মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে একতরফা সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত শুল্কনীতি ও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানর ক্ষমতা পুনর্প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে নেওয়া হলেও, বাস্তবে তা দেশটির একচ্ছত্র আধিপত্যের ক্ষয়কে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
আমেরিকা এখনো শক্তিশালী, কিন্তু তার জোরজবরদস্তিমূলক কৌশল চীনসহ অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী এবং অংশীদারদের ওয়াশিংটনের নাগালের বাইরে, বিশেষ করে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোকে ওয়াশিংটনকে উপেক্ষা করে একটি বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে উৎসাহিত করছে। আমেরিকার শুল্ক আরোপের পর সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বিষয় ছিল এর বিরুদ্ধে প্রতিশোধের পরিবর্তে দেশগুলোর নীরব অভিযোজন।
চীন ও কানাডা ছাড়া খুব কম দেশই সরাসরি পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু, এই মৌনতার আড়ালে বৈশ্বিক বাণিজ্য একীভূতকরণ ঘটে চলেছে। ২০২৫ সালে এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার বহু দেশনতুন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি করেছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক জোটগুলো আরও সক্রিয় হয়েছে, যেখানে চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো ডিজিটাল ও পরিবেশ বান্ধব ‘সবুজ খাত’ অন্তর্ভুক্ত করে তাদের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি আরও বিস্তৃত করেছে, যা অর্থনৈতিক নোঙর হিসেবে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে স্পষ্ট করে তুলেছে।
বিরল খনিজের সরবরাহ শৃঙ্খলে আমেরিকার একতরফা নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টাও সীমাবদ্ধতায় সম্মুখীন হয়েছে। চিলি ও ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন বহু সম্পদসমৃদ্ধ দেশ লিথিয়াম, নিকেলসহ অন্যান্য কৌশলগত খনিজের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করছে। আফ্রিকার কিছু দেশ পশ্চিমা মালিকানাধীন খনিও জাতীয়করণ করেছে, যা মার্কিন ও ইউরোপীয় প্রভাবের বিরুদ্ধে বৃহত্তর প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত।
জ্বালানি ও জলবায়ু ইস্যুতে আমেরিকার অনীহার সুযোগে চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নিঃসন্দেহে অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে উঠে এসেছে। এশিয়া, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকা জুড়ে সৌরবিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে মার্কিন নীতির চেয়ে চীনা প্রযুক্তি ও
বিনিয়োগ দ্বারা প্রভাবিত।
বিশ্বে বহুপাক্ষিকতা বিলুপ্ত হয়নি, বরং রূপ বদলাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ বিভাজন সত্ত্বেও, চীনের ব্রিক্স জোটের সম্প্রসারণ আমেরিকার প্রভাবের বাইরে সহযোগিতার একটি মঞ্চ তৈরি করেছে। এদিকে, রাশিয়াকে নিরস্ত করা এবং ইউক্রেনে টেকসই শান্তির মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে ইউরোপও এখন নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন নিয়ে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। একটি উদীয়মান বিশ্ব ব্যবস্থার সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র দেখা যাচ্ছে এশিয়ায়। অনেক দেশ আমেরিকা ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রেখে চলছে। তারা একদিকে বেইজিংয়ের সঙ্গে আঞ্চলিক কূটনীতিতে যুক্ত হচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সক্ষমতা জোরদার করছে।
এই উদীয়মান বিশ্বব্যবস্থা আপাতত অগোছালো এবং অসম, তবে এটি স্পষ্টতই আমেরিকাকেন্দ্রিক নয়। যেসময় মার্কিন ক্ষমতার বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে, দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা ক্রমশ আরও আঞ্চলিক ও সমস্যা-ভিত্তিক হয়ে উঠছে, যেখানে মার্কিন আধিপত্য এখন আর বিশ্বব্যবস্থার একমাত্র ভিত্তি নয়।

