নিজস্ব প্রতিবেদক : অর্ধযুগেও নিষ্পত্তি করা যায়নি আলোচিত বিডিআর হত্যা মামলায় কার্যক্রম। বিচারিক আদালতে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দণ্ডবিধির (পেনাল কোড) আওতায় বিচার করার পর ডেথ রেফারেন্স ও ফৌজদারি আপিল শুনানির জন্য বর্তমানে এ মামালাটির কার্যক্রম হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বিডিআরের সদর দফতর পিলখানা ট্র্যাজেডিতে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। এ ঘটনায় ঐ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর লালবাগ থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করা হয়। পরে মামলা দুটি নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তরিত হয়। এর বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকার আলীয়া মাদ্রাসা মাঠের অস্থায়ী এজলাসে। বিচার কার্যক্রম শেষে ঢাকা মহানগর তৃতীয় বিশেষ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর রায় ঘোষণা করেন।
বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর)’র সাবেক ডিএডি তৌহিদসহ ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করা হয়। এছাড়াও এঘটনায় অভিযুক্ত করে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীসহ ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৬২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন বিচারকি আদালত। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় এ হত্যা মামলা থেকে ২৭৭ জনকে খালাস দেয়া হয়। বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে কারাগারে আটক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন ৪ জন। এছাড়া সব মিলিয়ে পলাতক রয়েছেন ২৩ আসামি। এ রায়ের পর বিডিআরের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) করা হয়।
বিচারকি আদালত এ রায় ঘোষণার পর সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা হাইকোর্টে আসেন রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে। এছাড়া এ রায়ের কিছুদিন পর মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তদের মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য তাদের বিষয়গুলো (নথিপত্র) ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে আসে। এ রায়ে খালাস পাওয়া আসামিদের বিরুদ্ধে আপিল করে সরকারপক্ষও।
গুরুত্বপূর্ণ এ মামলার সব আপিলের শুনানির জন্য সুপ্রিমকোর্ট বিশেষভাবে উদ্যোগ নেয়। বিশেষ ব্যবস্থায় এ মামলার পেপারবুক তৈরি করা হয়। প্রতিটি পেপারবুক ৩৭ হাজার পৃষ্ঠার ওপরে। তবে পেপার বুকে কিছু ভুল বাক্য ও শব্দ লক্ষ করা গেছে। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে প্রধান বিচারপতি এই মামলার আপিল শুনানির জন্য একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দেন।
বর্তমানে পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ডেথ রেফারেন্স ও ফৌজদারি আপিলের শুনানি হাইকোর্টে একসাথে চলছে।
গত ১৭ জানুয়ারি এ মামলার আপিল শুনানির জন্য বিচারপতি মো. শওকত হোসেনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হয়। পরে ১৮ জানুয়ারি থেকে এ মামলার আপিল শুনানি চলছে।
ডেথ রেফারেন্স ও ফৌজদারি আপিলের শুনানির জন্য সর্বমোট ৩৫ হাজার ১শত ১৩ পৃষ্ঠার পেপার বুক প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম।
নিয়মানুযায়ী আদালতে সম্পূর্ণ পেপার বুক পড়া হবে, তারপর সরকার ও আসামী পক্ষ তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবেন। এরপর চূড়ান্ত যুক্তি উপস্থাপন শেষে আপিলের রায় ঘোষণা করবেন হাইকোর্ট।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাইকোর্টে এ মামলা আপিল হওয়ার পর এ পর্যন্ত ২১ কার্যদিবস শুনানি হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের ৬৫৪ জন সাক্ষীর জবানবন্দির মধ্যে ১৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দি আদালতে পাঠ করা শেষ হয়েছে।
এদিকে পিলখানা হত্যা মামলার কার্যক্রম শেষ করার সময়, মামলার সর্বশেষ অবস্থা কি ইত্যাদি বিষয় জানতে চাওয়া হয় এ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে। তিনি বলেন, ‘এ মামলার আপিল শুনানির কার্যক্রম আগামী ৬ মাসের মধ্যে শেষ হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘যে গতিতে এ মামলার কার্যক্রম চলছে সে হিসেবে আগামী ছয় মাসের মধ্যে এ মামলার কার্যক্রম শেষ হতে পারে আশা করছি।’
পেপার বুকের বানান ভুল প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলে এ মামলার পেপারবুক অনেক বড় ও বেশি পৃষ্ঠার। পেপারবুকে পৃষ্ঠা বেশি হওয়ার কারণে সামান্য ভুল ক্রুটি থাকা সাভাবিক।’
হাইকোর্টেই কি এ মামলা কার্যক্রম হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না। এ মামলার কার্যক্রম হাইকোর্টেই শেষ হবে না। কারণ মামলার সর্বশেষ নিষ্পত্তি হবে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে।’
তিনি বলেন, ‘আপিল বিভাগ এটি বিস্তারিত শুনবে। এ মামলার কার্যক্রম কবে নাগাদ শেষ হতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটি নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন, কারণ এটি আদালতের ব্যাপার।’
তবে এ মামলার আপিল কার্যক্রম শেষ করার সময়সীমা নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তেব্যর সাথে দ্বিমত করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী এ্যাডভোকেট শামীম সরদার। তিনি বলেন, ‘এ মামলার নথিপত্র অনেক বেশি। তাই এর আপিল কার্যক্রম শেষ করতে ৬ মাসেরও বেশি সময় লাগতে পারে।’
মামলায় সম্পর্কে জানতে চাইলে আসামী পক্ষের অন্য আইনজীবী আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘মামলাটিতে অনেক আসামীর বিরুদ্ধে যথেষ্ট সাক্ষ্য প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় ঘোষণা করা হয়েছে।
একপ্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হাইকোর্ট এ মামলার প্রতিটি সাক্ষীর সাক্ষ্য সুক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করবেন এবং আমরা আশা করছি ন্যায় বিচার পাব।’ তিনি বলেন, ‘এ মামলার চার্জশিট, জব্দ তালিকা এবং ৫৩৮ জন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদালতে পাঠ করে শোনানো হয়েছে।’

