালয়ের জন্যে দি মেট্রোপলিটান খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লি:(এমসিসিএইচএসএল) থেকে বাজারদরের প্রায় দেড়গুণ, কারো মতে প্রায় দ্বিগুন মূল্যে জমি ক্রয় করার তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকা জেলার ভাটারা এলাকার বাড্ডা সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসের অধিন ১০০ ফিট মাদানী রোডে অবস্থিত ভাটারা ৩ নং প্রকল্পের ১৮ ও ১৯ নং প্লট রাস্তার অংশ সহ ৫.৪৩৯ কাঠা জমি ক্রয় করার নিমিত্তে জমির মূল্য, রেজিস্ট্রেশন, খাজনা, সার্ভে, ভ্যাট ও ৬% ফান্ড কস্ট সহ মোট পরিমান ৮,৪১,৭৪,০৭৬.৩৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তিতে ফান্ড কস্ট বাদ দেয়া হয়। গত ১৩ জুন-২০২৩ তারিখে ৭৯৪০৯৫০৬ টাকা মূল্যে জমি রেজিস্ট্রেশন করা হয়। দলিল নং ৮৪৪৮/২০২৩। স্থানীয়রা জানিয়েছে সি.এস ও এস.এ ২৭০৭,আর.এস ৭০৭১ ঢাকা সিটি জরিপের ১৫৪২৬ নং দাগের ভিটা জমি ০৫০৮ অযুতাংশ ও ০৩১২ অযুতাংশ এবং সিএস ও এস.এ ২৭৩৪ ,আর.এস ৭০৭০ ঢাকা সিটি জরিপের ১৫৪৩৮ নং দাগের ০০৭৭.৫০ অযুতাংশ জমি ক্রয় করা হয়। এদিকে খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, ক্রয়কৃত জমির এলাকার শ্রেণি অনুপাতে বাজারদর ৮০ থেকে ১ কোটি টাকার মধ্যে।
আগষ্টিন দি মেট্রোপলিটন খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিঃ ও দি কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লীগ অব বাংলাদেশ লিঃ (কালব) এ অবৈধভাবে চেয়ারম্যান সমিতিকে বানিয়েছেন নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আইনগত ভাবে এমসিসিএইচএসএল-এ থাকার সূযোগ না থাকায় আগষ্টিনের ভগ্নিপতি ও ছেলেকে দিয়ে পরোক্ষভাবে প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। বোর্ড সদস্যরা তার অধীনস্থ কর্মকর্তা কর্মচারীর মতো কাজ করেন। কালব সূত্র জানায়, সমবায় অধিদপ্তর এমসিসিএইচএসএল এর যে অডিট করে তাতে অনিয়ম দুর্নীতির ছিটেফোঁটাও ওঠে আসে না। গোপন সমঝোতার কারণে অডিট দলের নজরে পড়ে না কোন অনিয়ম দুর্নীতি। তাছাড়া, একাধিক সমবায় কর্মকর্তা নিয়মিত এমসিসিএইচএসএল এ অফিস করে। এছাড়া, জমি সরাসরি ক্রয় না করে তার স্ত্রী, পুত্র, ভাই ও আত্মীয় স্বজনের নামে পাওয়ার অব এটর্নী নিয়ে আবার বেশি দামে সমিতির কাছে বিক্রি করেন। প্লট ফ্লাট বিক্রির ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেন। এবং এমসিসিএইচএসএল’র সকল ঠিকাদারি কাজ নামে বেনামে তার পুত্রদ্বয়, স্ত্রী, ভাই সহ পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনরাই করে বলে অভিযোগ উঠেছে । তার পরিবারের সদস্যদের ব্যবসা বলতে এমসিসিএইচএসএল’র ঠিকাদারি। যদিও সমবায় আইন, বিধি, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস ও সমিতির উপ-আইন অনুযায়ী চেয়ারম্যানের পরিবারের সদস্যরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ঠিকাদারি কাজে অংশগ্রহণ করতে পারেন না। আগষ্টিনের সম্পদের খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, আমেরিকার মিশিগান অঙ্গরাজ্যে দু’টি বাড়ি, গাজীপুর জেলার টঙ্গী থানাধিন পাগাড়ে বিলাশবহুল বাড়ী, টঙ্গীস্থ জীনুর মার্কেটে একটি ৫তলা ও একটি ৭ তালা বিল্ডিং, তেজগাঁও হুন্ডা গলিতে ২টি ফ্লাট, মনিপুরিপাড়ায় ১টি ফ্লাট, উওরা ১৬ নং সেক্টরে ৫ কাঠা প্লট, এশিয়ান টাউনে ২টি প্লট, পাগাড়ে ১ বিঘার প্লট, পাগাড়ে ১৫ কাঠার উপর বাড়ী, শেরপুর বার মারিতে আড়াই বিঘা প্লট, তুমিলিয়ায় ২০ বিঘা প্লট, বাটারা ৪ নং সেক্টরে ২টি প্লট, ২য় স্ত্রী লতার নামে উওরার ৯ নং সেক্টরে ২টি প্লট, মাউসাইদে ২ বিঘা প্লট এবং ভাদুনে ১টি প্লট রয়েছে। সমবায় মাফিয়া থেকে সমবায় দানবে পরিণত হওয়া আগষ্টিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে সমবায়ী সদস্যদের পক্ষ থেকে একাধিকবার অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না বলে কালব সূত্রে জানাগেছে।

