ঢাকাSaturday , 21 September 2024
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বেপরোয়া কিশোর গ্যাং

এম আর সুমন
September 21, 2024 11:06 pm
Link Copied!

ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জমি দখল, নারীদের উত্ত্যক্ত করা—দেশের যেকোনো এলাকায় এখন এ ধরনের অপরাধ ঘটলে ‘কিশোর গ্যাং’-এর নাম আসছে। অথচ এক যুগ আগেও পাড়া-মহল্লাকেন্দ্রিক অপরাধের ঘটনায় নাম আসত কোনো না কোনো সন্ত্রাসী বাহিনীর। এখন সে জায়গা দখল করেছে কথিত কিশোর গ্যাং। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের নিয়ে গড়ে উঠছে অপরাধ সাম্রাজ্য । কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এখন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় খুন হয়েছেন দুই জন। এ সময় আহত হয়েছেন আরও ১০ জন। এলাকাবাসী জানায়, রায়ের বাজারের কিশোর গ্যাং লিডার ইমনের নেতৃত্বে দেড় শতাধিক গ্যাং সদস্য নাসির ও মুন্নাকে ধরে নিয়ে আসে এবং কুপিয়ে হত্যা করে। জানা গেছে গত পনেরো বছরে দেশের মহানগর ও জেলা শহরে এর উত্থান সাধারণ মানুষসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে ভাবিয়ে তুলে। পাড়া মহল্লার একশ্রেণীর রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় এরা হয়ে ওঠে ভয়ংকর। পুলিশ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছে মূলত কিছু রাজনৈতিক নেতার পৃষ্ঠপোষকতাই কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেয়ার জন্য দায়ী। মাদক বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, দখল এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্তৃত্ব তৈরির জন্য এলাকার শিশু কিশোরদের নিয়ে গ্যাং তৈরি করে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করেন ওই ধরনের নেতারা।
পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনী নানা উদ্যোগ নিলেও ‘কিশোর গ্যাং’ এর তৎপরতা দিন দিন বেড়েই চলেছে এবং বড় শহরগুলোর গণ্ডি ছড়িয়ে এ সমস্যা এখন বিস্তৃত হচ্ছে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও। এও শোনা যায় একাধিক কিশোর গ্যাং একে অন্যের সাথে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে। ঢাকার উত্তরায় ২০১৭ সালে স্কুল শিক্ষার্থী আদনান খুনের ঘটনায় প্রথমবারের মতো ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছিলো কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে তখন বেশ কয়েকজন কিশোরকে আটক করেছিলো র‍্যাব, যারা একই গ্রুপের সদস্য ছিল। সে সময় আলোচনায় এসেছিলো উত্তরা ডিসকো বয়েজ ও বিগ বস কিশোর গ্যাং নামের দুটো গ্রুপ। প্রায়ই কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন নামে এদের গ্রুপ বর্তমান সমাজে নানা অপরাধ করে যাচ্ছে। দেশে কিশোর গ্যাং যেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। ধারাবাহিক গ্রেপ্তার অভিযানের পরও তাদের থামানো যাচ্ছে না। বিভিন্ন ঘটনায় কিশোর গ্যাং-এর নেপথ্যে প্রভাবশালীদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠছে।
পুলিশ বলছে, আমরা তো নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু আইন প্রয়োগ তো সর্বশেষ স্তর। শুধু আইন প্রয়োগ করে এই কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না। এখানে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে। আমাদের নানা ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে। এই সময়ে কিশোরা অনলাইনে অনেক কিছু দেখে। ফেসবুকের মাধ্যমে সংগঠিত হয়। তাদের খেলার মাঠ নাই, বিনোদনের ব্যবস্থা নাই। এগুলো দেখতে হবে। আর দেশের ছয়টি কিশোর সংশোধানাগারে এক হাজার ১০০ কিশোরকে জায়গা দেয়া যায়। কিন্তু দেশে ওই বয়সের ছেলে মেয়ে আছে সাড়ে ৪ কোটি।
বিভিন্ন অপরাধজনিত কারণে এদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে প্রায় হাজার খানেক। এসব মামলায় আসামীও অনেক। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করা সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা গত জুলাই মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কথিত কিশোর গ্যাংদের তৎপরতা নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এখন সারা দেশে ২৩৭টির মতো ‘কিশোর গ্যাং’ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা শহরে, ১২৭টি। এসব গ্যাংয়ের (অপরাধী দল) সদস্য ১ হাজার ৩৮২ জন। ঢাকার পর চট্টগ্রামে রয়েছে ৫৭টি। এসব দলের সঙ্গে জড়িত ৩১৬ জন। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রাম নয়, গাজীপুর ও খুলনা মহানগর এলাকায়ও বিভিন্ন নামে কিশোর গ্যাং চক্র গড়ে উঠছে; যারা খুন ও ধর্ষণের মতো অপরাধে জড়াচ্ছে। নিজেদের মধ্যেও সংঘর্ষ-মারামারিতে জড়াচ্ছে এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা। জেলা শহরগুলোতেও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বাড়ছে। যেমন গত ১৮ এপ্রিল নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলায় কথিত কিশোর গ্যাং ‘এফ টেন’-এর সদস্যরা নিজেরাই বিরোধে জড়ায়। বৈশাখী মেলায় দোকান বসানো নিয়ে নিজেদের বিরোধ থেকে ১৮ বছর বয়সী এক তরুণকে (গ্যাংয়ের সদস্য) ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
গত ১০ এপ্রিল, ২০২৪ চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাং এর কবল থেকে ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে হামলার শিকার হন একজন চিকিৎসক। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। অনুসন্ধানে দেখা যায়, চট্টগ্রাম নগরে ৫ থেকে ১৫ জন সদস্যের অন্তত ২০০ কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। নগরজুড়ে এদের সদস্যসংখ্যা কমপক্ষে ১৪০০। ২০২৩ এর জুলাই থেকে চলতি বছরে এলাকাভিত্তিক কিশোর গ্যাংয়ের প্রধানসহ ২০০ জনেরও বেশি সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব পুলিশ। বর্তমানে বিচারাধীন ২ হাজার ২৩২টি মামলার বেশির ভাগ কিশোর গ্যাং সংক্রান্ত। পুলিশের অনুসন্ধানের বাইরেও ঢাকায় আরও ১৪টি সক্রিয় কিশোর গ্যাং আছে।
জানা গেছে, ২০২৩ সালে যাদের হাতে শুধু ঢাকাতেই ২৫ জন নিহত হয়েছেন। ২০২২-২৩ দুই বছরে তাদের হাতে ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে (ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগ)। ঢাকার অদূরে সাভারেও কিশোর গ্যাং এর উৎপাত বেড়েছে। চলতি বছর মার্চ মাসে সেখানে ৪টি খুনের ঘটনায় সরাসরি সংশ্লিষ্টতা মিলেছে কিশোর গ্যাং এর। অর্থাৎ এদের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে অপরাধপ্রবণতার সংখ্যাও ক্রমেই বাড়ছে। নাম কিশোর গ্যাং হলেও এসব বাহিনীর সদস্যরা বেশির ভাগই ১৮ বছরের বেশি বয়সি। ২০২৩ সালে রাজধানীতে সংগঠিত ২৫টি খুনের সঙ্গে কিশোর গ্যাং এর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এদের বিভিন্ন অপরাধের মধ্যে রয়েছে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জমি দখলে ভাড়া খাটা, উত্ত্যক্ত করা, হামলা মারধর ও খুন। হিরোইজম এবং আধিপত্য ধরে রাখতেও বিভিন্ন দলের মধ্যে সংঘর্ষ, বিবাদ ঘটে হরহামেশাই।
বিশেষজ্ঞদের ধারনা, সমাজে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় শুরু হয়েছে এক যুগ আগে থেকেই। বর্তমানে নানাবিধ সামাজিক সমস্যাগুলো বিনষ্টের মূল কারণ সৌহার্দ্য, সম্প্রিতি, ঐক্য এবং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রধান উপাদানগুলো প্রায় মৃত। সমাজ আজ দিন দিন অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে। মানুষের পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্র আরোপিত সব নিয়ম নীতি ও আচরণবিধি জীবনকে প্রভাবিত করে। নৈতিকতার মধ্যে লুকিয়ে আছে সততা, মহত্ত্ব, ন্যায়পরায়ণতা ও আদর্শবাদিতা।
নীতি-নৈতিকতা বা মূল্যবোধ এসব একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। এসবের অভাব রাষ্ট্রের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক মানদণ্ডকে সমালোচিত করে। মানুষের আচরণের মানদণ্ড বিশ্বাস ও নীতির ওপর নির্ভর করে। সে বিশ্বাস ও নীতিই হলো মূল্যবোধ বা নৈতিকতা। নৈতিকতা সম্পর্কে সচেতনতা জাগরণের শিক্ষাকেই মূল্যবোধের শিক্ষা বলা যায়। নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ মানুষকে তার মানবতাবোধ জাগ্রত করতে সহায়তা করে থাকে। নৈতিক আদর্শ সংবলিত সমাজ বলতে বোঝায়, যে সমাজে কোন অনাচার, দুর্নীতি, শোষণ, নিপীড়ন, স্বার্থপরতা এসব অনৈতিক চর্চা থাকবে না। সেই সমাজকেই নৈতিকতার আদর্শে আবর্তিত সমাজ বলা হয়। সব ধরনের দুর্নীতি, অন্যায়, অসততা থেকে মুক্ত জীবনই আদর্শ জীবন হিসেবে বিবেচিত হয়।
শিশুকাল বা কিশোর বয়স থেকেই মানুষকে মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সদাচরণের চর্চা করতে হয়। আজকে স্কুল বা মাধ্যমিক স্তরে এই চর্চার পরিবেশ কতটা বিদ্যমান। একটি শিশু পরিবার থেকে ক্রমশ সামাজিক নানা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠে। সেই সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো তথা স্কুল, কলেজ, বিশ্বাবিদ্যালয়, ক্লাব, সংঘ ইত্যাদিতে নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধের বিকাশের চর্চার ব্যবস্থা বর্তমানে নেই বললে চলে।