ঢাকাWednesday , 28 May 2025
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিদ্যুতায়ন বোর্ড-পল্লী বিদ্যুতের দ্বন্দ্ব নিরসন কবে?

Link Copied!

বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) দ্বন্দ্ব যেন বেড়েই চলেছে। অভিন্ন চাকরিবিধি বাস্তবায়ন, হয়রানি বন্ধ ও মামলা প্রত্যাহারসহ সাত দফা দাবিতে সারাদেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রায় ৪৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী বিদ্যুৎসেবা চালু রেখে সারাদেশে কর্মবিরতি পালন করছেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে টানা সপ্তম দিনের মতো অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন পল্লী বিদ্যুতের কয়েক হাজার কর্মী। এ অবস্থায় বিদ্যুতায়ন বোর্ড ও পল্লী বিদ্যুতের চলমান দ্বন্দ্বের অবসান কোথায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে সামনে এসেছে। এর আগে আরইবি ও পবিস একীভূত করে অভিন্ন সার্ভিস কোড বাস্তবায়ন এবং অনিয়মিতদের নিয়মিতকরণসহ দুই দফা দাবিতে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে আন্দোলনে নামেন। আন্দোলনরত পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মীরা বলছেন, প্রথমে দুই দফা দাবিতে আন্দোলন করলেও তাদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে। এতে ধীরে ধীরে তাদের দাবি দুই দফা থেকে সাত দফায় রূপ নিয়েছে। তারা এখন সাত দফা দাবিতে অনড়।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আন্দোলনকারীরা বলছেন, মাঠ পর্যায়ে তারা কাজ করতে গিয়ে নানান ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন। মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণসহ যাবতীয় কাজ পল্লী বিদ্যুতের কর্মীদের করতে হয়।
অন্যদিকে, আরইবি কর্মকর্তারা শুধু অফিসে বসে আদেশ করেন। তারা পল্লী বিদ্যুতের ওপর খবরদারি করেন। তাদের অভিযোগ, পল্লী বিদ্যুতের যাবতীয় সরঞ্জাম আরইবি কেনাকাটা করে। এতে অনেক সময় দুর্নীতির প্রশ্রয়ে নিম্নমানের জিনিসপত্র সরবরাহ করায় জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয় পল্লী বিদ্যুতে দায়িত্বরতদের। অথচ নিম্নমানের জিনিসপত্র কেনার ক্ষেত্রে তাদের কোনো হাত থাকার সুযোগ নেই।
যে ৭ দাবিতে আন্দোলন
১. পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মীদের ফ্যাসিবাদী কায়দায় দমন-পীড়নের মাধ্যমে কর্মপরিবেশ অস্থিতিশীলকারী, অত্যাচারী আরইবি চেয়ারম্যানের অপসারণ; ২. এক ও অভিন্ন চাকরিবিধি বাস্তবায়নের মাধ্যমে আরইবি-পবিস একীভূতকরণ অথবা দেশের অন্য বিতরণ সংস্থার মতো পুনর্গঠন; ৩. মিটার রিডার কাম মেসেঞ্জার, লাইন শ্রমিক এবং পোষ্য কর্মীদের চাকরি নিয়মিতকরণ; ৪. মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারপূর্বক চাকরিচ্যুতদের স্বপদে পুনর্বহাল; ৫. গ্রাহক সেবার স্বার্থে লাইনক্রুসহ সব হয়রানি ও শাস্তিমূলক বদলি আদেশ বাতিল এবং বরখাস্ত ও সংযুক্ত কর্মীদের অবিলম্বে পদায়ন; ৬. জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা/শিফটিং ডিউটি বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত জনবলের ঘাটতি পূরণ করা ও ৭. পূর্ণাঙ্গ সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন বোর্ড গঠন করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যক্রম পরিচালিত করা।
চার হাজার কর্মীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা!
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন (বাপবিএ) জানিয়েছে, আরইবি বিনা নোটিশে ২৯ জনকে চাকরিচ্যুত করেছে। পাশাপাশি মামলা, রিমান্ড, গ্রেফতার, বরখাস্ত, দূরবর্তী স্থানে বদলির শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। এরমধ্যে হয়রানিমূলক বদলির শিকার চার হাজার ১১৮ জন।
তাদের মধ্যে লাইনক্রু প্রায় ৬৭৩ জন, জুনিয়র প্রকৌশলী ৫৮৯ জন, ইনফোর্সমেন্ট কো-অর্ডিনেটর (ইসি) ২৯০ জন, পাওয়ার ইউজ কো-অর্ডিনেটর (পিউসি) ১২১ জন, বিলিং সুপারভাইজার ৩০৮ জন, সহকারী মহাব্যবস্থাপক ৫৮০ জন, উপমহাব্যবস্থাপক ১৭৯ জন, সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক ৩৬ জন ও অন্যান্য ৯০৭ জন। সবশেষ ৪৩৫ জন লাইন টেকনিশিয়ানকে বদলি করা হয়।
আন্দোলনকারীদের নামে একাধিক মামলা
গত বছরের ১৭ অক্টোবর বিদ্যুৎখাত অস্থিতিশীল করার অভিযোগে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ১০ কর্মকর্তাকে আসামি করে ঢাকার খিলক্ষেত থানায় মামলা করা হয়। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের পরিচালক (প্রশাসন) মো. আরশাদ হোসেন বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কিছু বিপথগামী কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে বিদ্যুৎ খাত অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছেন। গত সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালীদের মদতে বিদ্যুৎ কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।
এর দুদিন পর ১৯ অক্টোবর বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রেখে গ্রাহক ভোগান্তি তৈরির পাশাপাশি রাষ্ট্রবিরোধী আচরণ ও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর ১৫৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলায় ১৫০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়।
লক্ষ্মীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন আলী হাসান মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে তিনি চাকরিচ্যুত হন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে চলা কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন তিনি।
কথা হলে আলী হাসান বলেন, ‘আমাকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আমি ৫৬ দিন জেলে ছিলাম। এখন পরিবার নিয়ে কষ্টে আছি। আমরা তো অন্যায় কোনো দাবি করিনি। আমাদের দাবি সম্পূর্ণ যৌক্তিক। আমি না, আমার মতো অনেকেই চাকরিচ্যুত হয়েছেন। হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বেআইনিভাবে বদলি করা হয়েছে। আরইবি আমাদের ওপর শোষণ করছে, আমরা এই শোষণের বিরুদ্ধেই আন্দোলনে নেমেছি।’
জানতে চাইলে পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রকৌশলী তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আমাদের দাবি আদায়ে অনড়। আজ (২৭ মে) সারাদেশে কর্মবিরতি চলছে। এখন পর্যন্ত সরকারের কেউ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। আমরা চাচ্ছি শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি শেষ করতে। আমরা প্রধান উপদেষ্টা এবং বিদ্যুৎ উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
কমিটির প্রতিবেদনের অপেক্ষা
আন্দোলনকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটি কয়েক দফা বৈঠক করেও কোনো সমাধানে আসতে পারেনি।
এরপর গত বছরের ২৩ অক্টোবর বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ ফারহাত আনোয়ারের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি করে বিদ্যুৎ বিভাগ। এই কমিটি বিদ্যমান পল্লী বিদ্যুৎ কাঠামো পর্যালোচনা করে সুপারিশমালা তৈরি করে একটি প্রতিবেদন সরকারের কাছে দেওয়ার কথা রয়েছে। অভিন্ন সার্ভিস কোড বাস্তবায়ন করে আরইবি ও পবিস একীভূত করতে হবে মর্মে একটি চিঠি গত ২৭ মার্চ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠানো হয়। তবে এ সিদ্ধান্তে আপত্তি জানায় বিদ্যুৎ বিভাগ।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে গত বছরের ১৯ অক্টোবর পাঁচ সদস্যের একটি নাগরিক কমিটি গঠন করেছিল কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সেই কমিটির সদস্যদের মধ্যে একজন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শরমিন্দ নীলোর্মি।
জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা কমিটির সুপারিশ জ্বালানি উপদেষ্টার কাছে দিয়েছি। সব পক্ষকে একসঙ্গে বসে সমাধানে আসতে হবে। আরইবির লোকসান আছে, তাদের বেতন স্কেলও ভিন্ন। আরইবি এবং পবিসের মধ্যে যে ধরনের দাম্ভিকতা রয়েছে সেগুলার সমাধান উনারা (পবিস) একীভূত হওয়ার মাধ্যমে খুঁজছেন।’
শরমিন্দ নীলোর্মি আরও বলেন, ‘কন্ট্রোলিং অথোরিটি হিসেবে আরইবি কাজ করে। মাঠ পর্যায়ের অনেক ধরনের ঝামেলা পবিসকে মোকাবিলা করতে হয়। অনেক সময় সেন্ট্রালে বসে আরইবি সেটা না-ই বুঝতে পারে। তবে বোঝার চেষ্টা নিশ্চয়ই করে। এজন্য আমরা অনেকগুলো বিষয় বিবেচনায় নিয়ে একীভূত করার সুপারিশ করেছিলাম। এখন বাস্তবায়নযোগ্যতা সরকারের হাতে। সেখানে আমাদের করণীয় কিছুই নেই।’
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভোক্তা অভিযোগ নিষ্পত্তি জাতীয় কমিটির সভাপতি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, ‘আনইউজ্যুয়াল পথে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান হলে তাতে কোনো কল্যাণ আসে না। সরকারকে ইউজ্যুয়াল পথে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে। এ যাবৎ কালে এই আন্দোলন মোকাবিলায় সরকার কখনো আইনি পথ অবলম্বন করেনি। আইনি পথে এসব সমস্যার সমাধান হলে তা টেকসই হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের হাতে সার্বভৌম ক্ষমতা। সরকারকে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সেটা কার পক্ষে বা বিপক্ষে যাবে, তা বিবেচনা করার কোনো কারণ নেই। সবার আগে জনস্বার্থ। তাই আইনি প্রক্রিয়ায় ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।’
আরইবি এবং পবিসের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্ব নিরসনে সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে, এ বিষয়ে জানতে সোমবার রাতে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা হয় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সঙ্গে।
তিনি বলেন, ‘পল্লী বিদ্যুতের কাঠামো কী হবে তা জানতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে দিয়ে একটি কমিটি করেছি। ঈদের পর প্রতিবেদন হাতে পাবো। তারপর আমরা সিদ্ধান্ত নেবো।’
উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘ওদের (পল্লী বিদ্যুতের কর্মী) আরেকটি দাবি ছিল আরইবির তুলনায় পদমর্যাদার বিষয়টি। এটি নিয়েও একটি কমিটি কাজ করছে। আমরা আরইবি চেয়ারম্যানকে বলেছি, কিছু লোককে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে অপরাধের মাত্রা দেখে বিষয়গুলো বিবেচনা করতে।’
লাগাতার কর্মবিরতিতে গ্রাহদের ভোগান্তি বাড়তে পারে। ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘তারা যদি কর্মবিরতি শুরু করে, আমরা বিদ্যুৎ সচল রাখার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেবো। এটির জন্য আমরা মোটেও উদ্বিগ্ন নই।’