রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মাহবুবুর রহমান। তিনি তার চাকরিস্থলে বসেই হৃদযন্ত্রের রক্তনালীতে স্টেন্ট (রিং) বসানোর রমরমা ব্যবসার ফাঁদিয়ে বসেছেন। ওই সরকারি হাসপাতালে মান ভেদে রিংয়ের মূল্য রয়েছে ৭৫ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা জানিয়েছে হৃদরোগ বিভাগ। অথচ সেখানে রোগিদের কাছ থেকে তিনি তিন থেকে চার গুণ রিংয়ের দাম হাকিয়ে ফয়দা লুটছেন। এথেকে তার সহকর্মীর স্বজনেরাও বাদ যাচ্ছেননা। এনিয়ে ভ‚ক্তভোগিরা তো বটেই সেখানকার সার্জারী বিভাগের ডা. শাহীন শাহ্ তিনি তার সহকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছেন। এসব অপকর্মের জন্য হৃদরোগ বিভাগের প্রধানকেও দুষছেন অনেক সহকর্মী। এঘটনায় রমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. আশিকুর রহমান তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। তদন্ত কমিটিকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এর আগে হৃদরোগ বিভাগের প্রধান ওই ঘটনার অনিয়মের ব্যাখ্যা চেয়ে ডা. মাহবুবকে তলব করেছিলেন। রমেক হাসপাতালেরে প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহযোগি অধ্যাপক ডা. শাহীন শাহ্ ও ভূক্তভোগি স্বজনদের অভিযোগ, হৃদরোগ ও মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মাহবুবুর রহমান হাসপাতালের ক্যাথল্যাবে বসেই দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগিদের চিকিৎসার নামে রিং বাণিজ্য করে থাকেন। এই রিং বাণিজ্য থেকেও তার খালু আফজাল হোসেন (৩৫) রক্ষা পায়নি। গত বছর ৭ নভেম্বর তার খালুর এনজিওগ্রাম করতে গিয়ে রক্তনালী ফুটো হয়ে মারা যান। মৃত্যুর পর রেজিস্ট্রি খাতায় ওঠানো তার খালুর নাম কেটে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। অথচ ডা. মাহবুবুর রহমান তার খালুর হৃদযন্ত্রে রিং বসাতে প্ররোচিত করেছিলেন। আফজাল হোসেনের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার আব্দুল্লাহপুরে। ওই চিকিৎসক ডা. মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসায় তার খালু ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুতে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তুলে রমেক হাসপাতাল পরিচালককের কাছে অভিযোগপত্র দিয়েছেন। রমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. হাসানুল ইসলাম জানিয়েছেন, গত বছর নভেম্বর মাস থেকে এখন পর্যন্ত হৃদযন্ত্রের ভুল চিকিৎসায় ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গাইবান্ধার সাঘাটা বোনারপাড়া এলাকার বাসিন্দা লাল মিয়া (৫০) ও আফজাল হোসেন (৩৫) রয়েছেন। সহকর্মীদের অভিযোগ, ডা. মাহবুব তিনি তার কর্মস্থলে বসেই হৃদযন্ত্রে রিং বসানোর রমরমা বাণিজ্য ফেদেছেন। হাসপাতালের মূল্যের চেয়ে তিন থেকে চার গুণ দামে রিং বিক্রি করছেন। প্রতারণার শিকার আতোয়ার হোসেন ও মশিউর রহমান নামে দুজন ভুক্তভোগী ডা মাহাবুবুরের অনিয়ম অভিযোগের কপি দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি,) রমেক হাসপাতালের পরিচালক, রংপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে সরাসরি ও ডাকযোগে পাঠিয়েছেন। গাইবান্ধা সদরের কুমারপাড়া গ্রামের আতোয়ার হোসেন (৪৫) তার লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, ওই অভিযুক্ত চিকিৎসক প্রতারণার মাধ্যমে আমার হৃদযন্ত্রের রক্তনালীতে একটি স্টেন্ট (রিং) পড়িয়ে তিনটির টাকা আদায় করেছেন। তিনি রিং পড়ানোর যে সিডি দিয়েছেন তাতেও তার কোনো নজির নেই । তবে হাসপাতালের রেজিস্ট্রার খাতায় একটা রিং পড়ানোর রেকর্ড রয়েছে। কিন্তু তিনি আমার কাছ থেকে সুদে আসলে তিন লাখ ২০ হাজার টাকা বুঝে নিয়েছেন। গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডা. মাহাবুবুর রহমানের অধীনে ভর্তি হন তিনি। অভিযুক্ত চিকিৎসক তাকে জানিয়েছেন, এনজিওগ্রামে ধরা পড়া হৃদযন্ত্রের রক্তনালীতে তিনটি ব্লক আছে জানিয়ে তিনি ভূক্তভোগির কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করেন। উপায়ান্ত না দেখে তিনি তার ৯ শতক জমি বিক্রি করে তিন লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে হৃদযন্ত্রে রিং পড়িয়ে নেন। রিং পড়ানোর পর শারিরীক অবস্থার উন্নতি না হলে কয়েকদফা তিনি রমেক হাসপাতালে ভর্তি হন ডা. মাহাবুবুবের অধীনে। এরপরও শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিলে আতোয়ার এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারী আরেক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. হাসানুল ইসলামের অধীনে রংপুর মেডিকেলে ভর্তি হয়ে সুস্থ হয়ে বাসা ফেরেন। এ সেসময় তিনি জানতে পারেন হৃদযন্ত্রের রক্তনালীতে একটি রিং পড়ানো হয়েছিলো। আরেক ভুক্তভোগী রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা মোহা. মশিউর রহমান তার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, পেটে ব্যথা হলে তার মাকে তিনি রংপুর নগরীর ধাপ এলাকায় অবস্থিত কছির উদ্দিন মেডিকেলে ৫ সেপ্টেম্বর ডা. জিয়াউর রহমানের কাছে দেখাতে যান। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পিত্তথলির অপারেশন করাতে হবে বলে জানান চিকিৎসক। অস্ত্রোপচারের আগে একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পরামর্শ নিতে যান। ১১ সেপ্টেম্বর তার মাকে নিয়ে ডা. মাহাবুবুর রহমানের চেম্বার সেন্ট্রাল হাসপাতালে দেখালে তিনি এনজিওগ্রাম করাতে বলেন। সেই মোতাবেক ১৮ সেপ্টেম্বর ডা. মাহাবুবুর রহমান রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এনজিওগ্রাম করেন এবং বলেন যে তার মায়ের হৃদযন্ত্রের রক্তনালীতে ৭৫ শতাংশ ব্লক আছে, তা এক লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়ে স্টেন্ট (রিং) পড়াতে হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এনিয়ে সন্দেহ হলে ঢাকা ন্যাশন্যাল হার্ট ফাউন্ডেশনের অধ্যাপক ডা. বদিউজ্জামানকে এ বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর এনজিওগ্রামের সিডি (রেজি নং ১২৫২২/৩২) দেখালে তিনি বলেন, যে তার মায়ের হৃদযন্ত্রে কোনো প্রকার ব্লক নেই। এরপর রংপুরে এসে ১৫ অক্টোবর রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. হাসানুল ইসলামকে দেখালে তিনিও একই কথা বলেন। তবে তিনি সামান্য কিছু ওষুধ খেতে পরামর্শ দেন। এক পর্যায়ে ওষুধ সেবনে তার মা সুস্থ হয়ে ওঠেন। পরে ৭ নভেম্বর ডা. মোহা. মিজানুর রহমানের অধীনে পিত্তথলির অস্ত্রোপচার করানো হয়েছিলো । এদিকে, ডা. মো. মাহাবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে দুজন ভুক্তভোগী রোগী দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও রমেক হাসপাতাল পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক দপ্তরে রিং বাণিজ্যসহ প্রতারণার লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। দুদক রংপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শিগগিরই কমিশনের সভায় অভিযোগ তুলে ধরা হবে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিনিয়তই রিং বাণিজ্য করে যাচ্ছেন ডা. মাহাবুবুর রহমান। তিনি এজন্য বিজ্ঞাপনও দেন তার ভিজিটিং কার্ড ও ফাইল ফোল্ডারে। যেখানে লেখা রয়েছে ‘সুখবর সুখবর সুখবর! আর নয় ঢাকা, আর নয় ইন্ডিয়া। এখন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই অতি অল্প খরচে হার্টের এনজিওগ্রাম, হার্টের রক্তনালীতে স্টেন্ট (রিং) বসানো (এনজিওপ্লাস্টি ও স্টেন্টিং) মাইট্রাল ভালভুলোপ্লাস্টি ও হার্টের পেসমেকার স্থাপন করছেন ডা. মো. মাহাবুবুর রহমান।’ রিং বিক্রি বাড়াতে এভাবেই নিজের বিজ্ঞাপন দেন ডা. মাহাবুবুর, যা বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন ২০১০ অনুযায়ী অপরাধ। ডা. মাহাবুবুর রহমান তার ভিজিটিং কার্ডে ও নিজস্ব ওয়েবসাইটে বিএমডিসির এমডি (কার্ডিওলজি), এফএসিসি (আমেরিকা) এ ধরনের ভুয়া ডিগ্রি লিখে প্রলুব্ধ করেন রোগীদের। বিএমডিসির অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের প্রচারণা অনুচিত। কারণ বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন ২০১০ এর ধারা ২৯ (১) বলা হয়েছে ‘এই আইনের অধীনে কোনো মেডিকেল চিকিৎসক বা ডেন্টাল চিকিৎসক এমন কোনো নাম, পদবি, বিবরণ বা প্রতীক এমনভাবে ব্যবহার বা প্রকাশ করিবেন না যার ফলে তার কোনো অতিরিক্ত পেশাগত যোগ্যতা আছে মর্মে কেউ মনে করেন, যদি না তা কোনো স্বীকৃত মেডিকেল চিকিৎসা শিক্ষা যোগ্যতা বা স্বীকৃত ডেন্টাল চিকিৎসা শিক্ষা যোগ্যতা হয়ে থাকে।’ এই ধারা ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাণ্ডের বিধান রয়েছে। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মো. মাহাবুবুর রহমান। তুনি বলেন,তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। তবে তিনি তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি স্বীকার করেন। তার স্বপক্ষের সকল কাগজপত্র তদন্ত কমিটিতে পাঠিয়ে দিয়েছেন বলেও জানান তিনি। হাসপাতাল সূত্র জানায়, হৃদরোগ বিভাগের প্রধান ডা. হরিপদ রায়কে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্য সদস্যরা হলেন, সদস্য সচিব রমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আম ম আখতারুজ্জামান ও সদস্য ডা. একেএম শাহেদুজ্জামান। রমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. আশিকুর রহমান হৃদরোগ বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মো. মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন ১০ কর্মদিবসের মধ্যে দিতে বলা হয়েছে। প্রসঙ্গত, রমেক হাসপাতালের কার্ডিওলজি (হৃদরোগ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১১-১২ অর্থবছরে হাসপাতালে কার্ডিওলজি বিভাগে প্রথমবার ক্যাথল্যাব চালু হয়েছিলো। সে সময় দেড় শতাধিক এনজিওগ্রাম, রিং বসানো এবং পেসমেকার স্থাপন করেছেন চিকিৎসকরা। তবে কোভিডের কারণে তিন বছর এবং মেশিন নষ্টসহ বিভিন্ন কারণে মোট ছয় বছর ক্যাথল্যাবের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। চলতি বছরের শুরুতে নতুন করে সেটি চালু করা হয়।

