চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় টিকেট কিনে প্রবেশের নিয়ম থাকলেও টিকেটবিহীন অনেকেই মেলায় প্রবেশ করছেন। স্থানীয় প্রভাবশালী থেকে শুরু করে পথশিশুরাও রয়েছেন এ তালিকায়। প্রভাবশালীরা বীরদর্পে মেলার প্রবেশ মুখ দিয়ে ডুকলেও পথশিশুরা ডুকছে দেয়াল টপকিয়ে। এছাড়া টাকার বিনিময়ে হকাররাও ডুকে পড়ছেন মেলায়। এতে কথিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা কার্যত অরক্ষিত হয়ে পড়েছে।
কয়েকজন স্টল মালিক কাছে অভিযোগ করেন, ‘বাণিজ্য মেলার চাঁদাবাজি করার জন্য প্রতিদিন টিকেটবিহীন শতাধিক লোক প্রবেশ করেন। নানা অজুহাতে তারা চাঁদা আদায় করেন। চাঁদা না পেয়ে স্টল থেকে দামি দামি পণ্য জোর করে নিয়ে যান তারা। ধীরে ধীরে চাঁদাবাজির হার বাড়ছে। ভয়ে মেলা কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়ে কেউ লিখিত অভিযোগ করতে পারছেন না।’
কারা এসব চাঁদাবাজি করছে জানতে চাইলে স্টল মালিকরা বলেন, ‘আমরা তাদের চিনি না। তবে তারা গেইটে সব সময় থাকে। গেইট দিয়ে কোন মালামাল আনতে গেলে প্রতিবার চার-পাঁচশ টাকা নেয়।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন স্টল মালিক বলেন, ‘রাতে আমাদের স্টলগুলো থাকে খুবই অরক্ষিত। কারণ এখানে তালাবদ্ধ করে রাখার ব্যবস্থা নেই। সবদিক বিবেচনায় শত অনিয়ম হলেও কাউকে অভিযোগ দিতে পারছি না।’
এদিকে মেলার প্রবেশমুখ থেকে প্রধান ফটক পর্যন্ত পথশিশুদের জোরপূর্বক অর্থ ও খাবার আদায় বড় ধরনের ভোগান্তিতে ফেলছে দর্শনার্থীদের। অর্থ ও খাবার দেয়া না হলে পায়ে ধরে বসে থাকে তারা। কেউ কেউ জামা ধরেও টানাটানি শুরু করে দেয়।
সরেজমিন দেখা গেছে, পথশিশুরা অবৈধভাবে মেলায় প্রবেশ করে সদলবলে ঘুরছে। কেউ কেউ মেলার অভ্যন্তরে খেলায় মেতে উঠছে। এছাড়া পঙ্গু ভিক্ষুকরাও মেলার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে নানা স্টাইলে ভিক্ষা চাচ্ছেন। দুই পা কাটা এক ভিক্ষুক মাটিতে গড়াগড়ি করে ভিক্ষা চাওয়ার সময় বাবা-মার সাথে মেলায় আসা অনেক শিশু ভয়ে কান্নাকাটি শুরু করে।
স্টল মালিকরা জানান, পার্শ্ববর্তী রেলওয়ে বস্তি থেকে দলে দলে পথ শিশুরা মেলায় আসে। তারা পলোগ্রাউন্ড মাঠের দেয়াল টপকিয়ে সহজেই মেলায় প্রবেশ করে। এরা মেলায় আগত দর্শনার্থীদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলছে। এছাড়া পথশিশুদের আনাগোনার কারণে স্টল থেকে পণ্য চুরির শংকা তৈরী হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, এমন পরিস্থিতিতে মেলায় দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীরা পালন করেন নীরব দর্শকের ভ’মিকা।
রায়হানা ফাতেমা চৌধুরী নামের একজন দর্শনার্থী বলেন, ‘বাণিজ্য মেলার অভ্যন্তরে দু’পা কাটা ভিক্ষুককে দেখে অন্য সব শিশুর মতো আমার মেয়েও ভয় পেয়ে যায়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মতো একটি স্থানে এমন পরিস্থিতি কাম্য নয়।’
সোমবার বিকেলে মেলার ভিতরের একটি খাবার দোকানে নুডলস খাচ্ছিলেন মনজুর আলম ও তার দুই বন্ধু। এসময় পাঁচজন পথশিশু উপস্থিত হয়ে তাদের কাছ থেকে নুডলসের বাটি ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত না খেয়েই পুরো বাটি নুডলস পথশিশুদের দিয়ে দেন মনজুর ও তার বন্ধুরা।
এসময় মনজুর আলম বলেন, ‘মেলার মধ্যে এমনিতেই খাবারের গলা কাটা দাম। মেলা ঘুরে ক্ষুধা লাগায় খাবারের অর্ডার দিয়েছিলাম। কিন্তু খাওয়া আর হল না। এসব বিষয় খুবই বিরক্তিকর।’
তিনি আরো বলেন, ‘পথশিশুদের আমি এমনিতেই যেখানে পাই, ৫-১০ টাকা দিই। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মতো একটি স্থানে এভাবে খাবার কেড়ে নেওয়া মানতে পারছি না।
সিলন চা স্টলে গিয়েও একই চিত্র চোখে পড়েছে। পাঁচ টাকা দামের চা কিনে এক গৃহবধু যখন চায়ে চুমুক দিচ্ছিলেন, তখনই কাপ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত এক পথশিশু। এসময় উপস্থিত ওই গৃহবধুর স্বামী তাকে থামানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।
এছাড়া সরেজমিন মেলা ঘুরে দেখা গেছে বেশ কয়েকজন হকার অবৈধভাবে মেলার অভ্যন্তরে খাবার বিক্রি করছেন। স্টল ছাড়া এভাবে মেলার ভেতরে অবস্থানের বিষয়ে জানতে চাইলে এদের একজন বলে- ‘ভাই, টাকা দিয়ে ডুকেছি। কোন সমস্যা নেই।’
ফ্যাশন ওয়ালের মালিক মো. মাহবুব বলেন, ‘মেলা শুরুর দিকে পার্শ্ববর্তী রেললাইনে দুইটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। এরপর থেকে মেলায় র্যাবের সদস্যরা টানা দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে দিনের অনেক সময় র্যাব সদস্যদের মেলা প্রাঙ্গনে দেখা যাচ্ছে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা ঢাকা থেকে এসেছি। মেলার দেয়াল টপকে অনেকে ভেতরে প্রবেশ করছেন। সবসময় সতর্ক থাকতে হচ্ছে। সার্বক্ষণিক র্যাবের উপস্থিতি থাকলে আমাদের জন্য ভালো হতো।’
এ বিষয়ে মেলার আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান নুরুন নেওয়াজ সেলিমের ব্যবহৃত গ্রামীন নাম্বারে বার বার যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। এছাড়া মেলার কো- চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিনের ব্যবহৃত রবি নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া গেছে।
সর্বশেষ চট্টগ্রাম চেম্বারের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. হারুনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

