ঢাকাSunday , 20 April 2025
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিশেষজ্ঞদের মতে এটি আর্থিক অনিয়ম
পাউবো কর্মকর্তাদের সুইডেন সফর ঘিরে বিতর্ক

Link Copied!

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) নিষ্কাশন প্রকল্পের সফরকে ঘিরে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে প্রকল্পের কাজ ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয়ে যাওয়ার প্রায় ১০ মাস পর প্রশিক্ষণের নামে কোন টিম বিদেশ সফরে যেতে পারে কিনা? বিশেজ্ঞরা এ ধরনের সফরকে শ্রেফ অর্থের অপচয় এবং আর্থিক অনিয়ম বলে মনে করছেন। তাদের মতে, এমন একটি সফরের জিও কিভাবে জারি করা হলো এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক একেএম তাহমিদুল ইসলাম কিভাবে এমন একটি সফরের প্রস্তাব পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠালেন।
প্রশিক্ষণের নামে চলতি মাসেই এমন একটি প্রতিনিধি দল এক সপ্তাহের জন্য সুইডেন যাচ্ছেন। এখানে ট্রেনিংয়ের নামে যাদের পাঠানো হচ্ছে-তাদের নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এই ট্রেনিং যেখানে পাম্প ও মেকানিক্যাল যন্ত্রপাতির চালনা ও পরিচালনা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্ধারিত; সেখানে প্রশিক্ষণের নামে ৫ সদস্যের টিমে যারা যাচ্ছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন-পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হাবিবুর রহমান, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আরেক যুগ্ম সচিব রবিউল আলম, ওয়াটার রিসোর্স এন্ড রোরাল ইনিস্টিটিউশন ডিভিশন প্লানিং কমিশনের উপ সচিব এস এম শফিকুল ইসলাম, পাউবোর কেন্দ্রীয় অঞ্চল ঢাকার প্রধান প্রকৌশলী রাফিউস সাজ্জাদ ও প্রকল্প পরিচালক কোহিনূর আলম। এই ৫ সদস্যের টিমে একজনও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার নেই। অথচ ট্রেনিংটি পাম্প ও মেকানিক্যাল যন্ত্রপাতির চালনা ও পরিচালনা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্ধারিত। কিন্ত যাচ্ছেন-মন্ত্রণালয়ের ৩ জন নন টেকনিক্যাল কর্মকর্তা এবং ২ জন্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। বিশেষজ্ঞরা ট্রেনিংয়ের নামে এটি ‘প্লেজার সফর’ এবং ‘সরকারি অর্থের অপচয়’ হিসাবেই দেখছেন। এদিকে, ২০২৪ সালের জুনে একটি প্রকল্পের কাজ শেষ করে তা পাউবোকে বুঝিয়ে দেওয়ার ১০ মাস পর কিভাবে ট্রেনিং প্রোগ্রামের নামে সুইডেন সফর আদৌ বিধিসম্মত হচ্ছে কিনা? এমন প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। খোদ পাউবো মহাপরিচালক একেএম তাহমিদুল ইসলামের কাছে বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে তিনি তা এড়িয়ে যান। অথচ তার মাধ্যমেই এমন প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, প্রকল্পটির ডিসিআর জমা দেওয়ার পর ঠিকাদার কিভাবে এই সফরের ব্যয়ভার সমন্বয় করবেন-তা নিয়েও। সূত্র জানায়, প্রকল্প পরিচালক কোহিনুর আলম বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি ছিলেন ফ্যাসিস্ট পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর বিশ্বস্ত সহোচর। যে কারণে ফ্যাসিস্টের পুরো সময় জুড়েই তিনি ব্যাপক সুযোগ সুবিধার মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক বনে গেছেন। অভিযোগ রয়েছে, পাউবোতে ফ্যাসিস্ট কর্মকর্তাদের সযত্নে আগলে রেখেছেন বর্তমান মহাপরিচালক একেএম তাহমিদুল ইসলাম। এদিকে রাষ্ট্রীয় খরচ কমাতে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে এবং সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় অধিকতর স্বচ্ছতার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করে আসছে অন্তর্বর্তী সরকার। অবশ্য নিরুৎসাহিত করা সরকারি পরিপত্র প্রতিপালনের উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত দেখাতে পারছেন না সরকারি কর্মকর্তারা। ছলে বলে কৌশলে এবং প্রশিক্ষণের নামে সরকারি আদেশ (জিও) বাগিয়ে বিদেশ সফর বিলাস অব্যাহত রেখেছেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনন্থ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা। অতীতে ভিসা নিশ্চিতে পরিবারের সদস্যরাও জিওতে অন্তর্ভূক্ত হয়েছেন এমন নজিরও রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডে। এসব বিষয়কে ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ বা স্বার্থের সংঘাত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
২০২২ সালে প্রথমবার এবং সবশেষ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার এক মাস আগেও সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ সীমিত করতে পরিপত্র জারি করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের বাজেট অনুবিভাগ। ২০২৪ সালের ৪ জুলাই জারিকৃত ওই পরিপত্রে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান; মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, দপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, পাবলিক সেক্টর করপোরেশন এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের কয়েকটি খাতে টাকা খরচে মিতব্যয়ী হওয়ার সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ কমানোর সিদ্ধান্ত।
গত ৯ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে বিদেশ ভ্রমণসংক্রান্ত এক পরিপত্রে সাধারণভাবে বিদেশ ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করা হয়। মন্ত্রণালয়ের সচিব ও অধীনস্থ অধিদপ্তর বা সংস্থা প্রধানদের একান্ত অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থ ছাড়া বিদেশ ভ্রমণে বিরত থাকতে বলা হয়। পাশাপাশি কেনাকাটা বা ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপ্ট্যান্স টেস্টের (এফএটি) ক্ষেত্রে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেজ্ঞদের প্রেরণের বিবেচনা, সরকারি অর্থে কম প্রয়োজনীয় ভ্রমণ অবশ্যই পরিহার করা, দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা ছুটি পরিহার এবং বিদেশ ভ্রমণে প্রস্তাবিত কর্মকর্তার পূর্ববর্তী এক বছরের বিদেশ ভ্রমণ বৃত্তান্ত আবেদনের সাথে সংযুক্ত করতে বলা হয়েছে।
এরপর গত ২৩ মার্চ সরকারি কর্মকর্তাদের ঠিকাদার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। পাশাপাশি জরুরি কারণ ছাড়া উপদেষ্টা বা সিনিয়র সচিব ও সচিবদের একান্ত সচিব বা সহকারী একান্ত সচিবদের সহযাত্রী হিসেবে বিদেশে ভ্রমণ এবং সরকারিভাবে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের স্বামী/স্ত্রী বা সন্তানদের সফরসঙ্গী হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করার নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়।
ঠিকাদারের অর্থে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরকে ‘স্বার্থের সংঘাত’ হিসেবে দেখছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে ত্রিমাত্রিক অনিয়মের আশঙ্কা করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ঠিকাদারের অর্থে বিদেশ ভ্রমণে সরাসরি স্বার্থের সংঘাত হয়। দ্বিতীয়ত, সফরকে বৈধতা দিতে চুক্তির মধ্যে বিদেশ সফরের বিষয় রাখা শুভংকরের ফাঁকি, যেটা তারা আমলে নিচ্ছে না। বুঝতে হবে যে, প্রতিষ্ঠানগুলো চ্যারিটি করছে না বা লাভের অংশ থেকে সফর ব্যয় দিচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের ভ্রমণের পেছনে ব্যয় করা অর্থ আমাদের কাছ থেকেই মুনাফা হিসেবে আদায় করে নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। ক্রয় প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা (ঠিকাদারদের সাথে) পরস্পর যোগসাজশে চুক্তিতে এসব শর্ত দেয়। এতে প্রকল্পের টাকা যেমন লুটপাট হয় তেমনি বিদেশ সফর বাবদ কর্মকর্তাদের আয় হয়। তৃতীয়ত, সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে সরকারি অর্থে বিদেশ সফর হচ্ছে। সরকার বলছে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এ ধরনের বিদেশ সফর অগ্রহণযোগ্য।
টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, কর্তৃত্ববাদের সময়ে আমলারা যা চেয়েছে সেটাই প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিল। এখন সেই অবস্থার পরিবর্তন হবে বলে দেশবাসী আশা করে। সরকার এ বিষয়ে উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু একদিকে আমলারা সরকারি নির্দেশনা অমান্য করছেন, আরেক দিকে সরকারের জন্য বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি করছেন। তিনি ট্রেনিংয়ের নামে পাউবোর এমন আর্থিক ব্যয়কে অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেন।