নিজস্ব প্রতিবেদক : ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র এখন থেকেই বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসীদের আনাগোনা বাড়তে শুরু করেছে। নির্বাচনে সম্ভাব্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীদের পক্ষে-বিপক্ষে ভূমিকা রাখতে এসব সন্ত্রাসী তৎপর হয়ে ওঠেছে। তাই ঝুঁকিতে রয়েছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরাও। স্থানীয় ও গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে এসব খবর পাওয়া গেছে।
সূত্র জানিয়েছে, একই ওয়ার্ডে সরকারদলীয় একাধিক প্রার্থী মাঠে নেমেছে। দলীয় ক্যাডার ও সন্ত্রাসীরা এদের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাই সংঘাত সহিংসতার আশঙ্কা বাড়ছে। তাছাড়া দুই সিটি করপোরেশনের শতাধিক প্রার্থী প্রতিপক্ষের হামলার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন বলেও মনে করছে এ সূত্র।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘অত্যন্ত অস্থিতিশীল একটি পরিবেশের মধ্যেই সিটি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। এ কারণে পুলিশ আগে থেকে এলাকার খোঁজ-খবর নিচ্ছে। এতে বেশ কিছু এলাকায় নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত-সহিংসতার আগাম আভাস পাওয়া গেছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, ৪৯টি থানার অফিসার ইন চার্জদের (ওসি) মাধ্যমে ৯২টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঠিকানাসহ তাদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। পুলিশের জরিপ অনুযায়ী, সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় এক হাজার। এলাকায় কোন প্রার্থীর সামাজিক অবস্থা কি রকম, কার জীবনের হুমকি আছে, কে সন্ত্রাসী আর কার সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ীদের সখ্যতা আছে- সে সস্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে কার বিরুদ্ধে কতটি মামলা আছে, কে কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত- সে সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে বেশিরভাগ প্রার্থীই আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছেন।
সূত্র জানায়, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড-২ উত্তরা মডেল টাউনের নির্বাচনী প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আনোয়ারুল ইসলাম, ৫ নম্বর ওয়ার্ডে (সেকশন-১১, বাউনিয়া ও ব্লক-এ) কামাল উদ্দিন মাস্টার, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের হোসেন মোল্লা ও আহসান উল্লাহ হাসান, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামীলীগ সমর্থক সেলিম খান ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডের (মিরপুর ১ম,২য়,৩য় কলোনী ও লালকুঠি) আওয়ামীলীগ সমর্থক শাজাহান দেওয়ান প্রচণ্ড ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। এসব ওয়ার্ডে নির্বাচনকে ঘিরে বিবদমান গ্রুপগুলো এখন বেশ সক্রিয়। তাদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে বলেও মনে করছে সূত্রটি।
সূত্র জানায়,পরীরেরবাগ এলাকার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামীলীগ সমর্থক হারুন উর রশিদ মিঠু, কাফরুলের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামীলীগ সমর্থক হাজী আব্দুল কাদের, দামালকোর্টের সালেক মোল্লা ও আতিকুর রহমান, বনানীতে ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামীলীগ সমর্থক মফিজুর রহমান, ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামীলীগ সমর্থক শামীম হাসান ও কাজী আব্দুর রহমান নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাইছেন। তবে তারা একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর টার্গেটে আছেন।
রাজাবাজারে ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে কারাগারে বন্দী শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলামের স্ত্রী আয়েমা সিমি কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে ওই ওয়ার্ডে আওয়ামলীগ সমর্থক প্রার্থী ফরিদুর রহমান ইরান অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
২৮ নম্বর ওয়ার্ডে শিবলী সাদিক, ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে হাজী ওমর ফারুক ও নূরুল ইসলাম রতন গ্রুপের মধ্যে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি হামলা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় লোকজনও। এ ছাড়া ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে রুস্তম আলী, ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে বজলুর রহমান, ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে সাদেক খান ও ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডে শেখ আমীর হোসেনও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের গোড়ানে ২ নম্বর ওয়ার্ডে রফিক আলী ভূঁইয়া, ৪ নম্বর ওয়ার্ডে সুন্দর আলী ও রহমত আলী, উত্তর মুগদার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামীলীগ সমর্থক এনামুল হক, ৮ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামীলীগ সমর্থক সুলতান ও আহকাম উল্লাহ, ১০ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামীলীগ সমর্থক জাহিদুল ইসলাম টিপু, শাজাহানপুরে ১১ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামীলীগ সমর্থক আব্দুল লতিফ ও কামরুজ্জামান এলাকায় আধিপত্য নিয়ে বিরোধের মধ্যে রয়েছেন।
২৫ নম্বর ওয়ার্ডে হাজী দেলোয়ার হোসেন ও হাজী আলতাফ হোসেন, ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে মোহাম্মদ হোসেন বচন, ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে কামাল উদ্দিন কাবুল ও হাফেজ হারুনুর রশিদ, ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে আব্দুল মজিদ বাবুল ও জাহাঙ্গীর আলম, ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে ইলিয়াস রশিদ, মোহন ও আমিনুল হক বিপ্লব অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে আব্দুল জব্বার, জামাল উদ্দিন, আকবর বাবলা ও রঞ্জন বিশ্বাসের মধ্যে এখনই নির্বাচনী প্রচার নিয়ে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে।
৩৮ নম্বর ওয়ার্ডে খন্দকার মইনুর রহমান জুয়েল, ৪০ নম্বর ওয়ার্ডে আসাদ উল্লাহ, ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে শেখ নূর মোহাম্মদ, ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডে নাজিম উদ্দিন বাবু এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধে জড়িয়েছেন। আর এ কারণে তারা বিপদে পড়তে পারেন বলেও জানায় সূত্র।
জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের এখনও কোন শিডিউল ঘোষণা হয়নি। তবে নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দেয়ার পর প্রার্থীদের নিরাপত্তার ব্যাপারে জোর দেয়া হবে। স্থানীয় সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান চলছে।’

