নিউজ ডেস্ক : পৃথিবীর বায়ু মন্ডলের একটি স্তর হচ্ছে ওজোন স্তর। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ২০-৩০ কিলোমিটার ওপরে অবস্থিত এ স্তর পৃথিবীর ছাতা হিসেবে কাজ করে। সূর্যের ক্ষতিকর অতি বেগুনি রশ্মিকে পৃথিবীতে প্রবেশ করতে দেয় না। এই ক্ষতিকর রশ্মি জীবজগতের সকল প্রাণের প্রতি তীব্র হুমকিস্বরূপ।
কিন্তু বায়ুমন্ডলে ক্রমাগত সিএফসি গ্যাস বৃদ্ধির ফলে ওজোন স্তর ক্ষয় হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বব্যপী উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে। ভূ-পৃষ্ঠ এতটাই উত্তপ্ত হচ্ছে যে সামগ্রিকভাবে বদলে গেছে আবহাওয়া, প্রকৃতি ও পরিবেশ। সৃষ্টি হচ্ছে নানা প্রকৃতিক দূর্যোগের। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে ত্বকের ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে। এ পরিস্থিতি উন্নত ও উন্নয়নশীল সব দেশকেই ভাবিয়ে তুলেছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ওজোন দিবস। এবার এ দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘মন্ট্রিল প্রটোকল : ওজোন স্তর সুরক্ষার ৩২ বছর’।
ওজোন স্তরের ক্ষয় ও এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী গণসচেতনতা তৈরিতে প্রতি বছর ১৬ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক ওজোন দিবস পালন করা হয়। ১৯৮৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর ক্ষয়ের জন্য দায়ী দ্রব্যগুলোর ব্যবহার নিষিদ্ধ বা সীমিত করার জন্য ভিয়েনা কনভেনশনের আওতায় ওজোন স্তর ধ্বংসকারী পদার্থের ওপর মন্ট্রিল প্রটোকল গৃহীত হয়।
বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে এই মন্ট্রিল প্রটোকলে স্বাক্ষর করে। এরপর থেকে বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হয়। দিবসটি উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি তাঁর দেওয়া বাণীতে বলেছেন, বিশ্বব্যাপী শিল্পায়ন ও নগরায়নের প্রভাবে দিন দিন পরিবেশ দূষণ বেড়ে চলছে। বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈশ্বিক উষ্ণতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে- যা জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে।
তিনি বলেন, ওজোন স্তর রক্ষার পাশাপাশি বৈশ্বিক উষ্ণায়নজনিত জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও মন্ট্রিল প্রটোকল উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। মন্ট্রিল প্রটোকল সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিবেশদূষণ ও ওজোন স্তর ক্ষয়রোধের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে তিনি সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাণীতে বলেছেন, ওজোন স্তর রক্ষায় বর্তমান সরকারের গৃহীত কার্যক্রম জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে দেশে উৎপাদিত পণ্য পরিবেশবান্ধব ও মানসম্মত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘ওজোনস্তর ক্ষয় ও তার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার ক্ষেত্রে বিশ্ব ওজোন দিবসের গুরুত্ব পরিসীম। আমি আশা করি, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিবেশবান্ধব বিকল্প প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় মন্ট্রিল প্রটোকল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে এবং জনসচেতনতা সৃষ্টি হবে।’
প্রসঙ্গত, ওজোন স্তর সুরক্ষায় বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তর যে পাঁচটি প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে তার মধ্যে তিনটি প্রকল্পই ওয়ালটনের।
পরিবেশ অধিদপ্তর এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় বাংলাদেশে ‘বিশ্বের প্রথম এইচএফসি ফেজ আউট’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ওয়ালটন। শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীতে ওয়ালটন করপোরেট অফিসের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘মন্ট্রিল প্রটোকল, ওজোন স্তর সুরক্ষার ৩২ বছর’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা ওয়ালটনের এ উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
বিশ্ব ওজোন দিবস উপলক্ষে পরিবেশ অধিদপ্তর এবং ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।
প্রসঙ্গত, সত্তরের দশকে ওজোন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি প্রথম ধরা পড়ে। দেখা যায়, বায়ুমণ্ডলে প্রতি দশকে চার শতাংশ হারে ওজোন স্তরের পুরুত্ব কমে আসছে। শিল্প বিপ্লব এবং মানুষের আধুনিক জীবনের জন্য ব্যবহৃত রাসায়নিক থেকে নির্গত হচ্ছে সিএফসি (ক্লোরোফ্লুরো কার্বন)। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন ধরনের স্প্রে, পরিষ্কারক এবং রেফ্রিজারেটরে সিএফসি বেশি ব্যবহৃত হয়। ওজোন স্তর পাতলা হয়ে পড়লে সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি পৃথিবীর বায়ু মন্ডলে প্রবেশ করে। ওজোন স্তর ক্ষয়ে অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে মানুষের ত্বকে ক্যান্সার, চর্ম রোগ, চোখে ছানি পড়াসহ সকল উদ্ভিদ ও প্রাণি জগতের ক্ষতি হয়। তাই ওজোন স্তরের ক্ষয়রোধ এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে পরিবেশবান্ধব এবং বিদ্যুৎসাশ্রয়ী পণ্য উৎপাদন ও ব্যবহার জরুরি। ওজোন স্তর ও পরিবেশ সুরক্ষায় ফ্রিজ, এসিসহ এ ধরনের যন্ত্রে আধুনিক পরিবেশ বান্ধব গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা দেখে ক্রয় করা প্রয়োজন।
বিশ্ব ওজন দিবস উপলক্ষে আজ আগারগাঁওয়ে পরিবেশ ভবন অডিটরিয়ামে এক সেমিনার ও শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন। বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার। সভাপতিত্ব করবেন পরিবেশ সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরী।

