নিজস্ব প্রতিবেদক: আজ ২৭ মার্চ। রাজধানীর সূত্রাপুর মালাকারটোলা গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চের অপারেশন সার্চলাইট নামে মধ্যরাতে লোহারপুরের মালাকারটোলার হিন্দু মহল্লার ঘুমন্ত মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাক হানাদার বাহিনী। সেই কালরাতে নৃশংসশভাবে হত্যা করা হয়েছিলো ১৫ আদম সন্তানকে। ইতিহাসের সেই ক্ষতচিহ্ন নিয়ে আজো ডুকরে কাঁদে মালাকারটোলা, ডুকরে কাঁদে শহীদদের স্বজনরা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম আসে, ক্ষমতার হাত বদলায় রাজ্য, কিন্তু মালাকারটোলায় যেন কোনো পরিবর্তন নেই ইট ও লোহার ব্যাপ্তি ছাড়া।
২৭ মর্চের সেই মধ্যরাতে ১৫ জনের ১৪ জনই ছিল সংখ্যালঘু হিন্দু। তারা হলেন- ড. হরিনাথ দে, ইন্দ্র মোহন পাল, বিল্পব কুমার দে, দুলাল চন্দ্র দে, লাল মোহণ সাহা, মণিলাল সাহা, গোলাপ চাঁন সাহা, ক্ষিতিস চন্দ্র নন্দী, প্রাণ কৃষ্ণ পাল, বিশ্বনাথ দাস (পল্টু), জীবন ঘোষ, দীনেশ চন্দ্র দাস, জীবন কৃষ্ণ দাস, রাম কৃষ্ণ দাস। বাকিজন হলেন হারুন-অর-রশীদ।
স্বাধীনতার ৩৯ বছর (২০১০ সালে) পর মালাকারটোলা মোড়ে শহীদদের স্মরণে একটি স্মারক ম্যুরাল নির্মাণ করা হয়। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে সূত্রাপুরের মালাকারটোলা লেনের লোহারপুলে যে বীর সন্তানেরা পাক-হানাদার বাহিনীর গুলিতে জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের স্মরণে এই স্মৃতির ম্যুরালটি সরকারি অনুদান ছাড়াই তৈরি করে ১৯৭১ শহীদ স্মৃতি সংসদ।
এর পর থেকে প্রতিবছর ২৭ মার্চ ১৯৭১ শহীদ স্মৃতি সংসদ এর পক্ষ থেকে ম্যুরালে পুস্পস্তবক অর্পণ ও বিকেলে প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে শহীদদের স্মরণ করা হয়।
গণহত্যার সেই বিভীষিকাময় দিন:
১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ সকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী লোহারপুল এলাকার মালাকারটোলার হিন্দু মহল্লায় আক্রমণ চালায়। একসঙ্গে ১৫ জনকে ধরে লোহারপুলের উপর নিয়ে যায়। তারপর সবাইকে দাঁড় করিয়ে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করে। ঘটনাস্থলেই ১০ জনের মৃত্যু হয়। বাকি ৫ জন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ফিরে আসেন। মরণযন্ত্রণা ভোগ করে দুই বছর পর তাদের মৃত্যু হয়।
গণহত্যার প্রত্যক্ষ সাক্ষী:
সে দিনের শহীদ গোলাপ চান সাহার স্ত্রী ৯০ বছরের বৃদ্ধা গিরীবালা সাহা স্বামীর স্মৃতি বহন করে বেড়াচ্ছেন ৪৫ বছর ধরে। তিনি বলেন, ‘সেই দিন একটি কথা বলবে বলে পাক সেনারা আমার স্বামী গোলাপ চান সাহাকে ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু জীবিত অবস্থায় আর ফিরে আসেননি তিনি। পরে তার মৃত দেহ পাওয়া যায় সূত্রাপুর লোহারপুল এলাকায়। ৪০/৪৫ বছরেও সরকারিভাবে কোনো ধরনের আর্থিক সহযোগিতা পাওয়া যায় নি। এমনকি সরকারি গেজেটে আমার স্বামীর নামও তালিকাভূক্ত হয়নি।’
সূত্রাপুরের এই গণহত্যার প্রত্যক্ষ সাক্ষী বাবুল দে বলেন, ‘২৭ মার্চ সকালে পাক সেনারা মহল্লায় আক্রমণ চালায় এবং মর্টার শেল মারে। সেদিন পুরো মালাকাটোলা কেঁপে উঠে। তখন মহল্লা ছিল জনশূন্য। কোনো বাড়িতে মানুষ ছিল না। থানায় মাত্র একজন পুলিশ ছিলো, তাকেও মেরে ফেলা হয়। ওইদিন বিকেলে সূত্রাপুর থানায় আর্মি ক্যাম্প করা হয়। থানার বিপেরীতে লক্ষ্মী ফার্মেসি ছিল। সেখানে ফার্মেসিতে গিয়ে দেখি আর্মিরা সব ওঁৎ পেতে আছে। রাতে পাক বাহিনী চিহ্নিত কিছু বাড়িতে আক্রমণ চালায়। প্রথমে যায় ড. হরিনাথ দের বাড়িতে। তারা হরিনাথ দেসহ আরও তিনটি বাড়ি থেকে মোট ১৩ জনকে ধরে নিয়ে ২০০ গজ দুরে একটি মন্দিরের সামনে জড়ো করে। পাক সেনারা ড. হরিনাথ দেকে সঙ্গে করে আমাদের বাড়িতে আসে। তারা আমাদের বাড়ির দরজা লাথি মেরে ভেঙে ফেলে। তারপর সরাসরি দু’তলায় উঠে আসে। দোতলায় গিয়েই পাক সেনারা দেখতে পায় আমাদের ঠাকুরঘর। তারপরও জিজ্ঞেস করে, ‘তুম হিন্দু হ্যায়?’
আমরা হিন্দু বুঝতে পেরে তারা আমার ভাই ও বাবাসহ মোট ১৩ জনকে ধরে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে ড. হরিনাথ দেকে জিজ্ঞেস করে, তুম সব হিন্দু হ্যায়? ড. হরিনাথ দে বলেন, জি হিন্দু হ্যায়। তারপর সবাইকে লোহারপুলের সামনে নিয়ে যায়। আমার দুই ভাই বিল্পব কুমার দে খোকন ও দুলাল চন্দ্র দে দুলু আমার বাবা কালীপদ জিজ্ঞেস করে তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? তখন আমার বাবা বলেছিলেন, ভগবানকে ডাক। তারপর তাদের নিয়ে গিয়ে লোহারপুলের সামনে দাঁড় করিয়ে পাখির মতো গুলি করে মারে।
অশ্রুসজল চোখে বাবুল দে বলেন, ‘পাক সেনাদের হাত থেকে বাঁচতে আমরা যখন পালানোর চেষ্টা করছিলাম তখন অনেক গুলির শব্দ পেই। পরে জানতে পারলাম আমার বড় দুই ভাই এবং বাবাকে গুলি করা হয়েছে। কিন্তু ঈশ্বরের কৃপায় আমার বাবা ১৩ জনের মধ্যে প্রাণে বেঁচে গেলেও দু’ভাই ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে আমরা জানতে পারি, বাবা গুলিবিদ্ধ অবস্থায়ি এলাকার ডা. আজিজুন নেসার বাড়িতে গিয়ে উঠেছিলেন। তিনি তার লোক দিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করায় বাবাকে।’
বাবুল দে আরও বলেন, ‘আমাদের বাড়িটি ছিল সাবেক ন্যাপের ঘাঁটি। অনেক বড় বড় নেতা এখানে বৈঠক করেছেন। দু’বছর মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করে আমার বাবা মারা যান।
গণহত্যার নীরব সাক্ষী:
পাক বাহিনীর গুলি থেকে বেঁচে যাওয়া পরেশ চন্দ্র দাস বলেন, ‘আমার বাম গালের চোয়ালের নিচে গুলি লেগে বাম ঘাড়ের দিক দিয়ে বের হয়ে যায়। ২৫ মার্চের পর ঢাকায় কারফিউ ছিল। দিনের বেলায় কিছুক্ষণের জন্য সান্ধ্যআইন শিথিল করা হয়। তখন আমি পূর্ব পাকিস্তান বিদুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে ডিআইটি ভবনের দোতলায় অফিসে কর্মরত ছিলেন। একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে অন্যান্য চাকরিজীবীর মতো ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ কারফিউ শিথিল থাকায় অফিসে উপস্থিত হলাম। অবস্থার অবনতি ঘটলে আমি বাড়িতে চলে আসি। ওই দিন বিকেলে পাকিস্তানি সেনারা মালাকারটোলা আক্রমণ করবে-এই খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে জনতা বেরিকেড দিয়ে সূত্রাপুর থানার পশ্চিমে তিন রাস্তার মোড়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে ২৭ মার্চ রাত ১০টায় মালাকারটোলার লেনে ঢুকে পড়ে হানাদাররা। আগে থেকেই মালাকারটোলায় কিছু অবাঙালি স্থায়ীভাবে বসবাস করতো। সম্ভবত তারাই হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িগুলোকে চিহ্নিত করে রাখে। তাদের সহযোগিতায় পাক সেনারা সশস্ত্র অবস্থায় হিন্দু বাড়িতে ঢুকে নির্বিচারে অত্যাচার চালায়। এক পর্যায়ে এলাকার ২০ জনকে ধরে এনে বিহারীলাল জিউ বিগ্রহ মন্দিরের সামনে জড়ো করে। অন্যদের সঙ্গে আমি ও আমার ছোট ভাই বিশ্বনাথ দাসকেও (পল্টু) এখানে নিয়ে আসা হয়। সবাইকে থানায় ও পরে লোহারপুলের ওপর এক লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখে। পুলের দক্ষিণ দিক থেকে সৈন্যরা আমাদের ওপর ব্রাশ ফায়ার চালায়। সঙ্গে সঙ্গে ৭/৮ জন পুলের উপরে লুটিয়ে পড়ে। পরক্ষণেই দ্বিতীয় দফায় ব্রাশ ফায়ার করে। দ্বিতীয় দফায় ওই আক্রমণে আমি ও আমার ছোট ভাই পুলের ঢালে লুটিয়ে পড়ি। আমার বাম গালের চোয়ালের নিচে গুলি লেগে বাম ঘাড়ের নিচের অংশ দিয়ে বেরিয়ে যায়।’
পরেশ চন্দ্র বলেন, ‘২৮ মার্চ সকালে আমাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে কিছুদিন চিকিৎসাধীন ছিলাম। এপ্রিলে মাঝামাঝি সময়ে কিছুটা সুস্থ হয়ে বুড়িগঙ্গা অতিক্রম করে বহু কষ্টে কুমিল্লা হয়ে ভারতে প্রবেশ করি। ১৬ ডিসেম্বের দেশ স্বাধীন হলে পরিবার পরিজনসহ আমি ঢাকায় নিজ বাড়িতে ফিরে আসি। ঘটনাক্রমে বেঁচে থাকলেও আমার ছোট ভাই বিশ্বনাথ দাস (পল্টু) ২৭ মার্চ পাক সেনাদের গুলিতে শহীদ হন।’
পাকিস্তানি সৈন্যের নির্মম নির্যাতন আর গণহত্যার নীরব সাক্ষী মালাকারপাড়ার বেদনা রানী সাহা। তিনি বলেন, ‘২৬ মার্চ রাতের খাবার খেয়ে আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়ি। রাত ১২টায় ডা. হরিনাথ দে আমার ভাসুরকে (নাম মনিলাল) ডাকেন। আমার ভাসুর বেরিয়ে এসে দেখেন হরিনাথ দের সঙ্গে ৫/৬ জন পাক সেনা। ঘর থেকে ভাসুর বের হওয়ার পর তাকে বাড়ির বাইরে নিয়ে যায়। তারা আমার অন্য ভাসুরদের ডাকতে বললে আমার ভাসুর তার ভাই লাল মোহন সাহা, গোলাপ চাঁন সাহা ও মোহন লাল সাহাকে ডেকে ঘর থেকে বের করেন। এসময় তাদের না নেয়ার জন্য পাক সেনাদের কাছে অনেক কাকুতি-মিনতি করেছি, পায়ে ধরে কান্নাকাটি করেছি। পাক সেনারা অভয় দিয়ে বলে, এদের সঙ্গে আলাপ করে ছেড়ে দেব। তখন তারা আমার কাছ থেকে টাকা চায়। কখন কী ঘটে, কোথায় চলে যেতে হয়, তাই ৫০/৬০ ভরি স্বর্ণ ও ৫ লাখ টাকাভর্তি একটি ব্যাগ রাখা ছিল আলমারিতে। ভয়ে আলমারির চাবি দিতে দেরি হওয়ায় সৈন্যরা বন্দুকের বাট দিয়ে আলমারির তালা ভেঙে ব্যাগ ও তাদের চার জনকে নিয়ে যায়। ওই সময় আমাদের একটা হোটেল ছিল। সকালে হোটেলের কর্মচারীরা তাদের মৃতদেহগুলো পুলের ঢালে দেখে আমাদের বাসায় খবর দেয়। আমি দ্রুতি ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি মোহন লাল সাহা ছাড়া সবাই মারা গেছেন। মোহনকে এলাকার এক মহিলা গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঘরে লুকিয়ে রেখেছিলেন। আমি মোহনকে আমার কাপড় দিয়ে জড়িয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাই। সে প্রাণ বেঁচে যায়। প্রায় ১৫ বছর বেঁচে ছিল।’
২৬ মার্চের কালোরাত্রির আরেক নীরব সাক্ষী রাধাগোবিন্দ পাল। তিনি তার চোখে দেখা পাক সেনাদের হত্যা, হামলা ও নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন প্রতিবেদকের কাছে। তিনি বলেন, ‘সেই দিন ৬/৭জন পাক সেনা ডা. হরিনাথকে সঙ্গে নিয়ে হরিণাথের মাধম্যে আমার নাম ধরে ডাকতে থাকেন। দরজা না খুলে ভিতরের দিকে এক ঘরে আমরা আশ্রয় নিই। আমার বাবা ইন্দ্র মোহন পাল, মেঝ ভাই প্রাণকৃষ্ণ পাল এবং আমার এক বোনজামাই ক্ষিতিস চন্দ্র নন্দী আমাদের সঙ্গেই ছিলেন। ডাকাডাকির শব্দে সাড়া না পেয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা ঘরের দরজা ভেঙে বাড়িতে ঢুকে ফাঁকা গুলি করে। এরমধ্যে আমার বাবা, মেঝ ভাই ও ভগ্নিপতি, আমার শিশু ছেলে রতনসহ বাথরুমে লুকিয়ে ছিলাম। পাক আর্মি টর্চ লাইটের আলোতে তাদের দেখতে পায় এবং তাদের মন্দির গেটের সামনে অন্যদের সঙ্গে একত্রিত করে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমার ছেলে রতন বাসায় ফিরে আসে। পাক বাহিনী চলে যাওয়ার পর আমরা ছাদ টপকে অন্য বাড়িতে যাওয়ার সময় আমি ও আমার মা আহত হই। পরে লোক মারফত খবর পাওয়া গেল অন্যদের সঙ্গে আমার বাবা, ভাই ও ভগ্নিপতিকে লোহার পুলের উপর দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। তখন আমরা ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে শূন্য হাতে নদীর ওপারে চলে যাই। এই ভয়াবহ ঘটনার পর ৩৯ বছরেও আমাদের খোঁজ খবর রাখেনি কেউ। কোনো স্মারকস্তম্ভ বানায়নি কেউ। ২০১০ সালে মালাকারটোলা মোড়ে শহীদদের স্মরণে একটি স্মারক ম্যুরাল তৈরি করা হয় শহীদ পরিবারগুলোর উদ্যোগে।

