নিজস্ব প্রতিবেদক : মানবতাবিরোধী অপরাধে জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য পলাতক ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বারকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
রায়ে ১, ২, ৩ ও ৫ নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু কারাদাণ্ড দেয়া হয়। চার নম্বর অভিযোগে ২০ বছর কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো দুই বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।
আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে আনা পাঁচটি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তার অপরাধের উপযুক্ত সাজা মৃত্যুদণ্ড হলেও বয়স বিবেচনায় তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলায় এই রায় ঘোষণা করেন।
তার আগে রায় পড়া শুরু করেন বিচারপতি মো. আনোয়ারুল হক। পরে রায় পাঠ করেন মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। শেষে দণ্ড ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম।
বেলা ১১টা ৫ মিনিটে এজলাসে আসন গ্রহণ করেন বিচারপতিরা। রায় পাঠ শুরু করেন তার কয়েক মিনিট পর। রায়ে মোট একশ ৪১ পৃষ্ঠা রয়েছে।
৫ অভিযোগ-
এক. একাত্তর সালে পিরোজপুর জেলার মঠবাড়ীয়া থানাধীন তুষখালীতে দুইজন মুক্তিযোদ্ধাকে জব্বারের নির্দেশে হত্যা। এই হত্যাকাণ্ডটি রাজনৈতিক কারণে সংগঠিত হওয়ায় আসামির বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ সুস্পষ্ট।
দুই. হিন্দু সম্প্রদায়কে পুরোপুরি ধ্বংস করার জন্য আসামির নির্দেশ মোতাবেক রাজাকার বাহিনী গ্রামের নিরীহ নিরস্ত্র হিন্দুদের ওপর গুলি চালিয়ে একজনকে (সারদা কান্ত পাইক) হত্যা করে ও উক্ত গ্রামের ৩৬০টি বাড়ির মালামাল লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে।
তিন. পিরোজপুর জেলার মঠবাড়ীয়া থানাধীন নলীগ্রামে আসামির নেতৃত্বে হামলা চালিয়ে এবং আসামি নিজে গুলি করে এবং তার নির্দেশে রাজাকার বাহিনী নির্বিচারে গুলি করে গ্রামের নিরীহ নিরস্ত্র মোট ১১ জন হিন্দু জনসাধারণকে হত্যা করে এবং গ্রামের ৬০টি বাড়ির সমস্ত মালামাল লুটপাট করে।
চার. আসামির নির্দেশে পিরোজপুর জেলার মঠবাড়ীয়া থানার তুষখালী গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় দুইশ নিরীহ নিরস্ত্র মানুষকে হত্যার ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক কলেমা পড়িয়ে এবং নামাজ আদায়ে বাধ্য করে মুসলমান ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয় এবং তাদের সকলকে মুসলমান নাম দেয়া হয়।
পাঁচ. আসামির নির্দেশ, পরামর্শ ও প্ররোচনায় পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া সদর এবং আশুলকাটা গ্রামের মোট ৩৭ জন নিরীহ নিরস্ত্র হিন্দু ব্যক্তিকে দড়ি দিয়ে বেঁধে সূর্য্যমণি বধ্যভূমির কাছে নিয়ে যায়। আসামির গঠিত রাজাকার বাহিনী তাদের মধ্যে ২২ জনকে গুলি করে হত্যা করে আর বাকি ১৫ জন গুলিতে মারাত্মক জখম হয়।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৯ এপ্রিল এ মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে প্রসিকিউশনের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত সংস্থা।
ওই প্রতিবেদনের নথিপত্র, সাক্ষ্য প্রমাণসহ যাবতীয় বিষয় বিচার বিশ্লেষণ করে পাঁচটি অভিযোগে ৭৯ পৃষ্ঠার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়।
তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগে ৭৯ পৃষ্ঠার মূল প্রতিবেদনের সঙ্গে এক হাজার ৯০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়।
তার বিরুদ্ধে ৩৬ জনকে হত্যা ২০০ জনকে ধর্মান্তরিত এবং লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করে ৫৫৭টি বাড়ি ধ্বংস করার অভিযোগ আনে তদন্ত সংস্থা।
২০১৩ সালের ১৯ মে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে ২৮ এপ্রিল ২০১৪ সালে তা শেষ করা হয়। মোট সাক্ষী ছিল ৪৬ জন। তার মধ্যে ৪০ জন ঘটনার এবং ছয়জন জব্দ তালিকার সাক্ষী।
মামলা চলাকালে ইঞ্জিনিয়ার জব্বার পলাতক থাকায় তার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রের নিয়োগপ্রাপ্ত আইনজীবী আবুল হাসান।
তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বার ছিলেন পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার (পিস) শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। তার শ্বশুর ছিলেন স্থানীয় মুসলিম লীগ নেতা। জব্বার ১৯৫৬ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন। বর্তমানে তার বয়স আনুমানিক ৮০ বছর। তদন্ত সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বার বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী।

