সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর রায়েরবাগে সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ পথচারী জাকির হোসেনও (২৯) মারা গেছেন। বুধবার দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জাকির। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ, পরবর্তী সময়ে সংঘাতে এ নিয়ে ঢাকাসহ সারা দেশে ২০২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেল। মৃত্যুর এই হিসাব কিছু হাসপাতাল, মরদেহ নিয়ে আসা ব্যক্তি ও স্বজনদের সূত্রে পাওয়া। সব হাসপাতালের চিত্র পাওয়া যায়নি।
এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৬ জুলাই (মঙ্গলবার) ৬ জন, ১৮ জুলাই (বৃহস্পতিবার) ৪১, শুক্রবার ৮৪, শনিবার ৩৮, রোববার ২১, সোমবার ৫, মঙ্গলবার ৩ ও গতকাল ৪ জনের মৃত্যু হয়। উল্লেখ্য, সোম, মঙ্গলবার ও বুধবার মৃত্যু চিকিৎসাধীন অবস্থায় হয়েছে।
এদিকে কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সঙ্ঘাত-সহিংসতায় গত চার দিনে রাজধানীতে দুই হাজার ২৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার কে এন রায় নিয়তি। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ২৬৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
৬ বছরের রিয়াকেও বাঁচানো গেল না: ছয় বছরের শিশু রিয়া গোপ। স্ট্রেচারে কম্বলে ঢাকা তার নিথর দেহ। শুক্রবার বিকালে নারায়ণগঞ্জের নয়ামাটি এলাকায় বাসার ছাদে খেলার সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিল শিশুটি। পাঁচদিন ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন থেকে গতকাল মারা যায় সে। হাসপাতালে আসার পর থেকে তার আর জ্ঞান ফেরেনি। এ কারণে তার মাথায় অস্ত্রোপচার করাও সম্ভব হয়নি।
সন্তানের লাশ স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়ার সময় কথা বলতে পারছিলেন না শিশুটির বাবা দীপক কুমার গোপ। শোকে আকুল দীপক কোনো কথাই বলতে চাইলেন না। শুধু বললেন- আমার মেয়েকে কেন মারা হলো। আপনারা কি আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দিতে পারবেন? কথা বলে আর কী হবে? তাদের বিয়ের দীর্ঘদিন পর জন্ম হয় রিয়ার। সারাক্ষণ চঞ্চলতায় ঘর আলো করে রাখতো শিশুটি। গুলিতে আহত হওয়ার পর থেকে শিশুটির মা নাওয়া- খাওয়া ছেড়ে পাগলপ্রায়। দীপক গোপ বার বার বলছিলেন, মেয়ের লাশ নিয়ে কীভাবে এখন মায়ের কাছে যাবো।
শিশুটির স্বজনরা জানান, নারায়ণগঞ্জের নয়ামাটিতে তাদের বাড়ি। শুক্রবার বিকালে খেলার জন্য বাড়ির ছাদে যায় রিয়া। এ সময় কোটা বিরোধী আন্দোলনকে ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশের গুলিতে আহত হয় সে। চিকিৎসার জন্য নেয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে বুধবার সকাল ৯টায় মারা যায় শিশুটি।
দীপক কুমার গোপ বলেন, আমার তো সব ছিল। কী হবে এখন? কার কাছে চাইবো বিচার। অনেক সাধনার ধন ছিল আমার। বিয়ের দীর্ঘদিন পরে আমার সন্তানটি হয়। আর এই সন্তানটির লাশ আজ আমার কাঁধে, মর্গে মর্গে ঘুরতে হচ্ছে। ঘর মাতিয়ে রাখতো বাচ্চাটি।
গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, গত কয়েকদিনের সংঘাতে নিহতদের মরদেহের অপেক্ষায় এখনো রয়েছেন স্বজনরা। সেখানে অপেক্ষারতরা আর্তনাদ করছেন। কেউ কেউ হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে গড়িয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য থানায় থানায় দৌড়ঝাঁপ করছেন। আবার কেউ এক থানা থেকে আরেক থানায় ঘুরছেন।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সেলসম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন শাজাহান (২২)। তিনি বাসায় ফেরার পথে মহাখালীতে গুলিবিদ্ধ হন। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসলে তাকে ভর্তি করে নেয়া হয়। মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। নিহত শাজাহানের বোন ফাতেমা বলেন, ভাই একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। শুক্রবার অফিস শেষে বাসায় ফেরার পথে মহাখালীতে পুলিশের গুলিতে আহত হন। পরে তাকে পরিচিতরা হাসপাতালে নিয়ে আসে। মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভাই মারা যান। সকাল থেকে থানায় থানায় ঘুরছি। এক থানা থেকে আরেক থানায় পাঠায়। এই পর্যন্ত তিন থানায় ঘোরা হয়ে গেছে। আমার ভাই মহাখালীতে থাকতো আর আমরা শ্যামলীতে থাকি। ভাইয়ের মরদেহটি মর্গে রাখা আছে। এগুলো কীভাবে সহ্য করবো। ভাইয়ের পেটে ও হাতে গুলি লেগেছিল। ঢামেকের সিসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল। থানা থেকে সই দিলে ভাইয়ের ময়নাতদন্ত করবে। কিন্তু কখন কি হবে কেউ সঠিক বলছে না। এদিকে শাজাহানের মা মর্গের সামনে শোকে পাথর হয়ে বার বার বুকে চাপড়াচ্ছিলেন। তিনি বারবার বলছেন, আমার সব শেষ। কি হবে আমার? কোথায় পাবো এর বিচার।
ঢামেকের মর্গে থাকা শাহবাগ থানা সংশ্লিষ্টরা জানান, বুধবার অজ্ঞাতনামা আট জনের মরদেহ দাফনের জন্য আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আমাদের কাছে ছবি এবং ডিএনএ প্রোফাইল রয়েছে। কোনো স্বজন আসলে সবকিছু মিললে পরিচয় শনাক্ত করতে পারবো। ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের তথ্যমতে, বুধবার সকাল থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত দুই জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে মা নাছিমা বেগমের আর্তনাদ: প্রায় আট বছর আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় কাঁধে আঘাত পান শাহ আলম হাওলাদার। এর পর থেকে ভারী কোনো কাজ করতে পারছেন না। এক মেয়ে ও ছেলেকে নিয়ে আর্থিক টানাপোড়েনের সংসারে হাল ধরতে বাধ্য হন স্ত্রী নাছিমা বেগম। সেলাইয়ের কাজ করে কোনোমতো চলত সংসার। এ অবস্থা দেখে মায়ের সঙ্গে হাল ধরেন তাঁদের একমাত্র সন্তান হৃদয় আহমেদ (শিহাব)। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় রাজধানী ঢাকার বাড্ডা এলাকায় একটি ফার্নিচারের দোকানে তাকে কাজে পাঠানো হয়েছিল। দুপুরের খাবার খেয়ে ওই দোকানে যাওয়ার পথে গত শুক্রবার এলাকাটিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়।
শিহাবের এমন মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন তার মা–বাবা। গত শুক্রবার রাতে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার সন্যাসীর চর ইউনিয়নের রাজারচর আজগর হাওলাদারকান্দি গ্রামে তার মরদেহ পৌঁছায়। পরে গত শনিবার জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে মরদেহ দাফন করা হয়।
গত বুধবার শিহাবের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সন্তান হারানোর শোকে বাক্রুদ্ধ হয়ে ঘরের এক কোণে বসে আছেন তার বাবা শাহ আলম হাওলাদার। সন্তানের কথা জিজ্ঞাসা করতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মা নাছিমা বেগম। একমাত্র ভাইকে হারিয়ে আর্তনাদ করে কাঁদছে বোন। পরিবারটির এমন অবস্থা দেখে শোকাচ্ছন্ন স্বজন-প্রতিবেশীরাও। বাড়ির পাশের কবরস্থানে এসে ভিড় করছেন তাঁরা। একমাত্র নাতিকে হারিয়ে থেকে থেকে প্রলাপ বকছেন দাদা রফিক হাওলাদার।
‘সংসার চালানোর মতো আর কেউ রইল না’
ছোট মেয়েটি এখনো “বাবা বাবা”বলে কাঁদছে,ঢাকায় কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় নিহত কামাল হোসেন ওরফে সবুজের স্ত্রী:‘স্বামীর মৃত্যুতে সন্তান নিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেলাম। পরিবারে আর কেউ উপার্জনের মানুষ নেই। ছোট মেয়েটি এখনো “বাবা বাবা” বলে কাঁদছে। এখন আমাদের সংসার চালানোর মতো আর কেউ রইল না।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন সাদিয়া বেগম (রানু)।
ঢাকায় কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় সাদিয়া বেগমের স্বামী কামাল হোসেন ওরফে সবুজ (৩৮) নিহত হয়েছেন। তিনি ঢাকায় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আইয়ের গাড়িচালক ছিলেন। গত শনিবার সকালে ঢাকার বাড্ডার শাহজাদপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন কামাল।
কামাল হোসেনের বাড়ি ঝালকাঠি সদর উপজেলার বিনয়কাঠি ইউনিয়নের বালকদিয়া গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মুনসুর হাওলাদার। সোমবার সকালে সদর উপজেলার আগরবাড়ি এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে কামাল হোসেনকে দাফন করা হয়।
কামাল হোসেন ও সাদিয়া বেগম দম্পতির তিন ছেলেমেয়ে। সাদিয়া সন্তানদের নিয়ে ঝালকাঠি শহরে ভাড়া বাসায় থাকেন। মঙ্গলবার দুপুরে সদর উপজেলার আগরবাড়ি এলাকায় বাবার বাড়িতে গিয়ে সাদিয়া বেগমের সঙ্গে কথা হয়। তাঁর পাশে বসে ছিল ছোট দুটি ছেলে-মেয়ে। ছেলেটির বয়স সাত ও মেয়েটির বয়স পাঁচ বছর। ছেলেটির গলায় বাবার অফিসের পরিচয়পত্র ঝোলানো।
সাদিয়া বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী বলে গেছেন, তিনি মারা গেলে তাঁকে যেন তাঁর জন্মস্থান বিনয়কাঠিতে কবর না দিয়ে ঝালকাঠিতে আমাদের কাছাকাছি কোথাও কবর দিই। তাই তাঁকে আমার বাবার বাড়িতে দাফন করা হয়েছে।’ সাদিয়া আরও বলেন, ‘ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঝালকাঠি শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতাম। এখন আমাদের থাকার জায়গা নেই। সরকারের কাছে সহযোগিতা চাই, যাতে আমি ছেলেমেয়েদের নিয়ে বেঁচে থাকতে পারি।’

