নিজস্ব প্রতিবেদক : বহুভাষাবিদ, বিশিষ্ট শিক্ষক ও দার্শনিক ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভারতীয় উপমহাদেশের একজন চির স্মরণীয় বাঙালি ব্যক্তিত্ব। আজ তাঁর ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী।
তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার পেয়ারা নামক গ্রামে ১৮৮৫ সালের ১০ জুলাই তাঁর জন্ম। ‘জ্ঞানতাপস’ হিসেবে পরিচিত মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই আজকের এই দিনে ঢাকায় পরলোক গমন করেন। আজীবন ভাষা ও সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ পাকিস্তান সরকার তাঁকে ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স’এবং ফরাসি সরকার ১৯৬৭ সালে ‘নাইট অব দি অর্ডারস অব আর্ট লেটার্স’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর বাবার নাম ছিলো মফিজউদ্দীন আহমদ। তিনি ছিলেন পীর গোরাচাঁদের দরগাহের খাদেম। পৈতৃকভাবে তিনি পীর হতে পারতেন। কিন্তু সে পেশা থেকে বেরিয়ে এসে ভাষা ও জ্ঞানচর্চায় মনোনিবেশ করেন। তিনি ছোটবেলায় ঘরোয়া পরিবেশে উর্দু, ফারসি ও আরবি শেখেন এবং স্কুলে সংস্কৃত পড়েন। হাওড়া জেলা স্কুল থেকে ১৯০৪ সালে প্রবেশিকা এবং কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ. এ পাস করার পর তিনি হুগলি কলেজে পড়াশোনা করেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে অধ্যয়নে সাময়িক বিরতির পর তিনি কলকাতা সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতে অনার্সসহ বি এ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এম এ পাস করেন। দুবছর পর ১৯১৪ সালে তিনি বি এল ডিগ্রিও অর্জন করেন।
তাঁর প্রায় ১৮টি ভাষায় দখল ছিলো। ফলে বিদেশি সংস্কৃতি ও সাহিত্যে খুব সহজেই প্রবেশ করতে পেরেছিলেন। পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন একনিষ্ঠ ধর্মপ্রাণ মুসলমান। তিনি যেমন ভাষা, সংস্কৃতি, সভ্যতা এবং বিজ্ঞান নিয়ে বই লিখেছেন, তেমনি ধর্মীয় পুস্তুক লেখনীতেও নিজের কৃতিত্ব রেখেছেন। শেষ জীবনে তিনি ইসলামের প্রকৃত তাৎপর্য তুলে ধরার জন্য গ্রামে-গঞ্জে ওয়াজ-মাহফিলেও বক্তৃতা করতেন।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনসহ ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনিই প্রথম উর্দুর পরিবর্তে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার যৌক্তিক দাবি জানান। ১৯১১ সালে তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সম্পাদক ছিলেন। তিনি যে সমস্ত সভা ও সম্মেলনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো দ্বিতীয় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলন ও ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সমাজ সম্মেলন ইত্যাদি । এরপর মাদ্রাজে ‘ইন্টারন্যাশনাল সেমিনার অন ট্রাডিশনাল কালচার ইন সাউথ-ইস্ট এশিয়া’ অনুষ্ঠানে তিনি ইউনেস্কোর প্রতিনিধিত্ব করেন এবং তার চেয়ারম্যান মনোনীত হন।
বহু গুণী ব্যক্তিত্ব মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১৯০৮ সালে যশোর জেলা স্কুলের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তারপর সীতাকুণ্ড হাইস্কুলে কিছুদিন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করার পর তিনি চবিবশ পরগনা জেলার বশিরহাটে আইন ব্যবসায়ে নিযুক্ত হন। সেখানে তিনি পৌরসভার ভাইস-চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পর ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগের প্রভাষক পদে যোগদান করেন। এখানে শিক্ষাদান কালে তিনি বাংলা ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে মৌলিক গবেষণা করেন। ১৯২৫ সালে প্রমাণ করেন যে, গৌড়ী বা মাগধী প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছে।
জ্ঞানতাপস শহীদুল্লাহ ১৯২৬ সালে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য ইউরোপ যান। প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বিদেশি ভাষা, বৌদ্ধ সংস্কৃত, তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব, তিববতি ও প্রাচীন পারসিক ভাষা এবং জার্মানির ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচীন খোতনি, প্রাচীন ভারতীয় বৈদিক সংস্কৃত ও প্রাকৃত ভাষা শেখেন। ১৯২৮ সালে তিনি বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদাবলি বিষয়ে গবেষণা করে প্যারিসের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। দেশে ফিরে আবার তিনি ঢাবিতে যোগ দেন। ১৯৪৪ সালে সুনামের সাথে অবসর গ্রহণ করেন।
আজকের এই দিনে মৃত্যুর পর তাঁর প্রিয় কর্মস্থান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল চত্বরে তাঁকে সমাহিত করা হয়। জীবদ্দশায় জ্ঞানই ছিলো তাঁর আত্মার একমাত্র খোরাক।

