বাংলাদেশের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে এলজিইডি অন্যতম বৃহৎ সংস্থা। পল্লী অঞ্চলের সড়ক যোগােযাগ এবং হাট বাজার ও গ্রোথ সেন্টার উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করতে যে অবদান রেখেছে এলজিইডি তা আজ দৃশ্যমান। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে সরকারী উন্নয়নমূলক কাজের বিভিন্ন প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন করে থাকে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার দোসরদের লুটপাটের কারণে এলজিইডির অর্জিত সুনাম আজ প্রশ্নবিদ্ধ। ক্ষমতার অপব্যবহার করে একশ্রেণির ব্যবসায়ীরা (ঠিকাদার) কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। আওয়ামী লীগের প্রেতাত্মাদের লুটের ভাগিদারও হয়েছেন কেউ কেউ। ক্ষমতার দাপটে কোন কোন ঠিকাদার হয়ে ওঠেন এলজিইডির মূর্তমান আতঙ্ক। আর এই সুযোগে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরাও কামিয়ে নিয়েছেন শত কোটি টাকা। কমিশনের টাকায় বিদেশের মাটিতে আলিসান প্রাসাদ গড়ে তুলেছেন তারা। রাস্ট্রীয় সম্পদ লুট করে সন্তানদের উচ্চ শিক্ষার জন্য উন্নত দেশে পাঠিয়েছেন। কেউ কেউ অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাস্ট্রসহ উন্নত বিশ্বে সন্তান এবং স্ত্রী রেখে বহাল তবিয়তে এলজিইডিতে চাকরি করছেন।দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এদের আমলানামা যাচাই বাছাই করছে বলে একটি সূত্র জানায়। এ কারণে দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীদের ঘুম হারাম। অভিযোগ উঠেছে, বরিশাল বিভাগের ৬টি জেলার মধ্যে পিরোজপুরের উন্নয়ন কাজ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হলেও এলজিইডি কর্তৃপক্ষ ছিল নিরব ও নির্বিকার। এই জেলার কাজের মান অত্যন্ত নিম্নমানের হওয়ার জন্য মিরাজুল ইসলামকে দায়ী করলেও কখনো তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস দেখাতো না এলজিইডি। তিনি পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান। ভান্ডারিয়রা-কাউখালী এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য মহারাজের ছোটো ভাই। ২ ভাই আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত। এই মহারাজ এক সময় জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন (এপিএস)।মহারাজ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অবশ্য এই নির্বাচনে জয়লাভের জন্য তার ভাই ২৫০ কোটি টাকা ব্যয় করেন। জনশ্রুতি রয়েছে, মিরাজের সাথে এলজিইডির সকল দুর্নীতিগ্রস্থ প্রকৌশলীর সুগভীর সম্পর্ক রয়েছে। পিরোজপুর জেলায় এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর পোষ্টিং হতো এই ২ ভাইয়ের ইচ্ছানুযায়ী। বিগত ১৫ বছরে এলজিইডির দুর্নীতিগ্রস্থ অফিসারদের খুঁজে বের করে পোষ্টিং দেয়া হয় পিরোজপুর জেলায়। প্রথম দিকে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে নিয়ে আসেন প্রকৌশলী আব্দুল হাইকে। আব্দুল হাইয়ের সঙ্গে মতবিরোধ শুরু হলে তাকে সরিয়ে আরেক পছন্দের দুর্নীতিবাজ নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল হাসানকে পিরোজপুর জেলায় নিয়ে আসেন। তিনি সেখানে প্রায় ৪ বছর ছিলেন; তার সময়কালে এলজিইডি পিরোজপুর জেলায় কাজের মান অত্যন্ত নিম্নমানের হওয়ায় তাকে প্রধান প্রকৌশলী প্রত্যাহার করেন।এরপরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে নিয়ে আসা হয় এলজিইডির সবচেয়ে সমালোচিত প্রকৌশলী সুশান্ত রঞ্জন রায়কে। তিনি এমন কোনো অপরাধ নেই যা এদের পক্ষে করেননি; টেন্ডারবাজি, অপ্রয়োজনীয় রিভাইস, ওভারপেমেন্ট, ডুপ্লিকেশন (একই স্কীম একের অধিক প্রকল্প থেকে টেন্ডারকরণ) ইত্যাদি অনেক ভয়ানক অপরাধ সংঘটিত করেন মিরাজুলের শেল্টারে। সুশান্তের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাল্লা ভারী হলে কর্তৃপক্ষ তাকে সরানোর উদ্যোগ নেন। তবে এলজিইডির আলোচিত ও সমালোচিত দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী আবদুস সাত্তার হাওলাদারকে পোস্টিং দিতে বাধ্য করেন পিরোজপুর জেলায়। তিনি গত জুন মাসে অবসরে গিয়েছেন। জনশ্রুতি রয়েছে, তিনি দায়িত্ব পালনকালে কমিশনের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। রাস্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটে প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তার হাওলাদার এখনও রয়েছেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এরপর পিরোজপুর জেলা এলজইডিতে পদায়ন করা হয় অনৈতিক কাজের মাস্টার মাইন্ড বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী রনজিত দেকে। পরবর্তীতে মিরাজুল ইসলাম তৎকালীন মন্ত্রী তাজুল ইসলাম, প্রধান প্রকৌশলী রশীদের সহযোগিতায় (কোটি টাকার বিনিময়ে) সুশান্ত রঞ্জন রায়কে ‘বরিশাল-ঝালকাঠী-পিরোজপুর’ (BJP) প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসাবে নিয়োগ পাইয়ে দেন। এই প্রকল্পের আওতায় পিরোজপুর জেলায় ইফতি, ইটিসিএল (প্রাঃ) লিমিটেড কাজ পায়। যার প্রোপ্রাইটর মিরাজুল ইসলাম।
দেশের দক্ষিণাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য (IBRP) নামে একটি প্রকল্প চালু হয়। এই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন আহমদ আলী। তাকে এই প্রকল্পের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে সুশান্ত রঞ্জন রায়কে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। কারণ আহমেদ আলী জানতে পারেন তার প্রকল্পের প্রায় ১৫/২০টি ব্রীজের কাজ শুরু হয়নি। অথচ ৮৫% পেমেন্টের জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। এই কাজগুলো করার জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ইফতি, ইটিসিএল (প্রাঃ) লিমিটেড। কাজগুলোর ওভারপেমেন্ট, ডুপ্লিকেশন, টেন্ডারিং ইত্যাদি ঘাপলাসহ আহমেদ আলীর বিষয়টি পুণঃতদন্ত করে দেখা উচিত বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
BDIRWSP প্রকল্প এর কাজ শুরু হয় ২০২২ সালে। শুরুতেই এই প্রকল্প থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার স্কীম বাস্তবায়নের জন্য দরপত্র আহ্বান নিমিত্তে অনুমোদন দেয়া হয়। ঐ অর্থ-বছরেই পিরোজপুর জেলায় প্রকল্প পরিচালক ১১০ কোটি ছাড় করেন। কাজগুলোর বেশীর ভাগই নামে বেনামে বাস্তবায়ন করছে ইফতি. ইটিসিএল (প্রাঃ) লিমিটেড। তাদেরকে বরাদ্দকৃত টাকার প্রায় পুরোটাই দিয়ে দেয়া হয়। অথচ তখন পর্যন্ত মাঠে ৫% কাজও বাস্তবায়িত হয়নি। এই প্রকল্পের পরিচালকের নাম মোহাম্মদ আদনান আখতারুল আলম। তাকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ করার জন্য মিরাজ কোটি টাকার বেশী মন্ত্রীকে প্রদান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
UHBP প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন সেলিম মিয়া। এ প্রকল্পের অধীনে পিরোজপুর জেলায় ১৮টি ব্রীজ নির্মাণের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়। প্রায় সবগুলোর কাজ করার দায়িত্ব পায় ইফতি, ইটিসিএল (প্রাঃ) লিমিটেড। এসব স্কীমের ১৪টি তারা নিজে করেছে। এই ১৪টি কাজের কোনো কাজই শুরু হয়নি অথচ পরিশোধ করা হয় চুক্তি মূল্যের প্রায় ৮৫% টাকা ।
CAFDRIRP প্রকল্প এর মাধ্যমে পিরোজপুর জেলায় ৭০ এর অধিক স্কীম বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোঃ রফিকুল হাসান। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি এর মধ্যে প্রায় ৬৫ টি স্কীম ইফতি, ইটিসিএল (প্রাঃ) লিমিটেড পেয়েছে। এ প্রকল্পের কাজগুলোর টেন্ডারিং প্রক্রিয়াসহ গুণগতমান নীরিক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সরেজমিনে পরিদর্শন করলে আসল রহস্য বেরিয়ে আসবে বলে সচেতন মহল। পিরোজপুর জেলার পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এর প্রকল্প পরিচালক মোঃ ইব্রাহীম। মিরাজের ইচ্ছে অনুযায়ী তাকে নিয়োগ দেয়া হয়।
মিরাজের সাথে সাবেক মন্ত্রী তাজুল ইসলাম ও ভান্ডারিয়া নিবাসী সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব তোফাজ্জেল হোসেনের দহরম মহরম সম্পর্ক। মূলতঃ এদেরকে ব্যবহার করে বরিশাল বিভাগের সমস্ত প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকদের নিয়োগে মূখ্য ভূমিকা পালন করেন। এলজিইডি সূত্র জানায়, দেশের পরিবর্তীতে সর্বত্র সংস্কার হলেও এখানকার বিতর্কিত কর্মকর্তারা এলজিইডি-মন্ত্রণালয়সহ সর্বত্র দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের এই দৌরাত্মে সীমা শুরু বরিশাল বিভাগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এলজিইডির আওতাধীন বাংলাদেশের সমস্ত প্রকল্পের পরিচালক নিয়োগে মন্ত্রীর পক্ষে কাজ করেছেন। অনতিবিলম্বে বরিশাল বিভাগের সমস্ত প্রকল্প পরিচালদেরকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নিয়োগদানের পরামর্শ সংশ্লিষ্টদের। এ ব্যাপারে মিরাজুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে বর্তমান ছাত্র জনতার আন্দোলনের পরিবর্তীত প্রেক্ষাপটে তিনি আত্মগোপনে থাকায় তার মতামত জানা সম্ভব হয়নি।

