নিজস্ব প্রতিবেদক : বুয়েটের সাবেক ছাত্র। নিজ হাতে গড়ে তুলেছেন বিজ্ঞানমনষ্ক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাদীপ্ত ব্লগ ‘মুক্তমনা’। থাকতেন যুক্তরাষ্ট্রে। এবারের মেলায় প্রকাশ পেয়েছে তার লেখা বই। যার জন্যই দেশে ফেরা। কিন্তু এ ফেরা, শেষ ফেরা। ব্লগার অভিজিৎ রায় এখন শুয়ে আছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে। সেই অভিজিৎ রায় এখনো জাগ্রত। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার কিংবা বিভিন্ন ব্লগে তিনি এখনো বিচরণ করছেন আপন মহিমায়। অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের কাছে অভিজিৎ রায় এখন প্রতিবাদের ভাষা। যেই প্রতিবাদেরর স্মারক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে হ্যাশট্যাগ #IamAvijit।
বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর আক্রমণে প্রাণ হারান অভিজিৎ রায়। নৃশংস, নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সরব ফেসবুক ও বিভিন্ন ব্লগ ব্যবহারকারীরা। ফেসবুকে ইভেন্ট খুলে বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্ক সময় রাত সাড়ে ৯টায় প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী অভিনেত্রী লুৎফর নাহার লতা। জ্যাকশন হাইটের ৭৭নং স্ট্রিটে আয়োজিত সভায় সকলকে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি লেখেন, ‘অভিজিৎকে হত্যা করেছে ওরা! ইসলামের নামে জঙ্গিবাদী গ্রুপ! চাপাতির আঘাতে কেড়ে নিয়েছে ওর মূল্যবান জীবন! কিন্তু ওরা জানে না। কলম অনেক বেশি ধারালো ওদের চাপাতির চেয়ে! এক অভিজিৎ তৈরি হতে ওদের একশ বছর লাগবে! ওরা খুনী হত্যাকারী হবে, মানুষ হবে না! মানবতায় অভিজিতের পায়ের কাছে দাঁড়াতে পারবে না ওরা! ‘পৃথিবীতে সকল প্রাণীর মঙ্গল হোক’ এই প্রার্থনাই ছিল অভিজিতের! কিন্তু ওরা উদ্বুদ্ধ হবে না মানব কল্যাণে কারণ অধর্মের অন্ধকার গিলেছে ওদের!’
ব্লগার মাহমুদুল হক মুন্সী (বাঁধন) লিখেছেন, ‘কলমের বিপরীতে আছে চাপাতি-ছুরি-তলোয়ার! রাজীব ভাই এর ছবি এখনো প্রোফাইলেই আছে… চেঞ্জ করে অভিজিত দার ছবি দিব? নাকি কালকে পঞ্চাশ একশ জন জড়ো হয়ে শাহবাগে গলা ফাটাবো? তাতে লাভটা কি? এই বাংলাদেশে, একজন হিন্দু, একজন বৌদ্ধ, একজন খ্রিস্টান, একজন জৈন, একজন ধর্মকে বেঁচে খাওয়া মুসলমান বসবাস করতে পারবে। শুধু নাস্তিক বসবাস করতে পারবে না। তাদেরকে মরতে হবে, কুকুরের মতো। রাস্তায় কুপিয়ে কুপিয়ে তাঁদের হত্যা করা হবে। আর, আমরা, ঘরে বসে রাগে থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে দুলাইন স্ট্যাটাস দিতে পারবো… হায় বাংলাদেশ!’
ব্লগার ও গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম উদ্যোক্তা নিলয় সোবাহান একটি পোস্টে লিখেছেন, ‘এক বছর ধরেই অভিজিৎ রায়কে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিলেন জামাত-শিবিরমনা অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা।’ তিনি লিখেছেন, ‘বিজ্ঞান লেখক, ব্লগার ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়কে কারা হত্যা করেছে এ বিষয়টি পুলিশের পক্ষ থেকে পরিষ্কার কোন ঘোষণা না আসলেও দীর্ঘদিন ধরে অভিজিৎ রায় ছিলেন ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠীর হিটলিস্টে। দেশে আসলেই তাকে হত্যা করা হবে এমন ঘোষণাও দিয়েছিল জঙ্গি মৌলবাদীরা। একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ২০০৪ সালে আক্রান্ত হয়েছিলেন সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ। তাকেও একইভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছিলন জঙ্গি মৌলবাদীরা। হুমায়ুন আজাদের আক্রান্তের তারিখের ঠিক একদিন আগেই আক্রান্ত হলেন মুক্তচিন্তার আরেক লেখক অভিজিৎ রায়। কারা অভিজিৎ রায়কে হত্যা করেছে এটা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা না হলেও তিনি ছিলেন মৌলবাদীদের হিটলিস্টে। এর আগে একাধিকবার অভিজিৎ রায়সহ একাধিক ব্লগারের নামে হিটলিস্ট প্রকাশিত হয়েছিল। ব্লগ ও অনলাইনের বিতর্কিত শফিউর রহমান ফারাবী একাধিকবার প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিল দেশে আসলেই তাকে হত্যা করা হবে।’
তিনি ফারাবীর বেশকিছু স্টাট্যাস ও কমেন্টের স্ক্রিনশট দিয়ে লেখেন, ‘গত বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি ফারাবী তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে অভিজিৎ রায় সম্পর্কে বিদ্বেষ ছড়ানোর পর কমেন্টে লিখেন- “অভিজিৎ রায় আমেরিকা থাকে। তাই তাকে এখন হত্যা করা সম্ভব না। তবে সে যখন দেশে আসবে তখন তাকে হত্যা করা হবে”। এর আগেও একাধিকবার এবং পরেও সে অভিজিৎ রায় সহ মুক্তচিন্তার সব লেখকদের হত্যার হুমকি দিয়েছিল এবং বর্তমানেও সে ধারা অব্যাহত আছে। ব্লগার থাবা বাবার হত্যার পর কোন ইমাম থাবা বাবার জানাজার নামাজ পড়ালে তাকেও হত্যা করা হবে বলে হুমকি দিয়েছিল। ব্লগার থাবা বাবা ওরফে ইঞ্জিনিয়ার রাজীব হায়দারের হত্যাকাণ্ডের পর শফিউর রহমান ফারাবীকে গ্রেপ্তার করা হলেও সে পরবর্তীতে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসে। অধ্যাপক মুহম্মদ ইউনূস, অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ কিংবা ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার- ভিন্ন সময়ে ভিন্ন স্থানে শিকার হলেও তাদের সবার ওপর হামলার ধরন ছিল একই রকমের। মূলত গলা থেকে দেহের ঊর্ধ্বভাগ অর্থাৎ মাথাই ছিল আক্রমণকারীদের লক্ষ্যবস্তু। অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডে একই পন্থা অবলম্বন করেছে সন্ত্রাসীরা।’
কবি ও সাংবাদিক মুস্তাফিজ শফি লিখেছেন, ‘হুমায়ুন আজাদের পর অভিজিৎ রায়। আমরা কোন সমাজে বাস করছি।’
মোহমাম্মদ রাইসুল ইসলাম লিখেছেন, ‘মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত রায় খুন হওয়াতে অনেকের মনে খুশির জোয়ার। তার কারন তিনি একজন নাস্থিক। আর উগ্রবাদী নিয়ে লেখা লিখি করতেন। আচ্ছা মানলাম তিনি অপরাধ করেছেন- এ জন্য বিচার তিনি আখেরাতে পাবেন, জামাত-শিবিরদের সে অধিকার কে দিয়েছে খুন করার। জামাত-শিবিররা তো এমনে অমুসলিম তারা অভিনয় মুসলিম। ধর্মে নামে মানুষ পুড়ে মারছে। আর এদেরকে যারা এখন সমর্থন দিচ্ছে তাদের মতো আবাল আর নাই। এটা হচ্ছে মানবতা।’
শেখ মিজান লিখেছেন কবিতা- ‘বোকাগুলা সত্যিই বুঝলো না!/ কলমের কালির সাথে রক্ত মেশালে আর মুছা যায় না,/ হুমায়ূন আজাদ স্যার, অভিজিৎ রায়দের মৃত্যু হয় না!’
রিয়াজুল আলম ভূঁইয়া লিখেছেন, ‘অভিজিৎ রায় খুন হয়েছেন জানার পর থেকে মাথাটা ভার হয়ে আছে। খুনের জায়গায় গিয়ে অভিজিত দার রক্ত, মগজ, চশমা, আঙুল পড়ে থাকতে দেখলাম। হাসপাতালের মর্গে লাশ হয়ে শুয়ে ছিলেন কয়েকঘণ্টা আগের হাস্যোজ্জ্বল মানুষটি। আর তার স্ত্রী এখনো লড়ে চলছেন মৃত্যুর সাথে। সুস্থ হয়ে ফিরে আসলে বাকি জীবন কী দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে কাটাতে হবে তাকে, সে কথাই ভাবছি। তাদের মেয়ে, তার কী হবে?’
তিনি আরো লেখেন, ‘কী ছিলেন অভিজিৎ রায়? তার অনলাইন লেখালেখির সাথে, তার লেখা বইগুলো কিংবা তার প্রতিষ্ঠিত মুক্তমনা ব্লগের সাথে যারা পরিচিত আমরা সকলেই জানি কী অমূল্য এক সম্পদকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। তার শূন্যস্থান পূরণ করতে অনেক সময় লাগবে বাংলাদেশের, বিশেষত এই মৌলবাদে জর্জরিত বাংলাদেশের। হাজারটা জঙ্গিকে ফাঁসিতে ঝুলালেও একজন অভিজিৎ রায়কে পাবে না আমার হতভাগ্য দেশ।’
সৌরভ বাড়ুই লিখেছেন, ‘এটাই কি আমাদের নিরাপত্তা? এই মৃত্যুর জবাব কে দেবে? আর কোন দুই কথা শুনতে চাইনা।।। আমাদের এক কথা।।।। অভিজিৎ হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই।।। এক কথায় ফাঁসি চাই।’
আরেক ব্লগার ও সংস্কৃতিকর্মী শাকিল অরণ্য অভিজিৎ রায়ের আক্রান্তের দিন ২৬ ফেব্রুয়ারিকে ‘মুক্তমনা দিবস’ ঘোষণার দাবি জানান। অনেকেই তার এ দাবির সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন।
সাংবাদিক মুহম্মদ আকবর লিখেছেন, ‘কেন বইয়ের বিরুদ্ধে বই প্রতিবাদ হতে পারে না? কেন বইয়ের বিরুদ্ধে মৃত্যু?’।
ইমরান আহমেদ শাকিল ফেইসবুকে লিখেছেন, ‘এভাবেই কি খুন হবে বিবেক? মৌলবাদের হাতে এভাবেই বলি হবে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর? না হতে পারে না। একজনকে খুন করেছে তাতে কি ভয় পাবো? না কখনো না। বরং আমাদের কণ্ঠ আরো তীব্র হবে। মৌলবাদীদের ধ্বংস করতে আমরা মৌলবাদীদের টুটি টেনে ধরবো। অভিজিৎ এর মৃত্যুর শোককে শক্তি করে প্রতিবাদ গড়ে তুলব।’

