নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশটা ছিল বিধ্বস্ত অবস্থায়। কোন কিছুই ঠিকঠাক ছিল না। বাংলাদেশের শুরুটা করতে হয়েছিল শূন্য হাতেই। শূন্য থেকে বর্তমানে আড়াই লাখ কোটি টাকার বাজেট প্রণয়ন করে বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেটটি ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা।
সেই শূন্য থেকে সূচনা হওয়া অর্থনীতি আজকে এরকম- পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছে বেসরকারি খাত। মানুষের মাথাপিছু আয় ছাড়িয়েছে এক হাজার ডলার। দেশ হয়েছে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আসছে বৈদেশিক মুদ্রা, বাড়ছে রিজার্ভের পরিমাণ।
রিজার্ভ:
আজকের বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে ২২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। যা কিনা পাকিস্তানের রিজার্ভের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। আর এই রিজার্ভ খরচ করে বাংলাদেশের মানুষের ৬ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশই এখন একমাত্র দেশ যার রিজার্ভ থেকে ৬ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। এ পরিমাণ রিজার্ভ নিয়ে বাংলাদেশ সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
রেমিট্যান্স:
বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই কমবেশি বাংলাদেশিরা চাকরিসহ নানা ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য করে থাকে। তাদের আয় থেকে বাংলাদেশে প্রতিমাসে বৈদেশিক মুদ্রা আসে শত কোটি ডলারের বেশি। সর্বশেষ বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা এসেছে ১ হাজার কোটি ডলার। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি।
আমদানি-রপ্তানি:
চলতি অর্থবছরের সর্বশেষ আট মাসে রপ্তানি আয় এসেছে ২০ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেশি। একটা সময় ছিল যখন শুধু আমদানিই করতে হতো। রপ্তানির করার মতো পণ্য ছিল না বাংলাদেশের। বর্তমানে বিশ্বের ১৯২টি দেশে বাংলাদেশ ৬৯২টি পণ্য রপ্তানি করে থাকে। যেখানে মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে।
সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ:
চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ হয়েছে সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। যা পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার দুই গুণেরও বেশি। চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ এসেছে ১৮ হাজার ২৮৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা। যা পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৯ হাজার ২২৭ কোটি ১৪ লাখ টাকার বেশি। এ অর্থবছরে নিট বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ৫৬ কোটি টাকা।
সরকারের ব্যাংক ঋণ:
একটা সময় সরকারকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে দেখা গেছে। ক্ষমতার পালাবদল হলেও ঋণের বোঝাটা থেকেই যেত। কিন্তু বর্তমানে সঞ্চয়পত্রে এত বেশি বিনিয়োগ হয়েছে যে কারণে চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৯ জানুয়ারি এ সাত মাসে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোনো অর্থ ধার করেনি। উল্টো বিভিন্ন সময়ে নেয়া ঋণের ৯ হাজার ২২৫ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। একই সময় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকার মাত্র ২ হাজার ৩১০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। ফলে সরকারের নিট ঋণ ঋণাত্মক ধারায় নেমে এসেছে। যার পরিমাণ ৬ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা। অথচ গত বছরের একই সময় এ নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা।
স্বাধীনতার পরবর্তীতে দেশের অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য অবদান সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘স্বাধীনতার পর অর্থনীতির মুক্তির ক্ষেত্রে তলাবিহীন জুড়ির যে কথাটা প্রচলিত ছিল সেটা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। তখন সাড়ে ৭ কোটি জনগণের স্থলে আজ ১৭ কোটি জনগণ। সে হিসেবে এক্সপোর্ট বেড়েছে, রেমিট্যান্স বেড়েছে, ব্যবসা বাণিজ্য বেড়েছে, কর্মসংস্থান বেড়েছে। এগুলো প্রমাণ করে অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। সীমিত সম্পদের মধ্যে দেশের ভালো উন্নীত হয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক উন্নয়ন, স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন, শিক্ষা খাতে উন্নয়ন হয়েছে বেশি।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীনতার পর দেশের ব্যবসা বাণিজ্যে প্রাইভেট সেক্টর ভালোভাবে উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। তবে আরো উন্নয়ন হতো যদি আমাদের দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকতো। দেশে যদি গুড গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠা করা যায় তাহলে উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত ও টেকসেই হবে।’ তবে স্বাধীনতার পর ছোট ছোট কিছু নেতিবাচক বিষয় ছাড়া জাতি হিসেবে আমাদের আদর্শগত দিক দিয়ে ইতিবাচক ইমেজই বেশি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন তিনি।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি:
চলতি অর্থবছরে বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে ২০১৩-১৪ সালে সরকারের ৭ দশমিক ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রাথমিক হিসাবে ৬ দশমিক ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
দেশে মাথাপিছু আয় বেড়েছে:
বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু বার্ষিক আয় এখন এক হাজার ১৯০ ডলার। এর অর্থ বাংলাদেশিরা বছরে গড়ে ৯২ হাজার ৫৫২ টাকা আয় করেন। ২০০৪-০৫ ভিত্তিবছর ধরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সাময়িকভাবে এই হিসাব করেছে।
এক অর্থবছরের ব্যবধানে মাথাপিছু আয় ১৩৬ ডলার বেড়েছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৫৪ ডলার। গত বছর ভিত্তিবছর পরিবর্তন করার ফলে মাথাপিছু আয় হাজার ডলার পেরিয়ে যায়। মাথাপিছু আয়ের হিসাবে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের পাঠানো প্রবাসী আয়ও যোগ হয়। তবে মাথাপিছু আয় প্রত্যেক বাংলাদেশির আলাদা বা ব্যক্তিগত আয় নয়। এটি সামগ্রিক আয়, যা মাথাপিছু ভাগ করে দেয়া হয়।

