ঢাকাSaturday , 23 November 2024
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কবে স্বস্তি পাবে নিম্ন আয়ের মানুষ

তালুকদার রুমী
November 23, 2024 10:40 pm
Link Copied!

ছাত্র-জনতার যে অভিস্মরণীয় আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তাতে নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। জুলাই-আগস্টের এই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের এক উল্ল্যেখযোগ্য অংশ শ্রমজীবী ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সদস্য। কাজেই এই অভ্যুত্থানের মধ্যে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের বিশেষ দায়িত্ব হলো, শ্রমজীবী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিরুদ্ধে চলমান অর্থনৈতিক বৈষম্য ও নিপীড়নের অবসান ঘটানো। তাঁদের জীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তি আনার চেষ্টা করা। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব পালনের ১০০ দিনের বেশি সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষের জীবনে স্বস্তি ফেরানোর কার্যকর কোন উদ্যোগ দেখা যায়নি। অন্তর্বতী সরকার শ্রম খাত সংস্কার কমিশন গঠন, পোশাক খাতে ন্যূনতম মজুরি পুনর্বিবেচনা ও শ্রম আইন সংশোধনের মতো ইতিবাচক কতকগুলো উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি সরকার এমন কিছু তৎপরতা চালিয়েছে, যেগুলোর মধ্যে অভিজাত শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন মোকাবিলা, হকার উচ্ছেদ ও ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকারের আচরণকে ঠিক শ্রমজীবী ও নিম্ন বিত্তবান্ধব বলা যাবে না। সেই সঙ্গে রয়েছে নিত্যপণ্যের উর্ধ্বমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা। পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনকালে নিপীড়ক রাষ্ট্রযন্ত্র ও পোশাক কারখানার মালিকদের শোষণ ও নিপীড়নে বঞ্চিত পোশাকশ্রমিকেরা যখন তাদের বঞ্চনা নিরসনের দাবিতে রাস্তায় নেমে এলেন, তখন এই আন্দোলনকে আওয়ামী লীগ ও বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে দমন করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু যে সব মালিকরা শ্রমিকদের মাসের পর মাস বেতন দিচ্ছে না, অথচ তারা নিজেরা বিলাসবহুল গাড়ি হাঁকাচ্ছে, বিলাসী জীবন যাপন করছে তাদের ব্যাপারে সরকারকে কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। শ্রমিকদের দাবিগুলো ছিল সুনির্দিষ্ট কিছু অধিকারকে কেন্দ্র করে, যেগুলোকে অযৌক্তিক বলার কোনো সুযোগ নেই। এসব দাবির মধ্যে ছিল বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ৫ শতাংশ থেকে বাড়ানো, প্রভিডেন্ট ফান্ড চালু, ১৫ দিন পিতৃত্বকালীন ছুটি, টিফিন বিল ৩৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ টাকা, হাজিরা বোনাস বৃদ্ধি, মাতৃত্বকালীন ছুটি বাড়িয়ে ৬ মাস করা, মোট বেতনের সমান ঈদ বোনাস দেওয়া, ছুটি বৃদ্ধি করা এবং মাস শেষে ৫ কর্মদিবসের মধ্যে মজুরি প্রদান ইত্যাদি। দমন-পীড়ন করে পোশাকশ্রমিকদের এসব যৌক্তিক দাবি আদায়ের আন্দোলন মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হওয়ার পর অবশেষে গত ২৪ সেপ্টেম্বর পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার ও মালিকপক্ষ ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে শ্রমিকদের ১৮ দফা দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। এর মধ্য দিয়ে পোশাক খাতের পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত হয়ে আসে। এটা প্রমাণ করে যেকোনো ষড়যন্ত্র বা উসকানি নয়, অধিকারের দাবিতেই শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমেছিলেন। ১৮ দফার ত্রিপক্ষীয় চুক্তি অনুসারে ১০ অক্টোবরের মধ্যে সব বকেয়া পরিশোধ করার কথা থাকলেও দেখা গেল, কোনো কোনো পোশাক কারখানার মালিক ওই সময়ের মধ্যে শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধ করেননি। ফলে শ্রমিকদের আবার রাস্তায় নামতে হয়। দেখা গেল, অন্তর্বর্তী সরকার মালিকপক্ষকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বকেয়া পরিশোধে বাধ্য করতে পারছে না; বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলন থামানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এ রকম একটি পরিস্থিতিতেই মাসের পর মাস বেতন না পেয়ে নিরুপায় হয়ে বিক্ষোভে নামা জেনারেশন নেক্সট কারখানার শ্রমিকদের ওপর গত ২৩ অক্টোবর গুলি চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গুলিতে আহত হয়ে ২৫ বছর বয়সী পোশাকশ্রমিক চম্পা খাতুন ২৭ অক্টোবর মারা যান। এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বর ১৮ দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন করার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে নিহত হন ম্যাঙ্গোটেক্স কারখানার শ্রমিক কাউসার আহমেদ খান। ৩১ অক্টোবর কারখানা বন্ধের প্রতিবাদে মিরপুরের ক্রিয়েটিভ ডিজাইনার্স লিমিটেড কারখানার শ্রমিকদের বিক্ষোভের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে আহত হয় ঝুমা আক্তার ও আল আমিন হোসেন। অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন আন্দোলনকে ‘ষড়যন্ত্রের চশমা’ দিয়ে দেখার কারণে এবং গণমানুষের সংকটের সঙ্গে তাদের বিচ্ছিন্নতার কারণে এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো ঘটেছে। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই কোনো ধরনের পুনর্বাসন ছাড়াই কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট ও গুলিস্তান থেকে হকার উচ্ছেদ করা হয়েছে। যৌথ বাহিনীর অভিযানে ৪ নভেম্বর কারওয়ান বাজারের রাস্তার দুই পাশ ও ফুটপাত থেকে এবং ১২ নভেম্বর গুলিস্তান ও ফার্মগেটের ফুটপাত থেকে শত শত হকারকে উচ্ছেদ করা হয়। বৈষম্যমূলক অর্থনীতির থাবায় ক্ষতবিক্ষত গ্রামীণ কৃষি থেকে উচ্ছেদ হয়ে বা নদীভাঙনের শিকার হয়ে মানুষ শহরে এসে আর কোনো কর্মসংস্থান করতে না পেরে হকারি করে। ফুটপাতে বসার জন্য তাদের প্রতিদিন চাঁদা দিতে হয়, নানাভাবে পুলিশের হয়রানির শিকার হতে হয়। অন্তর্বর্তী সরকার তাদের লাইসেন্সের মাধ্যমে নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়মকানুন মেনে বৈধভাবে ব্যবসা করার ব্যবস্থা করতে পারত। প্রতিবেশী ভারত সরকার ঠিক এই কাজই করেছে দ্য স্ট্রিট ভেন্ডরস (প্রটেকশন অব লাইভলিহুড অ্যান্ড রেগুলেশন অব স্ট্রিট ভেন্ডিং) অ্যাক্ট-২০১৪ এর মাধ্যমে। এই আইনের মাধ্যমে হকারদের নগরের গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রদানকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং সেই সঙ্গে তাদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য টাউন ভেন্ডিং কমিটি নামের একটি অংশগ্রহণমূলক কমিটির বিধান রাখা হয়। এই কমিটির সদস্যদের অন্তত ৪০ শতাংশ হকার থাকতে হয়। এই কমিটির মাধ্যমে ফুটপাতের কোথায় কতক্ষণ হকার বসতে পারবে বা পারবে না, তা নির্ধারণ করা হয়। হকারদের লাইসেন্স দেওয়া এবং নিয়মকানুন মেনে চলতে বাধ্য করার কাজটিও এই কমিটির মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। পাইকারিভাবে হকার উচ্ছেদ না করে অন্তর্বর্তী সরকার হকারদের নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষা দেওয়ার জন্য এ রকম একটি উদ্যোগ নিতে পারত। বিগত সরকারের সময় ব্যাপক জিডিপি প্রবৃদ্ধির কথা বলা হলেও বাস্তবে দেশে আনুষ্ঠানিক খাতে মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। ফলে দেশের শ্রমজীবীদের ৮৫ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। এদের একটি উল্ল্যেখযোগ্য অংশ হলো ফুটপাতের হকার বা অটো রিকশাচালক। দেশে কর্মসংস্থানের সমস্যার সমাধান না করে এদের রাস্তা থেকে উচ্ছেদ করা ভীষণ অমানবিক আচরণ। হকার উচ্ছেদ ছাড়াও আরও একটি অমানবিক আচরণের দৃষ্টান্ত হলো ব্যাটারিচালিত রিকশা জব্দ করে নিলামে তুলে বেচে দেওয়া। ৭ নভেম্বর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অভিযানে ৭৮টি অটোরিকশা এবং ৩১৫টি ব্যাটারি নিলামের মাধ্যমে ১০ লাখ ৫ হাজার টাকায় এবং ১১ নভেম্বর ১০২টি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ৩৭৬টি ব্যাটারি ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। এভাবে যানজট নিয়ন্ত্রণের নামে দরিদ্র রিকশাচালকদের রিকশা জব্দ করে নিলামে বেচে দেওয়াটা কতটা ন্যায্য ও মানবিক আচরণ হলো? ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে রিকশা ও ব্যাটারি ক্রয়কারী রিকশাচালকের ঋণ পরিশোধ কীভাবে হবে আর তার সংসারই বা কীভাবে চলবে? ঢাকা শহরে যানজটের জন্য কি শুধু ব্যাটারি রিকশাই দায়ী? আইন ভঙ্গ করার দায়ে ব্যাটারি রিকশা যেভাবে নিলামে তোলা হলো, ঢাকার রাস্তায় যত্রযত্র যাত্রী উঠিয়ে যানজট সৃষ্টিকারী মেয়াদোত্তীর্ণ লক্কড়ঝক্কড় বাস কিংবা কোনো সামর্থবান ব্যক্তির প্রাইভেট কারের বেলায় কি একই আচরণ করা সম্ভব হতো? জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দেশের সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রত্যাশা হলো নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সাড়ে ৩ মাসপার হলেও নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে তেমন সফলতা দেখা যাচ্ছে না। সরকার বিভিন্ন নিত্যপণ্যের শুল্ক কমিয়ে আমদানি উৎসাহিত করে মূল্য কমানোর চেষ্টা করছে। এত বড়লোক ব্যবসায়ী আরও বেশি লাভবান হলেও নিম্ন বিত্ত সাধারণ মানুষ কোন উপকারই পাচ্ছে না। সরকারের এই কৌশল বাজার নিয়ন্ত্রণে কোন কাজে আসেনি। সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে সরকার আলু আমদানির শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করে এবং ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে। এরপর কিছু পরিমাণ আলু আমদানিও হয়, কিন্তু এর ফলে আলুর দাম কমেনি। গত দুই সপ্তাহে আলুর দাম কেজিতে ১৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে কেজিপ্রতি ৭৫ থেকে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আলুর দাম গত বছরও এ রকম বেড়েছিল, তবে সেটি ডিসেম্বরে। অর্থাৎ এ বছর বেশ আগেই আলুর দাম বাড়ল এবং ডিসেম্বর সেটা আরও বাড়তে পারে এমন আশঙ্কা রয়েছে।শুধু শুল্ক কমালেই যে আমদানি বাড়বে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যেমন গত এক বছরে প্রায় ৫০টি প্রতিষ্ঠানকে সাড়ে ৩৩ কোটি ডিম আমদানির অনুমতি দেওয়া হলেও মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান ১০ লাখ মুরগির ডিম আমদানি করেছে। শুল্ক কমানো হলেও নানা ধরনের অশুল্ক বাধার কারণে ব্যবসায়ীরা ডিম আমদানিতে উৎসাহবোধ করেন না।
কাজেই সুদের হার বাড়ানো বা শুল্ক কমানোর মতো পদক্ষেপ বাজার নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন বাজারে অদৃশ্য হাতের কারসাজি বন্ধ করা। চাহিদা ও সরবরাহের সঠিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করা, মজুতদারি প্রতিরোধ এবং কার্যকর রেশন-ব্যবস্থা চালু করা ইত্যাদি। এসব উদ্যোগ নেওয়া হলে দেশের সংখ্যা গরিষ্ঠশ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে কিছু স্বস্তি ফিরে আসতো, অন্তর্বর্তী সরকার যা এখনো করতে পারেনি।